বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সবুজ অর্থনীতি ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৩ বার

https://epaper.protidinersangbad.com/

সবুজ অর্থনীতি ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ

বিশ্বের অর্থনীতি আজ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসরগামী। একসময় উন্নয়নের প্রধান সূচকই ছিল শিল্পায়ন, বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান সংকট বিশ্বকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। এখন উন্নয়নের নতুন দর্শন হলো হয়তো- সবুজ অর্থনীতি। যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে সমান গুরুত্ব দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই ধারণা শুধু একটি সম্ভাবনা নয়, বরং ভবিষ্যতের উন্নয়নের একটি অপরিহার্য পথ। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) সবুজ অর্থনীতিকে এমন একটি অর্থনীতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যা মানুষের কল্যাণ ও সামাজিক সমতা বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় কমায়। অর্থাৎ উন্নয়ন হবে, কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে, কিন্তু সেই উন্নয়ন প্রকৃতির ক্ষতি করে নয়; বরং প্রকৃতিকে পরিপূর্ণ করেই। বাংলাদেশ এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব অনুভব করছে। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং অত্যধিক তাপপ্রবাহ কৃষি, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাংক তাদের Country Climate and Development Report-এ উল্লেখ করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সবুজ বিনিয়োগ বাংলাদেশের টেকসই প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। সবুজ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার একটি হলো ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি’। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে না, বরং কার্বন নিঃসরণও বাড়ায়। অথচ বাংলাদেশে সৌরশক্তির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগ ভবিষ্যতে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। শহরের ছাদ, শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো গেলে বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে। কৃষিও বাংলাদেশের সবুজ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারে। বর্তমানে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, জৈব চাষ, পানি-সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনা বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগাচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মনে করে, চেকসহ কৃষি ওর খাদ্য ভৎপাদন বাড়ায় না; এটি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে রাসায়নিক সারের দক্ষ ব্যবহার, দেশীয় বীজ সংরক্ষণ এবং কৃষিতে প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ানো গেলে একদিকে উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে পরিবেশের ক্ষতিও কমবে। সবুজ অর্থনীতির আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার। প্রতিদিন দেশের শহরগুলোতে হাজার হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এর একটি বড় অংশ যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায় না। অথচ প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতু ও জৈব বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে নতুন শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। এতে যেমন পরিবেশ দূষণ কমবে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশ ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা চক্রাকার অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে একটি পণ্যের ব্যবহার শেষে সেটিকে পুনরায় উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরিয়ে সম্ভব। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পও সবুজ অর্থনীতির একটি উদাহরণ। এসব কারখানায় বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার কম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছে। ভবিষ্যতে অন্যান্য শিল্প খাতেও এই ধারা বিস্তৃত করা গেলে রপ্তানি সক্ষমতা ক্রমশ বাড়বে। সবুজ অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘সবুজ অর্থায়ন’। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবেশবান্ধব শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতিমালা গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বর্তমানে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি, আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে, দক্ষ জনবলও সীমিত। পরিবেশ আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, নদী দূষণ, বন উজাড় এবং পরিকল্পনাহীন নগরায়ণও সবুজ অর্থনীতির পথে বড় বাধা। এ ছাড়া শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের ভারসাম্য রক্ষা করাও সহজ নয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ নাগরিকদেরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, সবুজ উদ্যোক্তা তৈরি, শিক্ষাব্যবস্থায় জলবায়ু ও পরিবেশ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। একইসঙ্গে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন, শক্তি-সাশ্রয়ী ভবন এবং টেকসই নগর পরিকল্পনার ওপরও জোর দিতে হবে। বাংলাদেশ উন্নয়নের নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; সেই প্রবৃদ্ধি হতে হবে পরিবেশবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ। সবুজ অর্থনীতি সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি কার্যকর পথ। এটি শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বাড়বে। প্রকৃতিকে রক্ষা করেই টেকসই সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!