পাবনার বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র অবহেলা-অযত্নে
পাবনার বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র অবহেলা-অযত্নে
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যখন বিজ্ঞানচর্চা বিশ্বজুড়ে ক্রমশ নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, তখন পাবনার এক অখ্যাত গ্রাম্যপল্লি হিমাইতপুরে গড়ে উঠেছিল একটি বিজ্ঞানসাধনার কেন্দ্র- হিমাইতপুর সৎসঙ্গ বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। আনুমানিক ১৯২৪ সালের দিকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের তত্ত্বাবধানে সাধারণ গ্রামবাসীর সহযোগিতায় প্রায় তিন বিঘা জায়গার ওপর গড়ে ওঠে এই দ্বিতল কেন্দ্র। প্রত্যন্ত পল্লিতে এমন একটি বিজ্ঞানকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা সে সময় নিঃসন্দেহে ছিল বিলাসিতা। প্রত্যন্ত পল্লিতে বিজ্ঞানাগার স্থাপনের কথা শুনে অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। অর্থের সংকট ছিল তীব্র। সৎসঙ্গের কর্মীদেরই যখন দৈনন্দিন জীবনে নানা অভাবের মধ্যদিয়ে চলতে হতো, তখন একটি বিজ্ঞানাগার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হওয়াই তো স্বাভাবিক। কিন্তু শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে এটি ছিল গভীর আকাঙ্ক্ষার বিষয়। বনজঙ্গল পরিষ্কার হলো, অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ চলল, আর ধীরে ধীরে বাস্তবভাবে রূপায়িত হলো বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। একসময় কেন্দ্রটি হয়ে ওঠে আশ্রমিক কর্মীদের বিজ্ঞান সাধনার জন্য বেশ সমৃদ্ধ একটি স্থাপনা। মাইক্রোস্কোপ, এক্স-রে যন্ত্র, মাইক্রোটোম, স্পেকট্রোস্কোপ, গ্যালভানোমিটারসহ বিভিন্ন মূল্যবান বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি শ্রীশ্রীঠাকুর সংগ্রহ করেছিলেন। পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, উদ্ভিদবিদ্যা, মনোবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণার আয়োজন ছিল। গবেষণার জন্য পৃথক কক্ষের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বই সংরক্ষণের জন্য গ্রন্থাগার স্থাপনের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। পুরুষ কর্মীদের পাশাপাশি অনেক নারী কর্মীও সেখানে কাজ করতেন। একই সঙ্গে এসব স্থাপনাকে গবেষণা, বিজ্ঞান শিক্ষা, ঐতিহ্যচর্চা কিংবা জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে নতুনভাবে ব্যবহার করার কথাও ভাবা বর্তমান সময়ে প্রাসঙ্গিক। একসময় সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও একটি প্রত্যন্ত গ্রামে বিজ্ঞানচর্চার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল। আজ আমাদের সামর্থ্য অনেক বেশি। তাই প্রশ্নটা কেবল একটি পুরোনো ভবন রক্ষার নয়; প্রশ্ন হলো আমরা আমাদের ইতিহাস, জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য এবং পূর্বসূরিদের স্বপ্নের প্রতি কতটুকু দায়িত্বশীল? বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্রসহ হিমাইতপুরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো তাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার আগে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়াই হবে ইতিহাসের প্রতি আমাদের ন্যূনতম দায়।
