শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

শিক্ষা ও শিল্পের সমন্বয়ে বদলাতে পারে কর্মসংস্থানের চিত্র।

Author

মোছা সোমনা আক্তার , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ১০ বার

শিক্ষা ও শিল্পের সমন্বয়ে বদলাতে পারে কর্মসংস্থানের চিত্র। 
একজন তরুণ বছরের পর বছর পড়াশোনা করে একটি সনদ অর্জন করেন। এরপর শুরু হয় চাকরির অপেক্ষা। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও দক্ষ কর্মীর সন্ধানে থাকে। একই দেশে একই সময়ে যখন একদিকে শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থানের সংকট, অন্যদিকে শিল্পখাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি-এই বৈপরীত্যের মূল কারণ লুকিয়ে আছে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যকার দূরত্বে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যাই প্রায় ১৩ লাখ। অর্থাৎ দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর একটি বড়ো অংশই তরুণ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের মোট বেকারদের মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারীর হার ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে। একই সময়ে বেকার স্নাতকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। যেখানে জাতীয় বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান শুধু বেকারত্বের চিত্র তুলে ধরে না, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যকার অসামঞ্জস্যের কথাও বলে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু উচ্চশিক্ষা শেষ করলেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে না। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় ব্যাবহারিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, যোগাযোগের সক্ষমতা কিংবা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। ফলে শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে একটি অদৃশ্য দেয়াল। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এখনো অনেক ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য পাঠ্যবই ও নির্ধারিত সিলেবাসকেন্দ্রিক পড়াশোনায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে শুধু সনদ বা পরীক্ষার ফলাফল যথেষ্ট নয়। সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস, নেতৃত্ব, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা-এসব দক্ষতাও চাকরির বাজারে গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো শিল্পখাতের দ্রুত পরিবর্তন। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের ধরনও বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডেটা বিশ্লেষণ, ক্লাউড প্রযুক্তি ও ডিজিটাল যোগাযোগের মতো বিষয় এখন বিভিন্ন পেশায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিন্তু শিক্ষাক্রম ও পাঠদানের পদ্ধতি যদি শিল্পের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত পরিবর্তিত না হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগেই পিছিয়ে পড়বেন। বাংলাদেশের তরুণদের সামনে সুযোগের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও বড়ো। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের যুব বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের ক্ষেত্রে তা ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। একই সময়ে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ১৬ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের কোনোটিতেই ছিল না। এই তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা না গেলে দেশের জনমিতিক সুবিধা অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা কঠিন হবে। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে কী পড়ানো হবে, সেই সিদ্ধান্তে শুধু একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গিই নয়, কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, পেশাজীবী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়মিত পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করা যেতে পারে। কোন খাতে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, কোন প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং ভবিষ্যতে কোন পেশাগুলোতে নতুন সুযোগ তৈরি হবে-এসব তথ্য শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।
শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠ যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও প্রকল্পভিত্তিক কাজকে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ সম্পর্কে আগেই ধারণা পাবেন এবং নিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন কর্মীদের প্রশিক্ষণে তুলনামূলক কম সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হবে। শিক্ষক ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। শিল্পখাতে কাজ করা ব্যক্তিরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন। এতে বইয়ের জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার যোগসূত্র তৈরি হবে। একইভাবে শিক্ষকদেরও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব সমস্যা ও প্রয়োজন সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা আরও বাস্তবমুখী হয়ে উঠবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণাও এই ব্যবধান কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন, পরিবেশ, কৃষি, খাদ্য, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও জীবপ্রযুক্তিসহ নানা ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে গবেষণা করলে নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে গবেষণা শুধু প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থনীতি ও সমাজে বাস্তব অবদান রাখার সুযোগ পাবে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক ও যোগাযোগ দক্ষতার গুরুত্বও বাড়ছে। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীকে শুধু নির্দিষ্ট সফ্‌টওয়্যার চালাতে জানলেই হবে না, তাকে দলগতভাবে কাজ করতে হবে, সমস্যা বিশ্লেষণ করতে হবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং নিজের ভাবনা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ, নেতৃত্ব ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপরও গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার এই প্রয়োজনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। AI কিছু প্রচলিত কাজের ধরন পরিবর্তন করতে পারে, আবার নতুন ধরনের কাজ ও পেশার সুযোগও তৈরি করতে পারে। তাই AI-কে চাকরির শত্রু হিসেবে দেখার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের AI-সহ নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
সরকারের দায়িত্বও এখানে কম নয়। শিক্ষা, শিল্প ও কর্মসংস্থানকে আলাদা আলাদা নীতির মধ্যে না রেখে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। শ্রমবাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি তৈরি করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রকল্পে সহায়তা দেওয়া এবং ইন্টার্নশিপ ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশও শক্তিশালী করা দরকার। কারণ প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য চাকরি তৈরি করা সম্ভব না হলেও নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলে তারা নিজের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একা কর্মসংস্থানের সংকট সমাধান করতে পারবে না, আবার শিল্পখাতও একা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারবে না। প্রয়োজন দুপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগ, যৌথ পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল অংশীদারত্ব। শিক্ষার্থীরা যা শিখবে, তার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে যা প্রয়োজন-এই দুইয়ের মধ্যে যত দ্রুত সেতুবন্ধন তৈরি করা যাবে, তত দ্রুত কমবে দক্ষতার ঘাটতি ও শিক্ষিত বেকারত্ব। সঠিক শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীই হতে পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় শক্তি। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের কর্মী, গবেষক, উদ্যোক্তা ও শিল্পনেতা-তাই তাদের এমন শিক্ষা দিতে হবে, যা পরীক্ষার খাতায় নম্বর এনে দেওয়ার পাশাপাশি বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও তৈরি করবে। শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে দূরত্ব যত কমবে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সুযোগ তত বাড়বে-আর সেই সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশের তরুণদের সম্ভাবনাকে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে।
লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দৈনিক দিনকাল পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।