বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ইসলাম / নিবন্ধ

ব্যবসায় ইসলামের নীতিমালা

Author

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন , কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ৯ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৪৮ বার

ব্যবসায় ইসলামের নীতিমালা

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন

মানবসভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবসা মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবনধারণের প্রয়োজন মেটাতে মানুষ একে অন্যের সঙ্গে লেনদেনে যুক্ত হয়েছে, গড়ে তুলেছে বাজার, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। ইসলাম এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি, বরং ব্যবসাকে সম্মানজনক ও বৈধ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে ইসলাম ব্যবসাকে কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেনি, বরং এটিকে নৈতিকতা, সততা ও আল্লাহভীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করেছে। কোরআন ও হাদিসে ব্যবসার যে রীতিনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে, তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই কল্যাণকর।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ব্যবসাকে হালাল ঘোষণা করে স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা ২৭৫) এই আয়াত ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি স্থাপন করেছে। এখানে ব্যবসার বৈধতা যেমন ঘোষণা করা হয়েছে, তেমনি সুদের মতো শোষণমূলক ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম এমন ব্যবসা চায়, যা মানবকল্যাণের পরিপন্থী নয়। ইসলামে ব্যবসার প্রথম ও প্রধান নীতি হলো সততা। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ছিলেন একজন সফল ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী। তার সততা ও আমানতদারির কারণে মানুষ তাকে আল-আমিন তথা বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত করেছিল। তিনি বলেছেন, সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (জামে তিরমিজি) এই হাদিস প্রমাণ করে, ইসলামে সৎ ব্যবসার মর্যাদা কতটা উচ্চ।

সত্যবাদিতা, পণ্যের সঠিক তথ্য প্রদান এবং লেনদেনে স্বচ্ছতা, এসবই ইসলামি ব্যবসার মূলভিত্তি। এর বিপরীতে প্রতারণা ও অসততাকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) বাজারে গিয়ে খাদ্যশস্যের স্তূপে হাত ঢুকিয়ে ভেতরে ভেজা শস্য দেখতে পান। তখন তিনি বিক্রেতাকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম) এই হাদিস ব্যবসায় প্রতারণার ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। পণ্যের দোষ গোপন করা, ভেজাল মেশানো কিংবা মিথ্যা শপথ করে বিক্রি করা, সবই ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। ন্যায্য মাপ ও ওজন নিশ্চিত করা ব্যবসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা পরিমাণে ও ওজনে পরিপূর্ণ দাও এবং মানুষকে তাদের পণ্যে কম দেবে না।’ (সুরা আরাফ ৮৫) আবার সুরা মুতফফিফিনে কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়।’ (সুরা মুতফফিফিন ১) এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, মাপে কম দেওয়া শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, বরং এটি আল্লাহর ঘোষিত ধ্বংসের কারণ। ইসলাম ব্যবসায় লাভকে নিষিদ্ধ করেনি, তবে লাভের

নামে শোষণকে সমর্থন করে না। ন্যায্য লাভ করা বৈধ, কিন্তু অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করা হারাম। বিশেষ করে সংকটকালে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোকে ইসলাম ঘৃণার চোখে দেখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মজুদদারি করে, সে গুনাহগার।’ (সহিহ মুসলিম) এই হাদিস প্রমাণ করে, জনস্বার্থবিরোধী ব্যবসা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। চুক্তি ও অঙ্গীকার রক্ষা করা ব্যবসার আরেকটি মৌলিক নীতি। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।’ (সূরা মায়েদা ১) ব্যবসায়িক চুক্তি ভঙ্গ করা, দেনা পরিশোধে গড়িমসি করা কিংবা শর্ত লঙ্ঘন করা ইমানের দুর্বলতার পরিচায়ক। রাসুলুল্লাহ (সা.) দেনা পরিশোধে অবহেলার বিষয়ে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। ইসলামে হালাল পণ্যের ব্যবসা করা বাধ্যতামূলক। মদ, জুয়া, সুদ, হারাম খাদ্য কিংবা সমাজের জন্য ক্ষতিকর যে কোনো পণ্যের ব্যবসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো জিনিস হারাম করেন, তখন তার মূল্যও হারাম করে দেন।’ (সুনানে আবু দাউদ) অর্থাৎ হারাম পণ্যের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থও ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।

ইসলাম ব্যবসাকে মানবিকতা ও সহানুভূতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো, সহজ শর্তে লেনদেন করা এবং প্রয়োজনে ছাড় দেওয়া ইসলামের প্রশংসিত গুণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি দয়া করেন, যে বিক্রি করার সময়, কেনার সময় এবং পাওনা আদায়ের সময় সহজতা অবলম্বন করে।’ (সহিহ বুখারি) এই সহজতা সমাজে ভালোবাসা ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে।

লেখক: শিক্ষার্থী, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে দৈনিক দেশরুপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!