পানি: অদূর ভবিষ্যতের যুদ্ধের কারণ
https://epaper.banglabazarpatrika.net/edition/739/epaper-for-july-23-2026/page/4#
পানি: অদূর ভবিষ্যতের যুদ্ধের কারণ
একসময় বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, ভবিষ্যতের যুদ্ধ সংঘটিত হবে তেলকে কেন্দ্র করে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করে সেই ধারণা ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। এখন বিশ্বের বহু নীতিনির্ধারক, গবেষক ও পরিবেশবিদ সতর্ক করছেন, আগামী দিনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হবে ‘পানি’। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন নগরায়ণ এবং সীমান্তবর্তী নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ বিশ্বকে এমন এক বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে বিশুদ্ধ পানির সংকট কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয় অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্যেও অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২.২ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ পানীয় জলের পর্যাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। একই সঙ্গে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মানুষের নিরাপদ স্যানিটেশন সুব্যবস্থা নেই। এই সংকট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও তীব্র ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার বিশ্বজুড়ে পানির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ফলে পানি আজ শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মতো সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাব অনেক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নগরজীবন- সব ক্ষেত্রেই পানির প্রাপ্যতা সরাসরি অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ পানির সংকট কেবল পরিবেশের ক্ষতি করে না, একটি দেশের উন্নয়নের গতিও থামিয়ে দিতে পারে। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৩১০টিরও বেশি আন্তঃসীমান্ত নদী ও হ্রদ একাধিক দেশের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে আছে। এসব জলসম্পদ ব্যবহারের অধিকার নিয়ে বহু বছর ধরেই বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা রয়েছে। নীল নদ নিয়ে ইথিওপিয়া, সুদান ও মিসরের মধ্যে মতপার্থক্য, টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদী নিয়ে তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকের উদ্বেগ কিংবা মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন নদী নিয়ে আঞ্চলিক বিরোধ তারই উদাহরণ। তবে এসব ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত আলোচনাই প্রধান পথ হয়েছে: পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ নয় তাই পানির জন্য যুদ্ধ কথাটি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেশগুলো কূটনৈতিক সমাধানের পথই খুঁজেছে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ হলেও এর অধিকাংশ বড় নদীর উজান অন্য দেশে। ফলে উজানের পানি ব্যবস্থাপনা, শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানি নেমে আসা এসবই দেশের কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। গঙ্গা, তিস্তা ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। তাই পানিকে ঘিরে কূটনীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।বাংলাদেশে আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা। রাজধানী ঢাকা ও দেশের অনেক শহরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, এভাবে চলতে থাকলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাবে, যার প্রভাব পড়বে কৃষি, নগরজীবন ও পরিবেশে। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তারও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতাকে কঠিন করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। আইপিসিসি-এর একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, উষ্ণায়নের ফলে অনেক অঞ্চলে খরা ও বন্যার তীব্রতা বাড়তে পারে, যা মিঠা পানির প্রাপ্যতাকে অনিশ্চিত করবে। বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো দীর্ঘ খরা। এই পরিবর্তন কৃষি উৎপাদন, মাছের প্রজনন এবং মানুষের জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলছে। পানির সংকটের সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার সম্পর্কও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ মিঠা পানি কৃষিখাতে ব্যবহৃত হয়, বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। তাই পানির ঘাটতি মানে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া, খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া। একটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পানির টেকসই ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো এর World Water Development Report এ উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা সংঘাতের চেয়ে বেশি কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান নিশ্চিত করে। তাই পানিকে যুদ্ধের কারণ নয়, বরং সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের জন্য এখনই কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রথমত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহার বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, নদী দখল ও দূষণ বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে নদী ও পৃষ্ঠস্থ পানির পরিকল্পিত ব্যবহার বাড়াতে হবে। চতুর্থত, কৃষিতে আধুনিক ও পানি-সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য বিনিময় ও কার্যকর পানি কূটনীতি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পানি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার, ফুল-ফসলের প্রাণ, প্রকৃতির ভিত্তি এবং সভ্যতার অস্তিত্বের শর্ত। তাই ভবিষ্যতের পৃথিবীকে সংঘাতমুক্ত রাখতে হলে আজ থেকেই পানিকে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে রক্ষা করতে হবে। যদি আমরা নদী রক্ষা করি, পানির অপচয় কমাই, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করি, তাহলে পানি যুদ্ধের কারণ নয়, বরং শান্তি ও সহযোগিতার সেতুবন্ধন হয়ে উঠবে।
