বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে কান্তকবির স্মৃতিভিটা

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৪০ বার

বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে কান্তকবির স্মৃতিভিটা

গত ২৬ জুলাই পালিত হলো কান্তকবি রজনীকান্ত সেনের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের ভুবনে অনন্য উচ্চতার অধিকারী এই কবিকে ঘিরে সেদিন স্বাভাবিকভাবেই দেশের সাহিত্য অঙ্গনে নানা আয়োজন হয়েছে। দেশ-বিদেশের শিল্পীদের কন্ঠে গাওয়া হয়েছে তাঁর গান, পাঠ করা হয়েছে তাঁর কবিতা, আলোচনা হয়েছে তাঁর সাহিত্যকর্ম ও জীবন নিয়ে। কিন্তু জন্মবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে যখন আমরা একটু পেছনে ফিরে তাকাই, তখন একটি প্রশ্ন অস্বস্তিকরভাবে সামনে আমাদের চেতন জগতে সাড়া ফেলে । যে মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন কান্তকবি, তাঁর সেই স্মৃতিভিটা আজ কোথায়? যে কবির গান বাঙালির হৃদয়ে দেশপ্রেম, ভক্তি ও মানবতার বোধ জাগিয়েছে, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থান কেন ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে? রজনীকান্ত সেন বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের এমন এক উজ্জ্বল নাম, যার সৃষ্টির আবেদন সময়ের সীমা অতিক্রম করেছে। আধ্যাত্মিকতা, নীতিবোধ, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও কৌতুক—বৈচিত্র্যময় এই উপাদানগুলো তাঁর কবিতা ও গানে এক অনন্য রূপ পেয়েছে। সহজ ভাষায় গভীর অনুভূতি প্রকাশের যে অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর ছিল, তা তাঁকে সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি নিয়ে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বদলে গেলেও তাঁর গান ও কবিতার আবেদন তাই আজও অমলিন। বাংলা সাহিত্যের পঞ্চকবির অন্যতম রজনীকান্ত প্রায় ২৯০টি গান রচনা করে বাংলা সংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। ১৮৬৫ সালের ২৬ জুলাই তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার ভাঙাবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রজনীকান্ত সেন। বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোয় তাঁর জন্মস্থান সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার অন্তর্গত। সম্ভ্রান্ত বৈদ্য পরিবারে জন্ম নেওয়া রজনীকান্তের পিতা গুরুপ্রসাদ সেন ছিলেন সাব-জজ এবং সংগীত ও ধর্মচর্চায় অনুরাগী। মা মনোমোহিনী দেবী ছিলেন ধর্মপরায়ণা ও গুণবতী। শৈশব থেকেই পারিবারিক পরিবেশে কবিতা ও সংগীতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। অল্প বয়সেই প্রকাশ পেতে শুরু করে তাঁর সৃষ্টিশীল প্রতিভা। পরবর্তী জীবনে রাজশাহী হয়ে ওঠে তাঁর কর্ম ও সাহিত্যসাধনার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। শিক্ষাজীবন শেষ করে আইন পেশায় যুক্ত হলেও সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ কখনো কমেনি। প্রচারবিমুখ এই কবি বন্ধুদের অনুরোধে কবিতা লিখতেন, গান রচনা করতেন এবং সাহিত্যসভায় অংশ নিতেন। ধীরে ধীরে তাঁর সাহিত্যিক পরিচিতি বিস্তৃত হয়। তাঁর রচনায় যেমন ছিল দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বোধ, তেমনি ছিল ঈশ্বরের প্রতি গভীর আত্মসমর্পণ, জীবনের অনিত্যতা এবং মানুষের অন্তর্গত বেদনার গভীর উপলব্ধি। কবির জীবনের শেষ অধ্যায় অবশ্য ছিল অত্যন্ত বেদনাময়। একের পর এক স্বজনবিয়োগ, বিশেষ করে পুত্রশোক তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। সেই বেদনা তাঁর সাধনসংগীতেও প্রতিফলিত হয়। পরবর্তীকালে গলায় ক্যানসার ধরা পড়লে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। অসুস্থতার এক পর্যায়ে তিনি বাকশক্তি হারান এবং কাগজে লিখে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা প্রকাশ করতেন। চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল অর্থসংকটেরও। শেষ পর্যন্ত ১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৫ বছর বয়সে এই প্রতিভাবান কবির জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পর কেটে গেছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়। কিন্তু তাঁর অমর সৃষ্টি এখনো আমাদের প্রাণে অমৃত বষর্ণ করে। ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’ থেকে ‘স্বাধীনতার সুখ’ -দেশপ্রেম ও জীবনবোধের নানা মাত্রা তাঁর রচনায় প্রকাশ পেয়েছে। ভক্তিমূলক গানেও তিনি বাঙালির হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিকে ভাষা দিয়েছেন। তাঁর রচিত ‘বাণী’, ‘কল্যাণী’, ‘অমৃত’, ‘আনন্দময়ী’, ‘বিশ্রাম’, ‘অভয়া’, ‘সদ্ভাব-কুসুম’ ও ‘শেষদান’সহ বিভিন্ন গ্রন্থ তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু এখানেই আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার জায়গা। একজন সাহিত্যিকের সৃষ্টি যদি আমরা সংরক্ষণ করি, তাঁর বই পুনর্মুদ্রণ করি, গান গাই, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণসভা করি, তাহলে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর কী হবে? রজনীকান্ত সেনের ভাঙাবাড়ীর স্মৃতিভিটা এই প্রশ্নেরই এক বাস্তব উদাহরণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জন্মভিটা ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনার অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। অবহেলা, দখল ও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। কোথাও পুরোনো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ, কোথাও কালের ক্ষত। সব মিলিয়ে একসময়কার স্মৃতিময় পরিসর আজ যেন ইতিহাসের শেষ চিহ্নগুলো আঁকড়ে আছে। কান্তকবির স্মৃতি ধরে রাখতে স্থানীয় উদ্যোগে রজনীকান্ত স্মৃতি রজনী সংসদ ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, স্মৃতি সংরক্ষণের নানা আয়োজন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। ‘রজনী মুক্তমঞ্চ’সহ বিভিন্ন উদ্যোগও তাঁর স্মৃতিকে স্থানীয় মানুষের মধ্যে জীবিত রেখেছে। কিন্তু একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব কেবল স্থানীয় মানুষের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা। কান্তকবির স্মৃতিভিটা রক্ষায় প্রথম প্রয়োজন তাঁর জন্মভিটা ও সংশ্লিষ্ট জমির সঠিক সীমানা নির্ধারণ। কোথায় সরকারি সম্পত্তি, কোথায় ব্যক্তিমালিকানা, কোথায় দখলের অভিযোগ—এসব বিষয় নির্ভুলভাবে যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এরপর ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে এর সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নির্দিষ্ট কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যেতে পারে। সেখানে রজনীকান্ত সেনের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি স্মৃতি জাদুঘর, গবেষণা ও পাঠকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী, বই, পাণ্ডুলিপি, আলোকচিত্র ও তাঁর সময়ের ইতিহাস সংরক্ষণ করা গেলে জায়গাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে কেবল একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। রজনীকান্তকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের মধ্য দিয়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর কবিতা ও গান নিয়ে পাঠচক্র হতে পারে, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়োজন করতে পারে নিয়মিত অনুষ্ঠান, আর প্রযুক্তির যুগে তাঁর রচনাগুলো নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তরুণ প্রজন্ম যদি তাঁর সৃষ্টি নতুন করে আবিষ্কার করে, তবেই কান্তকবির উত্তরাধিকার সত্যিকার অর্থে জীবন্ত থাকবে। ২৬ জুলাইয়ের জন্মবার্ষিকী পেরিয়ে গেছে। ফুল, আলোচনা, গান ও স্মরণানুষ্ঠানের সেই দিনও এখন অতীত। কিন্তু কান্তকবির স্মৃতিভিটা রক্ষার প্রশ্নটি অতীত হয়ে যায়নি। বরং জন্মবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরই আমাদের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ একজন কবিকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা জানানো মানে শুধু তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা নয়; তাঁর সৃষ্টি, আদর্শ ও স্মৃতিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ করে রাখা। ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; কখনো তা একটি বাড়ির দেয়ালে, একটি পুকুরের জলে, একটি পুরোনো আঙিনায় কিংবা কয়েকটি ক্ষয়িষ্ণু ইটের মধ্যেও বেঁচে থাকে। তাই কান্তকবি রজনীকান্তের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী পেরিয়ে এখন প্রশ্ন একটাই—আর কতদিনের অপেক্ষা? রজনীকান্ত সেনের স্মৃতিভিটাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। জন্মদিনের আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা যদি সত্যিকার দায়িত্ববোধে পরিণত হয়, তবেই কান্তকবির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা পূর্ণতা পাবে। নইলে একদিন তাঁর গান থাকবে, কবিতা থাকবে, তার কাব্যগ্রন্থ থাকবে। কিন্তু তাঁর জন্মভিটা হয়তো থাকবে না। আর সেই ক্ষতি শুধু রজনীকান্তের নয়; তা হবে আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক স্মৃতির ক্ষতি।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ বুলেটিন পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।