রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

মাটির খেলনা: প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ২৩ বার

মাটির খেলনা: প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প

প্রতিটি মানুষের শৈশব আছে এবং সেই শৈশবেরও রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; থাকে মানুষের স্মৃতিতে, গ্রামের মেলায়, মাটির গন্ধে এবং ছোট্ট ছোট্ট খেলনার মধ্যে। একসময় গ্রামবাংলার শিশুর হাতে দেখা যেত মাটির ঘোড়া, হাতি, পাখি, পুতুল কিংবা ক্ষুদ্র হাঁড়ি-পাতিলের সেট। এই মাটির তৈরী আসবাবপত্র ছিল গ্রামীণ অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির গল্প। আজ সেই মাটির খেলনার জায়গা দখল করেছে রঙিন প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক খেলনা এবং মোবাইলনির্ভর বিনোদন। বাজারের দৃষ্টিতে এটি হয়তো স্বাভাবিক পরিবর্তন। কিন্তু সংস্কৃতির দৃষ্টিতে আমরা কি শুধু একটি খেলনা হারাচ্ছি, নাকি হারিয়ে ফেলছি আমাদের লোকশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ? বাংলার মৃৎশিল্পের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বাংলায় মৃৎশিল্পের ইতিহাস বহু প্রাচীন এবং বাংলাদেশে মহাস্থানগড়, ময়নামতি, পাহাড়পুর, ওয়ারী-বটেশ্বরসহ বিভিন্ন প্রত্নস্থানে প্রাচীন মৃৎপাত্রের নিদর্শন পাওয়া গেছে। মাটির সহজলভ্যতা এই অঞ্চলের শিল্প ও দৈনন্দিন জীবনে মৃৎশিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে মাটি শুধু হাঁড়ি-কলসি তৈরির উপাদান থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে শিল্প, ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং শিশুদের খেলনার মাধ্যম। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুমার বা পাল সম্প্রদায়ের কারিগররা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাটির তৈরি পণ্য ও খেলনা নির্মাণ করে আসছেন। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মাটির তৈরি পুতুল, খেলনা ও ফলের প্রতিরূপ গ্রামীণ মেলা ও উৎসবে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় ছিল। পুতুল, পশুপাখি, ছোট রান্নাঘরের সামগ্রী এসব শুধু শিশুদের খেলার উপকরণ ছিল না; এগুলো গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতিরও প্রতিচ্ছবি।
একটি মাটির খেলনা তৈরির মধ্যেও রয়েছে শ্রম ও শিল্পের সমন্বয়। মাটি সংগ্রহ করা, তা প্রস্তুত করা, হাতে আকার দেওয়া বা ছাঁচে তৈরি করা, রোদে শুকানো, আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা এবং পরে রং বা অলংকরণ প্রতিটি ধাপই একজন কারিগরের দক্ষতার পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশে মাটির পুতুল ও খেলনা সাধারণত হাতে গড়ে বা ছাঁচ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। অর্থাৎ একটি খেলনা শুধু একটি পণ্য নয়; তার পেছনে থাকে মানুষের সময়, অভিজ্ঞতা ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা দক্ষতা। কিন্তু আধুনিক বাজারব্যবস্থা এই শ্রমনির্ভর শিল্পের জন্য কঠিন প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে। প্লাস্টিকের খেলনা কারখানায় বিপুল পরিমাণে তৈরি করা যায়। এগুলো রঙিন, সহজলভ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে টেকসই। ফলে শিশুদের পছন্দও দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। আজকের শিশুর সামনে রয়েছে খেলনার অসংখ্য বিকল্প। সে কারণে হাতে তৈরি একটি মাটির ঘোড়া বা পুতুল তার কাছ আকর্ষণীয় নয় । ২০২৬ সালে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির খেলনার কারিগরদের সংকটের একই চিত্র উঠে এসেছে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে কারিগররা জানিয়েছেন, একসময় মাটির পুতুল, ছোট রান্নাঘরের খেলনা ও পশুপাখির মূর্তির ভালো চাহিদা থাকলেও এখন বাজার ভরে গেছে প্লাস্টিকের খেলনায়। চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাটি, জ্বালানি ও রঙের ব্যয় বৃদ্ধিও তাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেক কারিগর ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে অন্য কাজের দিকে ঝুঁকছেন। একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে দেশের অন্য প্রান্তেও। লালমনিরহাটের মৃৎশিল্পীরা সাম্প্রতিক সময়ে জানিয়েছেন, প্লাস্টিকের সস্তা ও রঙিন খেলনার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। কাঁচামাল, জ্বালানি, রং ও পরিবহন ব্যয় বাড়লেও হাতে তৈরি খেলনার দাম ইচ্ছামতো বাড়ানো যায় না। কারণ বেশি দাম হলে ক্রেতা সহজেই কারখানায় তৈরি অন্য পণ্যের দিকে চলে যান। এখানে সবচেয়ে বড় সংকট শুধু বিক্রি কমে যাওয়া নয়; সংকট হলো উত্তরাধিকার হারিয়ে যাওয়ার। একজন কারিগর যখন দেখেন যে সারাদিন কাজ করেও পরিবারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি চান তাঁর সন্তান অন্য পেশায় যাক। এতে হয়তো একটি পরিবার আর্থিকভাবে নতুন পথ খুঁজে পায়, কিন্তু একটি ঐতিহ্যবাহী দক্ষতার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। শ্রীমঙ্গলের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে কারিগরদের কথায় এই বাস্তবতাই উঠে এসেছে। অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান অবস্থায় সন্তানদের এই পেশায় রাখার ভবিষ্যৎ নেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে হাত মাটিকে খেলনায় রূপ দিয়েছে, সেই হাতের উত্তরসূরি যদি আর না থাকে, তাহলে একসময় এই শিল্প সংরক্ষণ করতে শুধু ছবি, জাদুঘর কিংবা বইয়ের ওপর নির্ভর করতে হবে। তবে মাটির খেলনা হারিয়ে যাওয়ার দায় শুধু প্লাস্টিকের নয়। আমাদের ভোক্তা সংস্কৃতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রায়ই ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করি, কিন্তু ঐতিহ্যবাহী পণ্য কেনার সময় আধুনিক বিকল্পের দিকে চলে যাই। লোকজ শিল্পকে আমরা জাদুঘরের বস্তু হিসেবে দেখতে ভালোবাসি, কিন্তু শিল্পীকে তাঁর কাজের মাধ্যমে টিকে থাকার মতো বাজার দিতে পারি না। মাটির খেলনাকে বাঁচাতে হলে তাই শুধু আবেগ দিয়ে কাজ হবে না। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। প্রথমত, কারিগরদের জন্য বাজার সম্প্রসারণ জরুরি। স্থানীয় মেলা ও বৈশাখী উৎসবের বাইরে অনলাইন ও শহুরে বাজারে এই পণ্যের জায়গা তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঐতিহ্য বজায় রেখেও নকশায় নতুনত্ব আনতে হবে। শিশুদের বর্তমান আগ্রহ ও রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় নতুন ধরনের মাটির খেলনা তৈরি করা সম্ভব। তৃতীয়ত, কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। সহজ শর্তে ঋণ, উৎপাদন সহায়তা এবং বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ তাদের পেশা টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হতে পারে।  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুদের লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খেলনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্থানীয় মেলা কিংবা শিশুদের হাতে-কলমে শিল্প শেখানোর উদ্যোগের মাধ্যমে মাটির খেলনার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। এখানে পরিবেশের প্রশ্নটিও উপেক্ষা করা যায় না। প্লাস্টিকের ব্যবহার ও বর্জ্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সেই বাস্তবতায় প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি, হাতে গড়া এবং দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসসম্পন্ন পণ্যের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি করা সম্ভব। তবে শুধু প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে নয়, মাটির খেলনাকে দেখতে হবে বাংলাদেশের লোকজ শিল্পের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় হিসেবে। মাটির খেলনা হয়তো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। কিন্তু একটি মাটির ঘোড়া বা পুতুল আমাদের এমন একটি পৃথিবীর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে খেলনা তৈরি হতো মানুষের হাতে, বাজারের গতিতে নয়; যেখানে একটি শিশুর আনন্দের সঙ্গে যুক্ত ছিল একজন কারিগরের জীবিকা। সভ্যতার অগ্রগতি মানে পুরনো সবকিছুকে বর্জন করা নয়। আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সহাবস্থান সম্ভব। আজ মাটির খেলনা হয়তো বাজারের কোণে পড়ে আছে, কিন্তু তার সঙ্গে পড়ে আছে বহু কারিগরের শ্রম, স্মৃতি ও পরিচয়। একটি শিল্প হারিয়ে গেলে শুধু কিছু পণ্য হারায় না; হারিয়ে যায় মানুষের দক্ষতা, একটি সম্প্রদায়ের ইতিহাস এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অংশ।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ বুলেটিন পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।