রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কর সংস্কৃতি: রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ২০ বার

কর সংস্কৃতি: রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক

একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তা শুধু তার উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম সূচক হলো—সেই দেশের নাগরিকেরা কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদান করেন এবং রাষ্ট্র সেই করের অর্থ কতটা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতার সঙ্গে জনকল্যাণে ব্যয় করে। কর কেবল সরকারের রাজস্ব আয়ের উৎস নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক চুক্তির অন্যতম ভিত্তি। তাই একটি শক্তিশালী কর সংস্কৃতি ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা কল্পনা করা কঠিন। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, কর হলো রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান আর্থিক ভিত্তি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো নির্মাণ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, পরিবেশ সংরক্ষণ, কৃষি ভর্তুকি, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সরকারি প্রশাসনের অধিকাংশ ব্যয়ই করের অর্থে পরিচালিত হয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা উল্লেখ করেছে, একটি কার্যকর করব্যবস্থা শুধু সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করে না; এটি আয়বৈষম্য কমানো, দারিদ্র্য হ্রাস, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ কর একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বাংলাদেশে কর আহরণের সম্ভাবনা যথেষ্ট হলেও বাস্তবে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় কম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৭–৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যেখানে উন্নয়নশীল বহু দেশে এই হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশেরও বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। এর অর্থ হলো, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তুলনায় সরকার তুলনামূলক কম রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং জনসেবার মানোন্নয়নে আর্থিক সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর তুলনায় আয়কর রিটার্ন দাখিলকারী ও নিয়মিত করদাতার সংখ্যা এখনও খুবই সীমিত। অথচ দেশের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে, নতুন উদ্যোক্তা ও উচ্চ আয়ের মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এই বাস্তবতায় করের আওতা বৃদ্ধি এবং নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। করের ভিত্তি যত বিস্তৃত হবে, ততই ব্যক্তিপ্রতি করের চাপ কমবে এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব সক্ষমতা বাড়বে।
কর প্রদানে অনীহার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। প্রথমত, অনেক নাগরিক মনে করেন তাঁদের দেওয়া করের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হয় না। সরকারি ব্যয়ে অপচয়, দুর্নীতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন মানুষের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণায় কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। নাগরিক যদি মনে করেন তাঁর করের অর্থ জনকল্যাণের পরিবর্তে অপচয় হচ্ছে, তবে স্বাভাবিকভাবেই কর প্রদানের আগ্রহ কমে যায়। দ্বিতীয়ত, কর আইন ও কর প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেক মানুষের পর্যাপ্ত ধারণা নেই। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার, নতুন উদ্যোক্তা কিংবা স্বনিযুক্ত অনেক ব্যক্তি জানেন না কখন কর দিতে হয়, কীভাবে রিটার্ন জমা দিতে হয় কিংবা কোন আয়ের ওপর কর প্রযোজ্য। ফলে অজ্ঞতার কারণেও অনেক সম্ভাব্য করদাতা করব্যবস্থার বাইরে থেকে যান। তাই কর সচেতনতা বৃদ্ধি এখন অত্যন্ত জরুরি। তৃতীয়ত, কর ফাঁকি এবং অবৈধ অর্থ পাচারও একটি বড় সমস্যা। যখন সমাজে দেখা যায় যে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর ফাঁকি দিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন নিয়মিত করদাতাদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়। করব্যবস্থার মূলনীতি হওয়া উচিত আইনের চোখে সবাই সমান। করযোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই নিয়ম কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের কর প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তনও এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ই-টিআইএন, অনলাইন আয়কর রিটার্ন, ই-পেমেন্ট, অনলাইন করসেবা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে করব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে করদাতাদের সময় ও ব্যয় কমেছে এবং সেবার মানও উন্নত হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে মানবিক যোগাযোগ কমে, ফলে দুর্নীতির সুযোগও হ্রাস পায়। বিশ্বব্যাংক মনে করে, ডিজিটাল কর প্রশাসন রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, কর ফাঁকি কমানো এবং করদাতার আস্থা অর্জনের একটি কার্যকর উপায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে কর প্রশাসনকে আরও কার্যকর করা সম্ভব। উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যেই এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর ফাঁকি শনাক্ত করছে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করে তুলছে। কর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে শিক্ষার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক শিক্ষা শুধু ভোটাধিকার শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বরং কর প্রদানের নৈতিক ও সাংবিধানিক গুরুত্ব সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের ধারণা দিতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে নাগরিক দায়িত্ব, অর্থনীতি ও কর ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে কর প্রদানের ইতিবাচক দিক তুলে ধরা প্রয়োজন। একজন নাগরিক যখন উপলব্ধি করবেন যে তাঁর করের অর্থেই একটি বিদ্যালয়, হাসপাতাল, সেতু, মহাসড়ক বা নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, তখন কর প্রদানের মানসিকতাও ইতিবাচক হবে। কর ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করাও জরুরি। করের বোঝা যেন কেবল সীমিতসংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর না পড়ে, বরং করযোগ্য সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ানো এবং পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরতা কমানো দরকার। কারণ পরোক্ষ কর অনেক ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি অপরিহার্য। একই সঙ্গে কর নীতিকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে বরং আরও উৎসাহিত হয়। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক একমুখী নয়; এটি পারস্পরিক দায়িত্ব ও বিশ্বাসের সম্পর্ক। নাগরিক কর দেবেন, আর রাষ্ট্র সেই করের অর্থ স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে জনকল্যাণে ব্যয় করবে। এই ভারসাম্যই একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। করদাতা যদি উন্নত সেবা পান, দুর্নীতি কমে এবং সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়, তবে স্বেচ্ছায় কর প্রদানের সংস্কৃতিও শক্তিশালী হবে। স্মার্ট, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়তে কর সংস্কৃতির বিকাশের কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রের উচিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আর নাগরিকের উচিত কর প্রদানকে বোঝা নয়, বরং দেশের উন্নয়নে নিজের অংশগ্রহণ হিসেবে বিবেচনা করা। রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয়ের এই যৌথ দায়িত্ববোধই একটি সমৃদ্ধ, টেকসই ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করবে।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দৈনিক মানবকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।