বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বিপ্লব পরবর্তী প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির এক বছর

Author

মোঃ রুহুল আমিন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৫ পাঠ: ৩৪ বার

২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশ এক ঐতিহাসিক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছিল। তরুণ-ছাত্র সমাজের আহ্বানে কোটি মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল—বুকে ছিল ক্ষোভ, কণ্ঠে ছিল সাহস আর চোখে ছিল পরিবর্তনের স্বপ্ন। এই বিপ্লব ছিল দীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসন, দুর্নীতি, গুম, বাকস্বাধীনতা হরণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত অভ্যুত্থান। এক বছর পেরিয়ে এসে আজ প্রশ্ন ওঠে—এই বিপ্লব কি সত্যি কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ার পথে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে? না আবারও তৈরি হচ্ছে নতুন স্বৈরতন্ত্র? মানুষ কি বিপ্লবের সুফল পাচ্ছে? মুক্তিযুদ্ধ যেমন আওয়ামীলীগ নিজেদের দলীয় সম্পত্তি হিসাবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটিয়ে নিয়েছিলো সেভাবে কোন দল গনঅভ্যুত্থানকে ব্যবহার করছে না তো? এসব প্রশ্ন রয়েই যায়।

গনঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি হতে চলছে, এই এক বছরে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে কি? প্রাপ্তির খাতায় কি যুক্ত হয়েছে সেটির হিসাব মিলানোর সময় হয়েছে। গত এক বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যারা তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গঠিত। তারা এক পক্ষপাতহীন প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগও নিয়েছে। তবে এই স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি দুর্বল রাষ্ট্রকে পুরোপুরি রূপান্তর করা সম্ভব নয়—এটি যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, মানুষ এখন পরিবর্তনের আশায় বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চায়। কিছু ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিজেদের সাফল্য দেখিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দিতে বাধ্য করার পদক্ষেপ নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এটি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। কয়েকজন আলোচিত ব্যক্তির (যেমন: বেনজীর আহমেদ, মতিউর রহমান) বিরুদ্ধে তদন্তও শুরু হয়েছে। তারপরও বেশিরভাগ জায়গায় দুর্নীতি বহাল তবিয়তে বজায় রয়েছে। আবারও নতুন বেনজির, মতিউর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।

গণমাধ্যমে বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে। সাংবাদিকদের উপর পূর্বের মত দমন-পীড়নের মাত্রা কমেছে। কয়েকটি গণমাধ্যম পুনরায় চালু হয়েছে। তবে পুরোপুরি স্বাধীনতার জায়গায় পৌঁছানো এখনো বাকি। আওয়ামিলীগের মতো রাজনৈতিক দলগুলোও গণমাধ্যমের টুটি চেপে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো গণমাধ্যম দখল করে নিচ্ছে। কিছু গণমাধ্যম দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা এখনো নিশ্চিত হয় নাই সেখানে দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা তো বিলাসিতা। মত প্রকাশে হুমকি, হামলা, মামলাসহ রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে ভিন্ন মত দমনের রাজনীতি এখনো বিরাজমান।

ছাত্র-তরুণদের সমাজকে বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, ট্রাফিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও পরিবেশ সচেতনতায় তরুণদের অংশগ্রহণ প্রশংসনীয়। এটি নতুন এক মানবিক বাংলাদেশ গড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু রাষ্ট্র যে তরুণদের হাত ধরে বিনির্মানের স্বপ্ন দেখেছিলো সেটি আজ বেশ কিছু জায়গায় মলিনও হয়ে গেছে। বিভিন্ন তরুণ ছাত্র সমাজ সমন্নয়ক নাম ধারণ করে চাঁদাবাজি সহ নানা অপকর্মে জরিয়ে গেছে। কিছু রাজনৈতিক দলও এতে জড়িয়ে পড়েছে। বিগত ১৬ বছর ধরে ক্ষুধার্ত বিড়ালরা এখন বাঘ হয়ে গিয়েছে। আওয়ামী লীগের স্থানগুলো তারা দখল করে নিয়েছে।

নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার সহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক সংলাপের সূচনা করেছে। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে পুনর্বিবেচনা চলছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং রাজনৈতিক ঐক্য নষ্ট হওয়ায় সরকার সংস্কার কাজে উল্লেখযোগ্য কোন কাজ করতে পারে নাই। দুঃখজনক হলেও সত্য গণঅভ্যুত্থানের সময় দলগুলো এক হয়ে কাজ করলেও রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে দলীয়  স্বার্থের বেড়াজালে বন্দী হয়ে পড়েছে। নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা হয়েছে বলে দাবি থাকলেও, জনগণের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। প্রবাসীদের ভোটাধিকার ও ডিজিটাল ভোটিং ব্যবস্থাও ঝুলে আছে।

বিচার বিভাগ এখনো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। সাগর-রুনি, তনু, মুনিয়া—এমন অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। গুম ও খুনের ঘটনা নিয়ে ট্রাইব্যুনাল বা কমিশনের কাজ শুরু হয়নি। দেশে খুন ধর্ষণ এর সংখ্যা বেড়েই চলছে কিন্তু মামলা গুলো বিচারের মুখ দেখছে না। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির ঘটনায় বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না। নারীদের চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়নি। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের  বিচার করতে পারে নাই। গণঅভ্যুত্থানের দেশের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা অহরহ জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো আবার ফুলের মালা পড়িয়ে তাদের বরণ করে বিশাল শোডাউন করেছে। দেশে মব জাস্টিসের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজমান। দেশের সাধারণ মানুষের জান মাল এখনো নিরাপদ নয়। দেশের বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।

স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশার উন্নতি হয় নাই। রাষ্ট্রের কর্তা ব্যাক্তি বর্গ এখনো সামান্য অসুস্থতায় বিদেশে চলে যান। এটাই প্রমাণ করে—সাধারণ মানুষ যে চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল, সেটি এখনো ভেঙে পড়া। শিক্ষা ও শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক এবং উপর মহলের সুপারিশের জঘন্য সিস্টেম এখনো বিদ্যামান। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদ ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে এখনো দল, ফোরাম, কোরামের রাজনীতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পড়াশোনার চেয়ে রাজনীতি চর্চা বেশি হচ্ছে।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে রাষ্ট্র এবং সংবিধান সংস্কারের পাশাপাশি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া। কোন রাজনৈতিক দল যেন বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। অপরাধীরা যেন বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের হওয়ার কারণে অবাধে সব কিছু করতে না পারে। দেশের জনগণ তাদের ভোটাধিকার ফিরে পায়। ভোট কেন্দ্র গুলোতে যেন পেশিশক্তির আধিপত্য না থাকে। গনতন্ত্র যেন শুধু মুখের বুলি না হয়ে সব জায়গায় এর প্রতিফলন ঘটে।

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ডে যেন রাজনীতি, ঘুষ বা অন্য কোন অপশক্তি আঘাত করতে না পারে সেটির খেয়াল রাখতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থায় মেধাভিত্তিক সংস্কার করতে হবে। মেধাবীদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিতে হবে। সুশাসনের জন্য প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ সহ দেশের প্রশাসন রাজনৈতিক বলয়ে আবদ্ধ। পুলিশ সহ সকল ধরনের প্রশাসন থেকে রাজনৈতিক প্রভাব যেন বিস্তার করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিজ পরিবার থেকেই দুর্নীতি প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। নাগরিক সমাজ সচেতনত না হলে শুধু সরকার বা প্রসাশনের দ্বারা দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।

এক বছর সময়ে সবকিছু বদলানো যায় না, তবে দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। আজ যারা নতুন বাংলাদেশ গড়ার নেতৃত্বে আছেন, তাদের সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে—নিজের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর। জুলাই গণবিপ্লব ছিল স্বপ্নের শুরু। সে স্বপ্ন পূরণ করতে হলে প্রতিটি নাগরিককে হতে হবে সচেতন, সাহসী ও দায়িত্বশীল। তবেই গড়ে উঠবে তারুণ্যের সোনার বাংলাদেশ।

লেখক,
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া এবং সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৫ আগস্ট ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশের খবর, প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!