কুরআন ও হাদীসের আলোকে আশুরার ফজিলত ও শিক্ষা
- কুরআন ও হাদিসের আলোকে আশুরার ফজিলত ও শিক্ষা
আদিয়াত উল্লাহ
বছর ঘুরে মুসলিমদের দ্বারে হাজির হিজরি সনের প্রথম মাস মুহাররম। এ মাসের দশ তারিখ ‘ইয়াওমুল আশুরাহ্’ তথা ‘আশুরার দিবস’ হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত ও বরিত। এ দিবসটি মুমিনদের জীবনে এমন এক ফজিলতপূর্ণ ও শিক্ষাপ্রদ ঐতিহাসিক দিবস, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিনের সঙ্গে যার তুলনা প্রায় অসম্ভব। সহিহ হাদিসেও দিবসটির বর্ণনা এসেছে। আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে আশুরার ইতিহাস, ফজিলত, আমল ও শিক্ষা।
সহিহ হাদিসের বর্ণনায় আশুরার ইতিহাস: সহিহ হাদিসে আশুরার ইতিহাস সম্পর্কে মাত্র একটি বর্ণনাই পাওয়া যায়, যা মূলত আশুরার দিনের আমল সম্পর্কিত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া অন্য যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, হাদিসের ইমামদের মতে সেগুলো অত্যন্ত দুর্বল ও জাল। এসবের কিছুই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়নি, বরং অত্যন্ত দুর্বল সূত্রে কতিপয় সাহাবি ও তাবেয়ি থেকে বর্ণিত হয়েছে। এসব হাদিসের সকল রাবীই হয় অত্যন্ত দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী, নাহয় চরম মিথ্যাবাদী।
মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তি: সহিহ হাদিসে বর্ণিত আশুরার দিনের একমাত্র ঘটনাটি হচ্ছে মিসরের অত্যাচারী শাসক ফিরআউনের হাত থেকে মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তিলাভ। সহিহ হাদিসে এ ঘটনা সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মদিনায় এলেন এবং তিনি মদিনার ইহুদিদের আশুরার দিন সিয়াম পালন করতে দেখলেন। তাদের এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, “এটা সেই দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফিরআউন ও তার জাতিকে ডুবিয়ে মেরেছেন। তাঁর সম্মানার্থে আমরা রোজা রাখি।” তখন রাসুল (সা.) বলেন, “আমরা তোমাদের চেয়েও মুসা (আ.) এর বেশি নিকটবর্তী।” এরপর তিনি এ দিনে রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।” (মুসলিম: ২৫৪৮)
আশুরার দিনের আমল ও তার ফজিলত: সহিহ হাদিসের আলোকে আশুরার দিনের একমাত্র বিশেষ আমল হচ্ছে সিয়াম পালন। তবে এ সিয়াম দুদিন পালন করতে হবে। ইহুদিদের মতো একদিন সিয়াম পালন করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে এদিন এবং ৯ বা ১১ তারিখ সিয়াম পালনের জন্য উৎসাহ প্রদান করেছেন। (ইবনু রজব, লাতাইফ: ১ / ৬৮-৭৬ ; আব্দুল হাই লাখনবি, আল আসারুল মারফুআ, পৃ: ৯১-৯৪)
হযরত রুবাইয়ি বিনতে মুআউয়িজ ইবনে আফরা (রা.) বলেন, “আশুরার সকালে রাসুল (সা.) আনসারদের সকল পল্লীতে এ নির্দেশ দিলেন, “যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করেনি, সে যেন দিনের বাকি অংশ না খেয়ে থাকে, আর যে ব্যক্তি সিয়াম পালনকারী অবস্থায় সকাল করেছে, সে যেন সাওম পূর্ণ করে।” বর্ণনাকারী বলেন, “পরবর্তীতে আমরা ঐদিন সিয়াম পালন করতাম এবং আমাদের শিশুদের সিয়াম পালন করাতাম। আমরা তাদের জন্য পশমের খেলনা তৈরি করে দিতাম । তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে তাকে ঐ খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম। আর এভাবেই ইফতারের সময় হয়ে যেত।”” (বুখারি: ১৯৬০)
আশুরার সিয়ামের ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “এ দিনের সিয়াম গত এক বছরের গুনাহ মাফ করে।” (মুসলিম: ২/৮১৯)
দুর্বল হাদিসের বর্ণনায় আশুরার ইতিহাস: সহিহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনা ব্যতীত আশুরার ইতিহাস বর্ণনায় অনেক দুর্বল ও জাল হাদিস বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কিত কতিপয় বর্ণনা নিম্নরূপ:
১. আদম (আ.) এর সৃষ্টি,
২. পুরো সৃষ্টিজগতের সৃষ্টি,
৩. ঈসা (আ.) এর জন্ম,
৪. ইউসুফ (আ.) এর কারামুক্তি,
৫. ইয়াকুব (আ.) এর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া,
৬. ইদরিস (আ.) – কে আসমানে উঠিয়ে নেয়া,
৭. ইউনুস (আ.) এর মাছের পেট থেকে মুক্তিলাভ,
৭. কেয়ামত সংঘটিত হওয়া।
এসবের প্রতিটি বর্ণনাই দুর্বল, বানোয়াট, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বর্ণনা। ( আল আসারুল মারফুআ, আবদুল হাই লাখনবি: ৬৪ – ১০০; মা সাবাহা বিসসুন্নাহ ফী আইয়্যামিস সানাহ: ২৫৩ – ২৫৭)
আশুরার দিনের শিক্ষা: আশুরার দিনের কতিপয় শিক্ষা হচ্ছে:
১. নবী – রাসুলদের ঘটনাবলিকে গুরুত্ব দেয়া,
২. আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়,
৩.শিরকের ভয়াবহ পরিণাম, কেননা আল্লাহ শিরকের গুনাহ মাফ করেন না (সুরা নিসা: ৪৮, ১১৬),
৪. অত্যাচারীর পতন (সুরা ইউনুস: ৯০ – ৯২),
৫. ছোটদের সিয়াম পালন ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়া,
৬. বিধর্মীদের বিপরীত করা।
লেখক: আদিয়াত উল্লাহ,
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
কার্যনির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
ই-মেইল: saadhafeezdhaka@gmail.com.
মোবাইল নাম্বার: 01926869482.
