বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আগামীর বাংলাদেশ হোক তারুণ্যের

Author

মোঃ রুহুল আমিন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ পাঠ: ৫৬ বার

ছাত্র জনতার গণবিপ্লবের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংস্কার চলছে। দেশের কিছু কিছু  অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বন্যার্তদের সহযোগিতার পুরা বাংলাদেশ এক হয়ে কাজ করছে। এ যেন এক নতুন বাংলাদেশ। এমন বাংলাদেশ তো আমাদের চাওয়া যেখানে একে অন্যের খারাপ সময়ে সহায়তা এগিয়ে আসবে। গত ১৬ বছরে দেশের সকল জায়গায় ঘুষ, দূর্নীতি, লুটরাজ এবং বিভিন্ন ধরনের অপসংস্কৃতি চালু হয়েছে। নির্বিচারে মানুষ হত্যা, গুম, মানুষের প্রতি অত্যাচার, জুলুম, মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ সহ অনেক অপকর্ম সাধিত হয়েছে। ধর্ষণ, নিয়োগ দূর্নীতি, খাদ্য ভেজাল ও সড়ক দূর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনায় রূপান্তরিত হয়েছে। দূর্নীতি করে সরকার দলীয় নেতা, এমপি, মন্ত্রী,  আমলারা সম্পদের পাহাড় তৈরি করেছে। মতিউরের ছেলের ছাগল কান্ড, বেনজিরের দূর্নীতি, দেশ থেকে টাকা পাচার, কানাডার বেগম পাড়ায় সরকারি আমলাদের ঘর বাড়ি সহ অনেক থলের বিড়াল বেড়িয়ে এসেছে। তারুণ্য এবং অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভঙ্গুর দেশকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসতে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু অনেক স্বার্থান্বেষী মহল বিগত সরকারের পেতা আত্মা বিভিন্ন ভাবে দাবি নিয়ে আন্দোলন করে সরকারকে চাপে ফেলছেন। কেউ কেউ আবার সরকারকে চাপের মুখে ফেলে দাবি আদায়ে সফলও হচ্ছেন। গত ১৬ বছর আপনাদের দাবি কোথায় ছিলো? তখন কেন আন্দোলনে নামেননি। আমাদের মনে রাখতে হবে ১৬ বছরের ধরে তৈরী করা সংস্কৃতি একমাসে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের কিছু সংস্কৃতি পরিবর্তনের জন্য ইতিমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি সকল কর্মচারীর সম্পদের হিসাব চেয়েছেন। এটি প্রসাংশার দাবিদার। এভাবে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীর সম্পদের হিসাব রাখলে দূর্নীতি করে টাকা পয়সা পাহাড় গড়তে পারবে না। স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হলে নিজেকে আগে পরিবর্তন করতে হবে। গণবিপ্লবের বেশির ভাগ বিপ্লবী আমাদের ছাত্র সমাজ। আমরা যদি নিজেদের পরিবার থেকে পরিবর্তন শুরু করি তাহলে দেশে পরিবর্তন খুব সহজে সম্ভব। যারা দূর্নীতি, অনিয়ম করে তারা কারো না কারো বাবা-মা, ভাই-বোন। নিজের বাবা-মা ভাই-বোন তথা পরিবারের লোকজনের কাছে যদি আমরা আয়ের উৎস সম্পুর্ন হালাল নিশ্চিত হতে পারি তাহলে সমাজে দূর্নীতি থাকবে না। আমরা যদি নিজে থেকে ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে না ফেলি, ট্রাফিক আইন মেনে চলি, সকল আইন কানুন মেনে চলি তাহলে দেশটা আরো সুন্দর হবে।

আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ মত প্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। প্রত্যেক নাগরিক তার মত এবং দ্বিমত নির্দ্বিধায় প্রকাশ করতে পারবে। মত প্রকাশের কারণে তাকে কেউ হুমকি, হামলা, মামলা করবে না। আবরার ফাহাদের মতো কেন মায়ের বুক খালি হবে না। আমরা দেখেছি স্বৈরশাসক হাসিনা সরকারের আমলে ভিন্ন মতের মানুষ হলে তাকে জামাত, শিবির, বিএনপি বলে ট্যাগ দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। একই কায়দায় এখন কোন রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে যেন ভিন্ন মত দমন করা না হয়।

রাষ্ট্রের গণমাধ্যম হবে স্বাধীন। গণমাধ্যম রাষ্ট্রের প্রচার মাধ্যম। এরা কারো না কারো মহত্ম প্রচার। নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করে না, এরা এদের আদর্শ প্রচার করে। যে কোন আদর্শের হোক না কেন তা হওয়া দরকার জনগণের গনমাধ্যম। নিজেদের আদর্শের চেয়ে জনগণের অধিকার, প্রত্যাশা, সংকটময় সময়ে জনগণের পাশে থাকতে হবে। আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি সরকার গণমাধ্যমকে নিজেদের মত করে পরিচালনা করে। কোন তথ্য প্রচার করলে সেটি নিজেদের বিপক্ষে গেলে গণমাধ্যমে টুটি চেপে ধরতে পিছপা হয়না। গত বছর গুলোতে সত্য প্রচার করায় অনেক গণমাধ্যম বন্ধ করা হয়েছে। যার উদাহরণ হিসাবে আমরা গনমাধ্যম সূচক দেখতে পাই, ২০০৯ সালে গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিলো ১২১ যার সর্বশেষ অবস্থান ১৬৫। বিভিন্ন সময় সাংবাদিক হয়রানি, হামলা-মামলা, হুমকি, নির্যাতন ও পেশাগত ঝুঁকিই এই অবনতির প্রধান কারণ। ১২ বছরেও সাগর-রুনি হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন হয়নি। তারুণ্যে বাংলাদেশে আমার চাওয়া থাকবে মুক্ত গণমাধ্যম।

গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে। আমাদের গনতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা দেখেছি আওয়ামীলীগ, বিএনপি সহ সকল জোট রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় গেলে অবৈধ ভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করেন। ক্ষমতায় না থাকলে আবার তারা গনতন্ত্রে বুলি আওরায়। দেশে যেন আর কোন স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ সরকার না তৈরী হয় সেজন্য যে আইন ও সংবিধান সংস্কার প্রয়োজন হলে তা করতে হবে। দেশের নির্বাচন কমিশন সহ সরকারের সকল ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। জনগনের ভোটাধিকার ফেরত দিতে হবে। সকল নাগরিককে তার গনতান্ত্রিক অধিকার দিতে হবে। প্রবাসীরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা যেন বিদেশে থেকে ভোট দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের যত রাজনৈতিক হামলা, রাজনৈতিক হত্যা হয়েছে সকল কিছুর বিচার করতে হবে। সকল রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনীতিতে সকল দলের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। কেউ যেন নির্বিচারে মানুষ না মারতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সমাজকে হতে হবে একটি সামাজিক উদ্যান। যেখানে বিভিন্ন ধরনের গাছে ফুল থাকবে। সকল ফুল তাদের মর্যাদা ও সমান অধিকার পাবে। যেখানে ধনী গরীব সকলে সমান হবে। প্রতিবেশীরা একে অপরের কল্যানে এগিয়ে আসবে। সবার মধ্যে হিংসা আক্রোশ বিদ্বেষ থাকবে না, সহযোগিতা মূলক মনোভাব। দূর্বলরা যেখানে প্রবলদের দ্বারা নির্যাতিত হবে না।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। এমন শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরী করতে হবে যেন উন্নত দেশগুলোর সাথে আমরা লড়াই করতে পারি। গবেষণা খাতে উন্নয়ন করতে হবে কারণ নতুন উদ্ভাবন পারে একটি দেশকে উন্নয়নেয় দিকে এগিয়ে যেতে। জাতির মেধাবী তরুণরা যারা উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাহিরে যায় বেশির ভাগ দেশে ফিরে আসে না। এর কারণ হতে পারে দেশে এসে তারা বিদেশের মত সমান সুযোগ পায় না। ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশায় থাকে কারণ দেশে মেধার মূল্যায়ন হয় না। তারা যেন দেশে ফিরে এসে তাদের অভিজ্ঞতা এবং অর্জিত জ্ঞান যেন দেশের সমৃদ্ধির জন্য কাজে লাগাতে পারে সেজন্য তাদের ফেরানোর জন্য সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতো শিক্ষক হিসাবে মেধাবীদের নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং অবৈধ ভাবে লেনদেন বন্ধ করতে হবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দাস নিয়োগ না করে যোগ্যদের নিয়োগ করতে হবে। আবাসিক হলগুলোতে মেধার ভিত্তিতে সিট বন্টন করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র শিক্ষক সকল প্রকার রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। এমন শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যেন শহর থেকে অজপাড়াগাঁ পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পায়।

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে এমপি, মন্ত্রীসহ আমলারা কোন কিছু হলেই চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যান।  স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যদি নিজের চিকিৎসা নিজেদের এলাকায় বা দেশে করাতে পারে না এ থেকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশা ফুটে উঠে। তাদের অর্থ আছে সেজন্য তারা বিদেশে যেতে পারে কিন্তু সাধারণ জনগণ যাদের অর্থ নাই তারা কি করবে?
দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ সকল এমপি মন্ত্রী বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বন্ধ করতে হবে তাহলে তারা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে মনযোগী হবে। এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চাই যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ থেকে শহরের মানুষ সমান সুবিধা পাবে।

মানুষ তার মৌলিক চাহিদা: অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং শিক্ষা পূরণ করতে পারবে। সমাজে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থাকবে না। সমাজে নারীরা তাদের সমঅধিকার পাবে। চলার পথে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য বা নির্যাতনের শিকার হবে না। কোন নারী ভ্রমনের সময় অন্য যাত্রী দ্বারা যৌন নির্যাতনের বা ধর্ষণের শিকার হবে না। মুনিয়া, তনুসহ সকল ধর্ষণ মামলার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পূর্বের সকল অন্যায়ের অত্যাচারের বিচার করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিলুপ্ত করতে হবে। দেশের বিচার বিভাগ স্বাধীন ভাবে কাজ করবে। কেন সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের দাস হয়ে থাকবে না। দেশের পুলিশসহ সকল নিরাপত্তা বাহিনী জনগণের বন্ধু হয়ে কাজ করবে। তারা জনগনের কাছ থেকে অবৈধ ঘুষ বা লেনদেনের মাধ্যমে অপরাধীকে ছাড় দিবেনা। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর আস্থা রেখে তাদের স্বাধীন ভাবে কাজ করার সময় দিতে। নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। নিজেদের আশেপাশে অন্যায় অবিচার হতে দেখলে রুখে দাঁড়াতে হবে। তবেই তারুণ্যের সোনার বাংলাদেশ গঠিত হব।

লেখক,
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া এবং সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!