বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কড়ির সাতকাহন

Author

এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ (কুষ্টিয়া-৭০০৩)

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২২ পাঠ: ৩২ বার

এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ 
‘কড়ি’ হচ্ছে প্রাণিরাজ্যের মোলাস্কা (Mollusca) পর্বের গ্যাস্ট্রোপোডা (Gastropoda) শ্রেণীর সামুদ্রিক একটি প্রাণী। সহজ ভাষায় বললে, কড়ি হচ্ছে বিশেষ এক প্রকার ক্ষুদ্র শামুক। আজকে আমরা কড়ির পরিচয়, আকৃতি, গঠন কিংবা প্রকারভেদ নিয়ে কথা বলবো না। আমাদের আজকের আলোচনা এই শামুকের খোলস এবং এর অভিনব এক ব্যবহার নিয়ে।
বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে বর্তমান বিনিময়ের মাধ্যম হচ্ছে Currency বা টাকা। তবে প্রাচীনকালে যখন টাকার উদ্ভব হয়নি, তখনো কিন্তু বিনিময় প্রথা ছিল। তখন বিনিময়ের মাধ্যম তথা টাকার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে- কড়ি, গরু, লবণ, চামড়া, পুঁতি, শস্যদানা, কাপড় সহ বিভিন্ন উপকরণ। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, টাকা বা মুদ্রা আবিষ্কারের পরে উপর্যুক্ত দ্রব্যাদির সাহায্যে বিনিময় প্রথার বিলুপ্তি ঘটলেও আফ্রিকার নানা স্থান, আমেরিকার আদিবাসী জনপদ, ভারতে এমনকি বাংলাদেশেও মুদ্রার বিকল্প হিসেবে কড়ি ব্যবহারের অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়।
বাংলার ইতিহাসের সর্বপ্রাচীন লিখিত দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয় মহাস্থান শিলালিপি কে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের শাসনামলে ব্রাহ্মী ভাষায় প্রচারিত এই শিলালিপিতে স্থানীয় গভর্নরকে দুর্ভিক্ষের সময় জনগণকে ‘গণ্ডক’ ও  ‘কাকনিক’ সাহায্য প্রদানের নির্দেশ রয়েছে। আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে এই ‘গণ্ডক’ ও ‘কাকনিক’ মূলত কড়ি গণনার একক। যা কড়ির গণনারীতি থেকে আরও স্পষ্ট হয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে কড়িকে মুদ্রার বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় প্রায় চার হাজার বছর আগে থেকে! তবে বাংলায় ঠিক কবে নাগাদ কড়ি চালু হয় তা স্পষ্ট ভাবে জানা না গেলেও, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে পাল-সেন যুগ হয়ে মধ্যযুগের মুসলিম শাসন পেরিয়ে, ব্রিটিশ শাসনামলে প্রায় ১৯ শতক পর্যন্ত বাংলায় মুদ্রা হিসেবে কড়ির প্রচলন ছিল। খাজনা আদায়,  ক্রয়-বিক্রয়, বিনিময়ের কাজে; সবক্ষেত্রেই মানুষ টাকা হিসেবে কড়ির ব্যবহার করত। একথা প্রথম জানা যায় পঞ্চম শতকের চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন (৩৯৯-৪১৪খ্রি.) এর বিবরণ থেকে। বাংলা সাহিত্যের সর্ব প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদেও বিনিময় কাজে কড়ি ব্যবহারের কথা স্পষ্টভাবেই বর্ণিত হয়েছে। চর্যার অন্যতম পদকর্তা ‘ডোম্বীপা’ রচিত ১৪নং পদটির শেষাংশে নৌকার মাঝিদের নদী পার করে দেওয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে-
‘কাবড়ী ন লেই/ বোড়ী ন লেই/ সুচ্ছলে পার করেই (কড়ি নেয় না, পয়সা নেয় না, মাগনা পার করে)!’
গুপ্তযুগেও বাংলায় কড়ির ব্যবহার বলবৎ ছিল। নীহাররঞ্জন রায় ‘বাঙালির ইতিহাস’ আদিপর্বে লিখেছেন, গুপ্ত যুগ থেকে বাংলাদেশে মুদ্রার নিম্নতম মান ছিল কড়ি।’ বরেণ্য ঐতিহাসিক মিনহাজ তার ‘তবাকাত-ই-নাসিরী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- রাজা লক্ষণ সেনের আমলে বাংলায় রুপার মুদ্রার বদলে কড়ি ব্যবহার হতো। এবং তিনি এক লক্ষ কড়ির কমে কোন দান করতেন না। লক্ষণ সেনের আনুলিয়া তাম্রশাসনে দেখা গেছে, ভূমির বার্ষিক আয় সম্পর্কে লেখা হয়েছে- ‘সংবৎসরেন কপর্দক-পুরাণ শতৈকোৎপত্তিক’ তথা পুরো বছরের খাজনা ১০০ কপর্দক-পুরাণ। এই ‘কপর্দক-পুরাণ’ বলতে বুঝাতো কিছুসংখ্যক কড়ি। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট হিসাবের সমানুপাতিক কড়ির নির্ধারিত কিছু সংখ্যা। কেননা গয়া লিপিতে বলা হয়েছে- সেন লিপি সমূহে আরো পরিষ্কার করে বলা হলো যে, জমির রাজস্ব হিসাবে যে রৌপ্য মুদ্রা ধরা হয়, তাদের জন্য সমতুল্য কড়ি প্রদান করাই রীতি। এছাড়াও নেপালে ব্যবহৃত মুদ্রার নাম ছিল ‘পণ-পুরাণ’। যার অর্থ- প্রচলিত রৌপ্যমুদ্রার মানের সমতুল্য নির্দিষ্ট পরিমাণ তাম্রমুদ্রা। আবার ‘কড়ি’ শব্দের উৎপত্তি হচ্ছে সংস্কৃত ‘কপর্দক/কপর্দিকা’ থেকে। এসব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে স্পষ্টতই বুঝা যায়, সেন যুগে কড়িই ছিলো বাংলার প্রধান মুদ্রা।
চৌদ্দ শতকে বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতাও বাংলায় এসে কড়ির ব্যবহার দেখতে পান। তিনি তার সফর নামা ‘কিতাবুর রেহালা’-তে বর্ণনা করেন, “এ দ্বীপের (মালদ্বীপের) বাসিন্দারা টাকা-পয়সা হিসাবে কড়ি ব্যবহার করে। তারা বাংলার অধিবাসীদের কাছে চাউলের বিনিময়ে কড়ি বিক্রি করে। বাংলায়ও এজিনিস অর্থ হিসেবে ব্যবহার হয়।” ইবনে বতুতার বর্ণনার সাথে মিল পাওয়া যায় মধ্যযুগে রচিত বাংলা ভাষায় লেখা একমাত্র আখ্যান কাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের বিবরণের। বড়ু চন্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের  নৌকা খন্ডে দেখা যায়, ‘এতেক সখিজন পার কইলেঁ/ কৌড়ী নীলে তাহার এ।’ একাব্যে আরো এসেছে, ‘কৌড়ী আনিআঁ দে শাসুড়ীর থানে।’ পনেরো শতকে বাংলা ভ্রমন কারী চীনা রাজদূত ‘মা-হুয়ান’ লিখেছেন- বাংলায় রুপার মুদ্রা চালু। সবধরনের বড় ব্যবসায়িক লেনদেন এই মুদ্রার সাহায্যে চলে। কিন্তু ছোটখাটো কেনাকাটায় তারা কড়ি ব্যবহার করে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংরেজ আমলেও আমাদের দেশে কড়ির ব্যবহার পুরোদমে বহাল ছিলো। এসময় ইংল্যান্ডেও এদেশের কড়ির চাহিদা ছিল ব্যাপক। ১৭১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি প্রস্তাব ছিল, “সারাবছর যেসকল কড়ি এদেশে রাজস্ব হিসাবে আদায় করা হবে, তা এক্সপোর্ট ওয়্যার হাউসের রক্ষকের কাছে পাঠাতে হবে। নির্দেশমত সেগুলো যেন জাহাজে করে ইংল্যান্ডে সরবরাহ করা হয়।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই সময়ে ইংল্যান্ডে ক্রীতদাস কেনা-বেচার কাজে কড়ির প্রচলন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সিলেটের কালেক্টর উইলিয়াম ম্যাকপিস থ্যাকরের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ১৭৭২ সালে তার যোগদানের সময়ে সিলেটের রাজস্ব ছিল এক লক্ষ ৭০ হাজার টাকা। যার পুরোটাই কড়ি দিয়ে আদায় করতেন সিলেটের জমিদাররা। লিন্ডসেও এমন কথাই লিখেছেন। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী আরেকটি জেলা রংপুরের জমিদাররাও এসময়ে কড়ি দিয়েই খাজনা আদায় করতেন।
এসব তো গেল মুদ্রা হিসেবে কড়ি ব্যবহার হওয়ার কথা। এবারে চমকপ্রদ আরেকটি তথ্য হচ্ছে, এতক্ষণ আমরা যে ‘কড়ি’ নিয়ে আলোচনা করলাম তা কিন্তু আমাদের দেশীয় ‘কড়ি’ নয়! অর্থাৎ, আমাদের দেশে যেসকল কড়ি পাওয়া যায় সেগুলো টাকা হিসেবে ব্যবহৃত হত না। ইবনে বতুতার বিবরণী থেকে পূর্বেই আমরা দেখেছি, চাউলের বিনিময়ে মালদ্বীপ থেকে আমাদের দেশে কড়ি গুলো আমদানি করা হত। মূলত আমাদের দেশীয় কড়ির সাথে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া কড়ি গুলোর রঙে-আকৃতিতে ছিলো বিস্তর পার্থক্য। ভারত মহাসাগর থেকে সংগৃহীত এসব কড়ি ছিলো ‘দুধ-সাদা’ রঙের এবং খানিকটা চ্যাপ্টা আকৃতির।
সাগর থেকে এই কড়ি সংগ্রহের দারুণ এক গল্প শুনিয়েছেন, নবম শতাব্দীর আরব বনিক সুলাইমান। তাঁর ‘সিলসিতাতুত তাওয়ারিখ’ গ্রন্থে এসেছে- মালদ্বীপের লোকেরা অগভীর সমুদ্র উপকূলে নারকেলের পাতা সহ ডাল পানিতে ডুবিয়ে রাখতো। নারিকেলের সেই ডালে ঝাঁকে ঝাঁকে জীবন্ত সামুদ্রিক কড়ি আশ্রয় নিত। কিছুদিন পর কড়ি সহ ডাল সমুদ্রতীরে ডাঙ্গায় তুলে রোদে ফেলে রাখা হত। এরপর মৃত কড়ির মাংস পঁচে গলে শুধু এর শক্ত চকচকে খোলসটি পড়ে থাকতো। পরবর্তীতে এই খোলসই ধুয়ে পরিষ্কার করে কড়ি হিসেবে বাংলা সহ নানা দেশে রপ্তানি করতো তারা।
এই কড়ি মুদ্রার আরেকটি চমৎকৃত দিক হচ্ছে এর গণনা-রীতি। যুগের পরিবর্তনে কড়ির মানও উঠানামা করতো। কিন্তু কড়ি ব্যবহারের শেষ যুগ পর্যন্ত এই গণনা বিধি অপরিবর্তিত ছিল।
কড়ি গণনা বিধি হচ্ছে, ৪ কড়ি= ১ গন্ডা; ২০গন্ডা= ১ পণ; ৪ পণ= ১ আনা; ৪ আনা= ১ কাহন; ৪ কাহন= ১টাকা (রৌপ্যমুদ্রা) = ৫১২০ কড়ি।
ভাষ্করাচার্যের লীলাবতী গ্রন্থানুসারে কড়ি গণনার আরেকটি রীতি: ২০ কড়ি= ১ কাকিনি; ৪ কাকিনি= ১ পণ; ১৬ পণ= ১ দ্রহ্ম; ১৬ দ্রহ্ম= ১ নিষ্ক (স্বর্ণমুদ্রা) = ২০৪৮০ কড়ি।
পূর্ববঙ্গ গীতিকায় এসেছে- “চাইর কুড়ি কড়ি গুইনা লইলে হয়রে পোণ। ষোল পোণ কড়ি লইলে হয়রে ভাই কাহোন (১ কাহন= ১২৮০ কড়ি)।”
হাজার হাজার বছর ধরে কড়ি বিনিময় মাধ্যম হিসেবে টিকে থাকলেও অষ্টাদশ শতকে এসে এর অবমূল্যায়ন ঘটতে আরম্ভ করে। এম. সি. দে দেখিয়েছেন,  ১৭৪০ সালে ১ টাকায় ২৪০০ কড়ি পাওয়া যেত। ১৭৫৬ সালে টাকায় ২৫৬০ কড়ি, ১৭৭১ সালে এসে তা দাঁড়ায় ৫২০০ কড়িতে। ১৮০৪ সালে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে কালেক্টরদের নির্দেশ দেওয়া হয় টাকায় ৫২৮০ কড়ি হিসেব ধরে খাজনা আদায় করার জন্য। এরপর ১৮৩৩ সালে এসে ১ টাকা সমান হয় ৬৫০০ কড়ি। উনবিংশ শতাব্দীতে এসে কড়ির মূল্য এবং ব্যবহার আরো দ্রুত পড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, আইন করে ১৮০৭ সালে কোম্পানি রাজস্ব হিসেবে কড়ি গ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করে। তবে হান্টার ‘থেকারেজ ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৮২০ সালের পরেও গ্রামীণ বাংলায় কড়ির ব্যবহার বহাল ছিল।১৮৭০ সালের দিকেও ‘বন্তার’ এলাকায় কড়ির ব্যবহার দেখা গেছে। মুদ্রা হিসেবে কড়ির ব্যবহার হয়তো আরো কিছুদিন ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকতো। কিন্তু দেশের মুদ্রানীতির উপর ইংরেজদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারের ইচ্ছা কড়ির অন্তিম পর্বকে ত্বরান্বিত করে।
কড়ির বর্ণাঢ্য এই ব্যবহারই প্রমাণ করে, বাংলায় মুদ্রা হিসেবে কড়ির ভূমিকা ছিল বিশাল। মিশে গিয়েছিল বাংলার আর্থিক ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। এই কারণে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও প্রবচনে ‘কড়ি’ শব্দটির ব্যবহার সেই প্রাচীন কাল থেকে আজ অবধি চোখে পড়ার মত। ‘দোলায় আছে ছ’পন কড়ি, গুনতে গুনতে যাব’, ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’, ‘আমার হাতে এখন কানা-কড়িও নেই।’ – এরকম অজস্র উপমা বাংলার সমাজ জীবনে কড়ির অপরিহার্য উপস্থিতিরই বহিঃপ্রকাশ।
লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১২ মার্চ ২০২২ তারিখে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।