বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

২০২৬ সালেও শেষ হয়নি জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডি কার্ডের ভোগান্তি

Author

তৌফিক সুলতান , ঢাকা মেডিকেল ইনস্টিটিউট

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৫ বার

২০২৬ সালেও শেষ হয়নি জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডি কার্ডের ভোগান্তি

ডিজিটাল সেবার যুগে নাগরিকের দৌড়ঝাঁপ আর কতদিন?

লেখক: তৌফিক সুলতান

বাংলাদেশ এখন স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারি সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল ডাটাবেজ এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নাগরিক সেবা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে—জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা নিতে গিয়ে এখনো সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে—ডিজিটাল সেবার এত উন্নতির পরও ২০২৬ সালে এসে কেন একজন নাগরিককে নিজের পরিচয় সংশোধনের জন্য বারবার সরকারি দপ্তরের দরজায় ঘুরতে হবে?

জন্ম নিবন্ধন: নাগরিক জীবনের প্রথম পরিচয়

জন্ম নিবন্ধন একটি শিশুর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রথম দলিল। জন্মের পর এই সনদই ভবিষ্যতে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চাকরি, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু জন্ম নিবন্ধনে নামের বানান, জন্মতারিখ, পিতা-মাতার নাম, ঠিকানা বা অন্যান্য তথ্যের সামান্য ভুল অনেক সময় একজন নাগরিকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি ভুল সংশোধন করতে গিয়ে অনেককে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়।

অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে অনলাইন আবেদন করার পরও অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে প্রিন্ট কপি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং বিভিন্ন প্রমাণপত্র নিয়ে স্থানীয় নিবন্ধক কার্যালয়ে উপস্থিত হতে হয়। ফলে ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি আগের মতোই শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন থেকে যাচ্ছে।

এনআইডি সংশোধনে দীর্ঘ প্রক্রিয়া

জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র। এনআইডিতে ভুল থাকলে ব্যাংকিং, পাসপোর্ট, চাকরি, জমি ক্রয়-বিক্রয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়।

নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, এনআইডি সংশোধনের জন্য যথাযথ প্রমাণপত্র জমা দিতে হয়। এসএসসি বা সমমানের সনদ, জন্ম নিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদসহ বিভিন্ন দলিল প্রয়োজন হতে পারে। নিয়ম-কানুন থাকা জরুরি, কারণ পরিচয়পত্রের তথ্যের নিরাপত্তা ও নির্ভুলতা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন একজন নাগরিক সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকার পরও বারবার একই সমস্যার মুখোমুখি হন। আবেদন বাতিল হলে অনেক সময় সুনির্দিষ্ট কারণ পরিষ্কারভাবে না জানায় আবেদনকারী বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ফলে একই ভুলের কারণে নতুন আবেদন, নতুন ফি, নতুন কাগজপত্র এবং অতিরিক্ত যাতায়াতের চাপ তৈরি হয়।

অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ

সরকারি সেবার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডি সেবার ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের একটি বড় অভিযোগ হলো—প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপ অনুভব করা।

অনেক নাগরিক অভিযোগ করেন, নির্ধারিত নিয়মের বাইরে বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতা পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কাজের গতি বাড়ে না।

তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন। অনেক কর্মকর্তা সীমিত জনবল ও বিপুল আবেদন সামলাতে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হন। তাই সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা।

গ্রামাঞ্চলের মানুষের ভোগান্তি বেশি

শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ এসব সেবা নিতে গিয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন। অনেককে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা বা জেলা শহরে একাধিকবার যেতে হয়। যাতায়াত খরচ, প্রিন্ট, ফটোকপি, কাগজ সংগ্রহ এবং কর্মদিবস নষ্ট হওয়া—সব মিলিয়ে একটি ছোট সংশোধন আবেদনও অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে দরিদ্র, বয়স্ক ও প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভিজ্ঞ মানুষের জন্য অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়াও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

কীভাবে সমাধান সম্ভব?

জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা আরও সহজ করতে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে—

প্রথমত, অনলাইনে জমা দেওয়া আবেদন ও প্রমাণপত্র যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে অপ্রয়োজনীয় শারীরিক উপস্থিতি কমানো যায়।

দ্বিতীয়ত, কোনো আবেদন বাতিল হলে অবশ্যই স্পষ্ট কারণ উল্লেখ করতে হবে। এতে নাগরিক একই ভুল বারবার করবেন না।

তৃতীয়ত, জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট ও শিক্ষা সনদের তথ্যের মধ্যে নিরাপদ সমন্বয় তৈরি করা প্রয়োজন। একই তথ্য বারবার জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমাতে হবে।

চতুর্থত, প্রতিটি আবেদনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে তা মানার ব্যবস্থা করতে হবে।

পঞ্চমত, অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানের জন্য কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে নাগরিক দ্রুত প্রতিকার পান।

প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন নাগরিকবান্ধব প্রযুক্তি

ডিজিটাল সেবার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের সময়, অর্থ ও শ্রম বাঁচানো। যদি অনলাইনে আবেদন করার পরও একজন নাগরিককে আগের মতোই বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হয়, তাহলে ডিজিটাল রূপান্তরের প্রকৃত লক্ষ্য পূরণ হবে না।

জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র শুধু কিছু কাগজ নয়; এগুলো একজন নাগরিকের পরিচয়, অধিকার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ভিত্তি। তাই এই সেবাগুলো হতে হবে সহজ, দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত।

২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা—তথ্যপ্রযুক্তির যুগে নাগরিককে আর নিজের পরিচয়ের জন্য বারবার প্রমাণ দিতে হবে না; বরং রাষ্ট্রের সেবাব্যবস্থা নাগরিকের পাশে দাঁড়াবে।

স্মার্ট বাংলাদেশ তখনই সফল হবে, যখন একজন সাধারণ মানুষ ঘরে বসে সহজে, নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

লেখক: শিক্ষক & প্রতিষ্ঠাকালীন দপ্তর সম্পাদক, সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!