বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে নজর দিন।

Author

মোঃ হাসনাইন রিজেন , হাটহাজারী সরকারি কলেজ চট্টগ্রাম।

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৪ পাঠ: ২৯ বার

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি করছে, তবে সঠিক দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমশক্তির অভাব ও বেকারত্ব দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে, কারিগরি শিক্ষা বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারিগরি শিক্ষা এমন একটি ব্যবস্থা, যা শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে দক্ষতা প্রদান এবং তাদের জীবনযাত্রা উন্নত করতে সহায়তা করে। চতুর্থী শিল্প বিপ্লবে কারিগরি শিক্ষা গুরুত্ব অপরিসীম। চাকরির বাজের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় কোম্পানিগুলো দক্ষ জনবল পাচ্ছে না অন্য দিকে বাংলাদেশে ২৬ লক্ষের ও বেশি স্নাতক সম্পন্ন বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে চাকরির অভাবে। এই সংখ্যাটা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে তবে দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না। পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা ও প্রচারণা অভাবে পিছিয়ে আছে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা।

 

আমাদের পরবর্তী পৃথিবী হবে হাতে কলমে দক্ষতার পৃথিবী। যেখানে বড় বড় ডিগ্রীর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে দক্ষতাকে। কারিগরি শিক্ষা যেমন আপনার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তেমনি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বেকারত্ব হ্রাস, নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তি ও প্রযুক্তি, সামাজিক উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কারিগরি শিক্ষা। আমরা যদি আমাদের গার্মেন্ট শিল্পের দিকে দৃষ্টি আরোপ করি তাহলে দেখতে পাবো দক্ষ হওয়ার কারণে বেকারত্ব হ্রাস পেয়েছে, নারী ক্ষমতায়ন ও সমাজে নারীদের একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে এবং বাংলাদেশর অর্থনীতিতে এই সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কারিগরি শিক্ষা, যা দেশের শিল্প ও সেবাখাতের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে সহায়তা করছে। তবে, এই খাতের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও রয়েছে। কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামজের আগ্রহের অভাব লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও তাত্ত্বিক শিক্ষা এবং সাধারণ শিক্ষার প্রতি বেশি আগ্রহী। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব কম হয়ে থাকে, যার কারণে অনেক শিক্ষার্থী এই ক্ষেত্রটিকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করে না। গ্রামীণ এলাকায় এটি আরো নেতিবাচক। তারা তাদের সন্তানের ছোট থেকেই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করে। তারা মনে করে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় ভালো এবং সম্মানের চাকরি পাওয়া যায়। গ্রামীণ মানুষের নেতিবাচক এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে সরকারের উচিত এখনই জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

 

মানসম্মত শিক্ষার অভাবেই পিছিয়ে আছে কারিগরি শিক্ষা। বাংলাদেশের বেশিরভাগ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নত নয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান মডার্ন টেকনোলজি, দক্ষ প্রশিক্ষক, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং শিক্ষাদান পদ্ধতির দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া, কারিগরি শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক ল্যাব, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ইন্টার্নশিপ সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদানকারী অভিজ্ঞ ট্রেইনারদের অভাব রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থাকে এবং তারা বাস্তব জীবনে দক্ষতার সাথে কাজ করতে ব্যর্থ হয়। কারিগরি শিক্ষার সিলেবাস প্রণয়ন এবং শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ কিছুটা পুরনো এবং শিল্প খাতের বর্তমান চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তথ্য প্রযুক্তি, রোবটিক্স, অটোমেশন, টেলিকমিউনিকেশন এবং অন্যান্য আধুনিক শিল্পখাতে যে ধরনের দক্ষ কর্মী প্রয়োজন, সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণ সিস্টেম এখনও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশর কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা। অধিকাংশ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুরনো কিউলিং প্রযুক্তি, ম্যানুয়াল পদ্ধতি এবং অপ্রচলিত পেশায় দক্ষতা অর্জনের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, যা বর্তমান সময়ের প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

 

নতুন শিল্প খাতে দক্ষ কর্মী তৈরিতে নজর দিতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক নতুন শিল্প খাত গড়ে উঠছে, যেমন আইটি, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ই-কমার্স, ইলেকট্রিক্যাল এবং অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি। এই শিল্পগুলোর জন্য দক্ষ কর্মী প্রস্তুত করতে হলে কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে দক্ষ আইটি বিশেষজ্ঞ, সফটওয়্যার ডেভেলপার এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী তৈরি করা সম্ভব হবে। আগামী দিনে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এই নতুন দক্ষতার দিকে অগ্রসর হবে। বাংলাদেশের তরুণরা যদি কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ হয়ে ওঠে, তবে তারা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। অনেক বিদেশি কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত কর্মী নিতে আগ্রহী। বিশেষত, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য উন্নত দেশগুলোতে উচ্চতর দক্ষতার কাজের সুযোগ বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দরজা খুলে দেবে।

 

বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষার জন্য কার্যকর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন অ্যাকসেলারেটিং অ্যান্ড স্ট্রেনদেনিং স্কিলস ফর ইকনমিক ট্রান্সফরমেশন (এসেট)প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন করণ, ইন্টারন্যাশনাল পলিটেকনিক স্থাপন, চার মাস মেয়াদী বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও আরপিএল এর আওতায় দক্ষ জনবলকে সার্টিফিকেট প্রধান করা হচ্ছে। এছাড়া ও প্রতিটি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ নির্মান প্রকল্প, ফোর ইঞ্জিনিয়ারিং, এবং নতুন তেইশটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্প চলমান আছে।

 

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষায় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণে এই খাতের উন্নয়ন সম্ভব। কারিগরি শিক্ষা সমাজের নকশা পাল্টাতে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতে, এই খাতের সম্ভাবনা অনেক বেশি, এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বাংলাদেশ একটি দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১১ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে দৈনিক খোলা কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!