সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

উন্নয়নের ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ পৃথিবী।

Author

মোছা সোমনা আক্তার , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ৮ জুন ২০২৬ পাঠ: ৩ বার

  • https://epaper.protidinersangbad.com/উন্নয়নের ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ পৃথিবী।
    প্রতি মিনিটে বিশ্বে প্রায় ২৮ হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে — অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৪০,০০০ হেক্টর। আর বাংলাদেশে গত তিন দশকে বনভূমির পরিমাণ কমেছে উদ্বেগজনক হারে। উন্নয়নের নামে আমরা যা গড়ছি, তার চেয়ে বেশি হারাচ্ছি। একটি দেশ যদি প্রতিদিন নতুন রাস্তা, ভবন আর কারখানা গড়ে তোলে, কিন্তু সেই সঙ্গে তার গাছপালা, জলাভূমি আর প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারাতে থাকে— তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা স্থায়ী? এই প্রশ্নটিই এখন বাংলাদেশের পরিবেশ ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে ভূমির ব্যবহার কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপের কারণে কৃষিজমি, বনভূমি ও জলাভূমি ধীরে ধীরে আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে গত তিন দশকে বনভূমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রাকৃতিক সবুজ আচ্ছাদন কমে যাওয়ার এই প্রবণতা পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
    বায়ুদূষণ এখন বৈশ্বিকভাবে অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি— বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই সতর্কবার্তা বারবার দিয়ে আসছে। গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং দূষণকারী কণার ঘনত্ব বাড়ছে। ঢাকাসহ বড়ো শহরগুলোতে সূক্ষ্ম বস্তুকণা ২.৫-এর মাত্রা প্রায়ই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত নিরাপদ সীমার কয়েকগুণ বেশি থাকে, যা শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদ্‌রোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। শিশু ও বৃদ্ধরা এই দূষণের সবচেয়ে বড়ো শিকার।
    শহরাঞ্চলে গাছপালা কমে যাওয়া এবং কংক্রিটের কাঠামো বৃদ্ধির ফলে “আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট” প্রকট হয়ে উঠছে। এর ফলে শহরের তাপমাত্রা গ্রামীণ এলাকার তুলনায় ২-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়ে যাচ্ছে। এই অতিরিক্ত তাপ জনস্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে ঢাকা ও রাজশাহীতে যে অসহনীয় তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে, তা এই বাস্তবতারই প্রমাণ। অন্যদিকে, জলাভূমি ভরাট এবং নদী-খাল দখলের প্রবণতাও পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাধার কমে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা, বন্যার ঝুঁকি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস পাচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও শহুরে জীবনযাত্রার ওপর পড়ছে। ঢাকার চারপাশের নদীগুলো আজ মৃতপ্রায় — এটি আমাদের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড়ো ব্যর্থতার একটি। তবে উন্নয়ন ও পরিবেশ মূলত একে অপরের বিরোধী নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশকে উপেক্ষা করা হয়। টেকসই উন্নয়নের ধারণা অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।  প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
    এই সংকট মোকাবিলায় কিছু কার্যকর পদক্ষেপ  নেওয়া জরুরি।  প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে — শুধু কাগজে নয়, মাঠপর্যায়ে। নগর পরিকল্পনায় সবুজ এলাকা, পার্ক এবং বৃক্ষায়ণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ ও পুনঃবনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। শিল্পখাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, নদী ও জলাভূমি দখলমুক্ত করতে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
    উন্নয়নের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমান উন্নত করা, শুধু অবকাঠামো বৃদ্ধি নয়। প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে যে উন্নয়ন, তা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে না। আজকের সবুজভূমি ধ্বংসের মাশুল দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে। তাই উন্নয়নকে সত্যিকার অর্থে টেকসই করতে হলে সবুজ পৃথিবীকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে – এটি এখন আর বিকল্প নয়, বাধ্যবাধকতা।
    লেখক :-
    সুমনা আক্তার
    শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ।
    মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ।
    ই-মেইল :- sumonaakter472192@gmail.com
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!