কিশোর অপরাধের নেপথ্যে সোশ্যাল মিডিয়া
এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ
সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে কিশোর অপরাধের প্রবণতা। পত্রিকার পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে সম্ভাবনাময় এ উঠতি প্রজন্মের হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, চাঁদাবাজিসহ ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়ানোর খবর। যাদের অধিকাংশেরই বয়স ১৫-১৭’র কোটায়। পুলিশ ও কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সূত্রমতে দেশব্যাপী প্রতিবছর পাঁচ শতাধিক মামলা হচ্ছে শুধু কিশোর অপরাধ সংক্রান্ত। তুলনামূলক হারে বর্তমানে মামলার সংখ্যা কিছুটা কমলেও বেড়েছে এ প্রজন্মের অপরাধের ধরণ। শুরুরদিকে এদের অনেকে ইভটিজিং বা এলাকাভিত্তিক বখাটেপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সম্প্রতি হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক সেবন ও বিক্রি, ধর্ষণ, অস্ত্র বহন এবং দলবেঁধে কারো উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মত অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
উদাহরণ হিসাবে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া কথিত টিকটক তারকা অপুর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। রাস্তা বন্ধ করে টিকটক ভিডিও তৈরির সময় রাস্তা থেকে সরে যাওয়ার জন্য হর্ণ বাজালে অপু ও তার গ্যাং দুজন পথচারীকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। এছাড়াও গত বছর গাজীপুরে কিশোর গ্যাং চক্রের হাতে নুরুল ইসলাম নামে এক কিশোর হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে প্রেম সংক্রান্ত বিরোধের জেরে নারায়ণগঞ্জে মোহাম্মদ মাওলা নামে মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর খুন হয় তার তিন বন্ধুর হাতে। একই বছরে রংপুরে বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় এক তরুণীকে অপহরণের চেষ্টা করে সাত তরুণ। যারা কিনা ‘টাইগার গ্রুপ’ নামীয় এক কিশোর গ্যাং- এর সদস্য। বহুল আলোচিত বরগুনার রিফাত হত্যাকান্ডের ২৪ আসামীর ১৪ জনই কিন্তু অপ্রাপ্ত বয়স্ক তথা কিশোর! তাছাড়া ২০১৩ সালে সস্ত্রীক পুলিশ কর্মকর্তার নিজের মেয়ে ঐশীর হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়ার মত অসংখ্য উল্লেখযোগ্য ঘটনা রয়েছে কিশোর অপরাধের তালিকায়। এসবের নেপথ্যে রয়েছে মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। এসব মাধ্যম থেকেই তারা সহজলভ্য ভাবে অপরাধের খোরাক পাচ্ছে।
অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ কিশোর- কিশোরীর সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্তত একটি প্রোফাইল আছে। এই সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কিশোর- কিশোরীরা অন্যদের সামনে নিজেকে আর নিজের ব্যক্তিত্বকে পরিবেশন করতে এবং অন্যের প্রতিক্রিয়া দেখতে খুব পছন্দ করে। আরো বেশি পছন্দ করে নিজের কৌতূহল ও আগ্রহ অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী অন্যান্য অনুরাগীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে। কারণ এখানে কোন লজ্জা কিংবা ইতস্ততবোধ কাজ করেনা। আবার এই জগৎটাতে অভিভাবক কিংবা বড়দের নজরদারিও নেই তেমন একটা – যা অপ্রাপ্ত বয়স্কদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। কাজেই এখানে তারা একধরনের ফাস্ট ট্র্যাক সামাজিক সাফল্যের স্বাদ পেয়ে থাকে।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে ফেসবুক, স্ন্যাপচ্যাট, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার, ইমো, ভিগো, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবারের মত সোশ্যাল মিডিয়া পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের খবর দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমাদের কাছে পৌঁছতে, আপনজনের সাথে সহজে যোগাযোগ স্থাপন করতে, মানুষের জীবনযাত্রার মান সহজতর করাসহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এসব সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার কিশোর ও যুবসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে ভয়ঙ্কর অবক্ষয়ের দিকে। শুধু কি তাই? মেডিকেল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরিক্ষার প্রশ্নফাঁসের মত ন্যাক্কারজনক কাজও সহজেই করা হয়েছে এই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই।
রাত জেগে এসব ব্যবহার করা এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। গতানুগতিক এ সংস্কৃতিতে ক্লিক করলেই স্ক্রিনে দেখা যায় পর্ণোগ্রাফি। কোন ঝক্কিঝামেলা ছাড়া খুব সহজেই চ্যাটিং এর মাধ্যমে যোগাযোগ করা যাচ্ছে সম অনুরাগীদের সাথে। এই সুযোগ লুফে নিয়েই শিক্ষা গ্রহণের এই বয়সে সোশ্যাল মিডিয়ায় বুদ হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে আমাদের কিশোর- কিশোরীরা। ফলে তাদের ভেতর থেকে দিনে দিনে পাঠাভ্যাস, শ্রদ্ধা- সম্মানবোধ, সৌজন্যবোধ, বিবেকবুদ্ধি ইত্যাদি লোপ পাচ্ছে। আর একারণেই সমাজে চুরি, ডাকাতি, স্মাগলিং, হত্যা, ধর্ষণ, ইভটিজিং ও প্রতারণার মত ঘৃণ্য কিশোর অপরাধ ও অপরাধী চক্র বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কিছু বিকৃত ও রুচিহীন বিনোদন মূলক অনুষ্ঠান, মিউজিক ভিডিও, পর্ণোগ্রাফি কিশোর ও যুবকদের খারাপ কাজে উদ্দীপনা তৈরির পাশাপাশি অনুকরণে উৎসাহ যোগায়। সোশ্যাল মিডিয়ার এ অপব্যবহার তাঁদের ব্রান্ড, ইমেজ ও গ্ল্যামারের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি করে। এসবের অনুকরণে কিশোর- কিশোরীরা ভালোমন্দের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারেনা। যা এই উঠতি বয়সের কিশোর- কিশোরীদের বড় বড় অপরাধের সাথে যুক্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। সম্প্রতি বহুল আলোচিত টিকটক ও লাইকি ভিডিও পর্যালোচনা করলে যা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিকৃত অঙ্গভঙ্গি, অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ এবং যৌনতাকে হাতিয়ার করে সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের লক্ষ্যে রুচির অযোগ্য এসব ভিডিও তৈরি করে আপলোড করা হয় সোশ্যাল মিডিয়াতে। আর লক্ষলক্ষ মানুষ তা দেখছেও দেদারসে। ফলস্বরূপ এই সস্তা জনপ্রিয়তা এবং তারকা খ্যাতি অর্জনের লোভে টিকটক নির্মাতাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই কিশোর- কিশোরী যুক্ত হয়েছে। যার কারণে নেমে আসছে চরম সামাজিক অবক্ষয়।
হাতের নাগালে এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহজলভ্যতা ছাড়াও পর্যাপ্ত অর্থ এবং অতিরিক্ত স্বাধীনতা কিশোর- কিশোরীদের নানা দিকে অবাধ বিচরণের সুযোগ তৈরি করে দেয়। কৌতূহল বশত নিজের অজান্তেই অনেকে পড়ে যেতে পারে অন্ধকার জগতে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজে সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগই পারে তাদের এই বিপথ হওয়া থেকে রক্ষা করতে। তারা যেন অপরাধে না জড়াতে পারে এবং তাদেরকে কেউ যেন অপরাধী কর্মকান্ডে ব্যবহার না করতে পারে সেজন্য প্রধান ভূমিকা পরিবারকেই পালন করতে হবে। সন্তান কোথায় যায়, কি করে, কার সাথে সময় কাটায়… গভীরভাবে এসব পর্যবেক্ষণ করতে হবে। খেলাধুলা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে কিশোর- কিশোরীদের আকৃষ্ট করতে হবে এবং তাতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। কিশোর অপরাধ রুখতে ছিন্নমূল শিশু- কিশোরদের পূণর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।
তরুণ প্রজন্মই আমাদের শক্তি, আমাদের অহংকার; আমাদের স্বপ্ন আর প্রেরণা। দেশের অমূল্য সম্পদ, আগামীর কর্ণধার। দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তাদের উপযুক্ত কাউন্সিলিং জরুরী। এসবের পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৫ আগস্ট ২০২০ তারিখে
দৈনিক আজকালের খবর
পত্রিকায় প্রকাশিত।
