মুদ্রার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু
মুদ্রাকে একটি দেশের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য তথা সার্বভৌমত্বের নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন মুদ্রায় স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি। লিখেছেন- এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ
প্রাচীনকাল থেকেই মুদ্রায় সংশ্লিষ্ট দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, জাতির পিতাসহ বরেণ্য ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলার রেওয়াজ রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিও উঠে এসেছে এ দেশের মুদ্রায়।
বিজয়ের অব্যবহিত পরে: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাত্র ৩ মাসের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের মুদ্রা জারি করা হয়। ৪ মার্চ ১৯৭২ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭২-এর মধ্যে ধাপে ধাপে অবমুক্ত করা হয় ১, ৫. ১০ এবং ১০০ টাকা মূল্যমানের সাত ধরনের ব্যাংক নোট: বিভিন্ন রং এবং নকশার এসব মুদ্রায় শুধু ‘ম্যাপ’ সিরিজের এক টাকার নোট ছাড়া বাকি ৬টি নোটের মুখ্য পিঠে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি উপস্থাপিত হয়।
‘৭৩-এ: ১৯৭৩ সালে নতুন নকশার ৫ এবং ১০ টাকার নোট বাজারে আসে। ৫ টাকার নোটের সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও নকশি আল্পনা; পেছনের দিকে অঙ্কিত হয় লাল রঙের মাঝে বিকশিত শাপলা, বাঁশঝাড় ও পাটের শিকা। সম্পূর্ণ সবুজ রঙা এই নোটটির সামনে বঙ্গবন্ধু এবং পেছনে ছিল ধানক্ষেতে কৃষকের ধান কাটার দৃশ্য।
দীর্ঘ ২৪ বছর পর: ‘৭৪ সাল থেকে দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৭ সালের ১১ ডিসেম্বর নতুন নকশার একটি ১০ টাকার নোট প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর লুৎফর রহমান সরকার স্বাক্ষরিত এ নোটটির এক পাশে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং অপর পাশে ঢাকার লালবাগ কেল্লা মসজিদ ফুটিয়ে তোলা হয়।
পরপর দুই বছর: ২০০০ সালের ১০ আগষ্ট স্বাধীনতার পর তৃতীয়বারের মতো ৫০০ টাকার নোটের প্রচলন করা হয়। এ নোটটিকে সাজানো হয় সামনে (ডানে) বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ প্রতিকৃতি, (মাঝে) ষাট গম্বুজ মসজিদ এবং অপর পাশে সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের ছবি দিয়ে। এই বছরেরই ১৪ ডিসেম্বর বাজারে আসে বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র পলিমার নোট (১০ টাকা)। এ নোটটিরও সামনে (মাঝে) রয়েছে বঙ্গবন্ধু, (ডানে) জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, জাতীয় পাখি দোয়েল এবং ভাসমান শাপলা।
আবারও ১০ বছর পর: ২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ২.৫, ১০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার সিরিজ নোট বের করে এই নোটগুলোর প্রতিটির মুখ্য দিকে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ প্রতিকৃতি এবং মাঝখানে জাতীয় স্মৃতিসৌধের জলছাপ ব্যবহার করা হয়। ২০১২ সালের ৭ মার্চ একই ডিজাইনে ১০, ২০ এবং ৫০ টাকার নোট অবমুক্ত করা হয়।
ধাতব মুদ্রায় বঙ্গবন্ধু: স্বাধীনতার পর থেকে সরকার মোট আট প্রকারের ধাতব মুদ্রা জারি করে। যার মধ্যে ১, ২ ও ৫ টাকার মুদ্রায় ২০১০ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি শোভা পাচ্ছে।
স্মারক মুদ্রায় বঙ্গবন্ধু: বাংলাদেশ ব্যাংক নানা সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মরণে স্মারক মুদ্রা প্রচলন করেছে। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উদযাপন- ১৯৯৬, বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধন-১৯৯৮, বিজয়ের চল্লিশ বছর পূর্তি-২০১১ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ইস্যু করা স্মারক রৌপ্যমুদ্রায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি খোদিত হয়েছে। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ৪০ টাকা অভিহিত মূল্যের কাগুজে নোট, ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ অভিযাত্রার গৌরবোজ্জ্বল স্মারক ৭০ টাকা অভিহিত মুল্যের নোট এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৫০ টাকা অভিহিত মূল্যমানের স্মারক নোট ও একই মূল্যমানের প্রচলনযোগ্য স্মারক নোটের এক পাশে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি অঙ্কিত হয়েছে।
জন্মশতবর্ষের বিশেষ স্মারক: বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষকে স্মরণীয় করে রাখতে চার ধরনের স্মারক মুদ্রা ইস্যু করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০ টাকা মূল্যমানের প্রচলিত স্বারক নোট, ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের অপ্রচলিত স্মারক নোট এবং ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা স্মারকগুলোর প্রতিটির মুখ্য দিকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি শোভা পাচ্ছে। তবে ২০০ টাকার নোটটির উভয় পার্শ্বেই রয়েছে জাতির পিতার প্রতিকৃতি।
