ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা
মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন
অন্তর্ভুক্ত। মাধ্যম নয়, এটি একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা তাদের শিকড়, যা তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, জীবনধারা এবং জ্ঞানের ধারাবাহিকতা সংরক্ষণে অপরিহার্য। তবে আধুনিকীকরণ, নগরায়ণ, শিক্ষার কেন্দ্রীয় ভাষার প্রভাব এবং সামাজিক অজ্ঞতা অনেক নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে। ইউনেস্কোর রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৪০ শতাংশ ভাষা ভবিষ্যতে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে বহু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাও অন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ভাষার অবস্থা উদ্বেগজনক। সাওতাল, মং, চাকমা এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা প্রজন্মের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে। শিশুদের মধ্যে মাতৃভাষা ব্যবহার না হওয়ায় তারা নিজের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারছে না। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষায় হলে তাদের শেখার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, চিন্তাশক্তি প্রসারিত হয় এবং সৃজনশীলতা উন্নত হয়। ভাষা হারালে শুধুই শব্দ হারায় না, হারায় ঐ জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, গান, নৃত্য, লোককাহিনী এবং ভাষা কেবল মানুষের যোগাযোগের জীবনধারা। ভাষা সংরক্ষণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মাতৃভাষার ডকুমেন্টেশন, সংরক্ষণ ভিডিও সাহিত্য ও গান সংরক্ষণ, রেকর্ডিং এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো জরুরি। স্কুল, কলেজ ও কমিউনিটি সেন্টারে মাতৃভাষার পাঠ্যক্রম চালু করলে নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষার সঙ্গে পরিচিত হবে। অভিজ্ঞ সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় শিশু ও যুবকদের মধ্যে ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি করা সম্ভব। সামাজিক মাধ্যমে ভাষার প্রচার, অনলাইন শিক্ষামূলক কনটেন্ট এবং
সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে ভাষা জীবন্ত রাখা যায়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংরক্ষণ মানে শুধু ভাষা বাঁচানো নয়, এটি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা, সামাজিক সমতা নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। মাতৃভাষা রক্ষা করা মানে ইতিহাস রক্ষা করা। প্রতিটি শব্দ, গান, গল্প ও লোকধারা আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পদের অংশ। একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদদের রক্তের স্মরণে আমরা মাতৃভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করি। সেই অনুভূতিকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা অতীব জরুরি। আমাদের দায়িত্ব হলো সচেতনতা বৃদ্ধি করা, শিক্ষার ক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলিত হয়ে ভাষার ব্যবহার বজায়
রাখা। প্রতিটি নাগরিক, শিক্ষক, অভিভাবক এবং যুবক যুবতী এই সংগ্রামে অংশ নিতে পারে। শুদ্ধ উচ্চারণ, লেখা, গান এবং গল্পের মাধ্যমে ভাষার জীবনদায়িত্ব ধরে রাখা সম্ভব। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাঁচানো মানে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বাঁচানো, জাতীয় পরিচয় রক্ষা করা এবং আগামী প্রজন্মকে তাদের ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা। ভাষা হারালে মানুষের পরিচয় হারায়। তাই আজই পদক্ষেপ নিলে আগামী প্রজন্মও এই শব্দ, সুর ও ইতিহাস উপভোগ করতে পারবে।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া থেকে

