ঘুষের ব্যাধি, সমাজের অন্তরায়
ঘুষের ব্যাধি, সমাজের অন্তরায়
ঘুষ আমাদের চলমান সমাজে নতুন কোনো সমস্যা নয়। বাড়তি টাকার বিনিময়ে একটি কাজ করাতে, কোনো ফাইল দ্রুত এগিয়ে নিতে ‘খরচ’ করা কিংবা নিজের ন্যায্য সেবা পেতে কর্মকর্তাকে বেআইনি টাকা দিতে বাধ্য হওয়া- এসব ঘটনা আমাদের চারপাশে এখন খুব সহজেই চোখে পড়ে। অনেকেই বিষয়টিকে এমনভাবে মেনে নিয়েছেন যেন ঘুষ দেওয়া-নেওয়া সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজেরই একটি স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু বাস্তবে ঘুষ কোনো স্বাভাবিক নিয়ম নয়। বরং এটি সভ্য সমাজ বিনির্মানে একটি বড় সামাজিক ব্যাধি। এর বিস্তার যত বাড়ে, সমাজে ন্যায়, সততা, যোগ্যতা ও মানুষের পারস্পরিক আস্থা তত দুর্বল হয়। বাংলাদেশে ঘুষের বিস্তার যে কতটা গভীর, তার সাম্প্রতিক চিত্র পাওয়া যায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সেবাখাতে দুর্নীতি জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫ – এ। ২৫ জুন ২০২৬ প্রকাশিত এই জরিপে দেখা যায়, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে দেশের ৮১.৬ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন এবং ৬৩.৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় দুর্নীতির অভিজ্ঞতা ১৫.১ শতাংশ এবং ঘুষের অভিজ্ঞতা ২৫.২ শতাংশ বেড়েছে। জরিপ মতে, ২০২৫ সালে সেবাখাতে ঘুষ লেনদেনের আনুমানিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। কারণ একজন নাগরিক যখন তার প্রয়োজনীয় সেবার বিনিনয়ে ঘুষ দিতে বাধ্য হন, তখন রাষ্ট্রের সুশাসনের প্রতি তার অনাস্থা বাড়ে। যে সেবা আইন অনুযায়ী বিনা ঘুষে পাওয়ার কথা, সেটিই যদি টাকা ছাড়া পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে ধরে নিতে শুরু করে, ঘুষ ছাড়া এই সিস্টেমে কোন কিছুই হয় না। এভাবেই একটি অন্যায় আচরণ সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ঘুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি এখানেই। এটি শুধু টাকা নেয়-দেয় না; মানুষের চিন্তাভাবনাকেও বদলে দেয়। আজ যে ব্যক্তি অনিচ্ছায় ঘুষ দিলেন, কাল হয়তো তিনিই অন্য কোনো কাজে ঘুষ দেওয়াকে স্বাভাবিক মনে করবেন। আবার যে কর্মকর্তা ঘুষ নিয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, তার কাছে সততা ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। এভাবে ঘুষ একটি চক্র তৈরি করে, যার ভেতরে সাধারণ নাগরিক, কর্মকর্তা ও মধ্যস্বত্বভোগী। সবাই কোনো না কোনোভাবে আটকে যেতে পারে।
ঘুষের কারণে যোগ্যতারও অবমূল্যায়ন হয়। যেখানে চাকরি, ব্যবসা, লাইসেন্স, অনুমোদন কিংবা সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতার বদলে টাকা বা প্রভাব বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, সেখানে মেধাবী ও পরিশ্রমী মানুষ পিছিয়ে পড়েন। অযোগ্য ব্যক্তি সুযোগ পেয়ে যায়, আর যোগ্য ব্যক্তি হতাশ হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয় এবং সমাজে অন্যায় প্রতিযোগিতা বাড়ে। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। একজন স্বচ্ছল ব্যক্তির দ্বারা কোনো সেবা পেতে অতিরিক্ত টাকা প্রদান কোন সমস্যা নয়; কিন্তু একজন কৃষক, দিনমজুর কিংবা নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য কয়েক হাজার টাকা অনেক বড় বোঝা। ফলে ঘুষ সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়ায়। যার টাকা আছে, সে দ্রুত সেবা পায়; যার টাকা নেই, তাকে অপেক্ষা, হয়রানি কিংবা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশের দুর্নীতি পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতিবিষয়ক বৈশ্বিক সূচক ২০২৫, যা ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ২৪/১০০ এবং অবস্থান ১৫০তম। এই সূচক সরাসরি ঘুষের পরিমাণ মাপে না; সরকারি খাতের দুর্নীতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের ধারণার ভিত্তিতে দেশগুলোর তুলনা করে। ঘুষ কমাতে শুধু আইন করলেই হবে না। সরকারি সেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল পেমেন্ট, সেবার নির্ধারিত সময় প্রকাশ, আবেদন কোন পর্যায়ে আছে তা জানার ব্যবস্থা এবং কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ঘুষের সুযোগ কমাতে পারে। একই সঙ্গে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে এর পাশাপাশি আমাদের সামাজিক মানসিকতারও পরিবর্তন আবশ্যক। ‘অতিরিক্ত টাকা দিলে কাজটা দ্রুত হবে’, ‘সবাই তো দেয়’, ‘না দিলে কাজ হবে না’- এই ধারণাগুলো ঘুষের সংস্কৃতিকে দীর্ঘ করে রেখেছে। নাগরিককে যেমন ঘুষ না দেওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ঘুষ না দিয়েও একজন নাগরিক তার প্রাপ্য সেবা সময়মতো পান। ঘুষের বিরুদ্ধে লড়াই তাই শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের সবার দায়িত্ব। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র থেকে প্রশাসন সব জায়গায় সততা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ দুর্নীতিকে শুধু আইন দিয়ে পুরোপুরি নির্মূল করা যায় না; এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও তৈরি করতে হয়। ছোট একটি ঘুষ অনেক সময় বড় একটি সামাজিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ঘুষের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া মানে শুধু দুর্নীতি কমানো নয়; এটি ন্যায়, যোগ্যতা, আস্থা ও সুশাসনের ভিত্তি শক্ত করা। ঘুষে হয়তো ব্যক্তির কাজ এগিয়ে যায়, কিন্তু ঘুষের বিস্তারে সমাজ পিছিয়ে যায়। তাই ঘুষের ব্যাধি সমূলে উৎপাটন করা শুধু দুর্নীতিবিরোধী কাজ নয় এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সুস্থ সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে
প্রতিদিনের সংবাদ
পত্রিকায় প্রকাশিত।
