স্বজনপ্রীতি দুর্নীতির একটি প্রধান উৎস

স্বজনপ্রীতি দুর্নীতির একটি প্রধান উৎস
মোছাঃ মিথিলা খাতুন
বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি এমন একটি চরম বাস্তবতা, যা নিয়মের মতো গেঁথে আছে। সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিবর্তে শুধুমাত্র পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত পরিচিতি কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধাপ্রদান করা হয়। এটি একদিকে যেমন কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে, তেমনি সামগ্রিকভাবে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। স্বজনপ্রীতি আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় এতটাই গভীরভাবে প্রবেশ করেছে যে, এর ফলে দেশের মেধাবী তরুণদের স্বপ্ন ভঙ্গ হচ্ছে এবং তারা
প্রতিনিয়ত অন্যায্যতার শিকার হচ্ছেনা। একজন মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করে যখন চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন, তখন তিনি দেখেন যে তার প্রতিভা, যোগ্যতা বা পরিশ্রম কোনো কাজেই আসছে না। চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে যে যোগ্যতার উল্লেখ থাকে, তা অনেক সময় শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার জন্য রাখা হয়েছে, আর বাস্তবে চাকরির সুযোগ চলে যাচ্ছে ক্ষমতাশীলদের আত্মীয়-পরিচিতদের হাতে। মেধাবীরা পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকারে ভালো করলেও, শেষ পর্যন্ত একটি পরিচিত নাম, একটি সুপারিশ বা একটি ফোন কল তাদের অর্জনের পথ একেবারে রুদ্ধ করে দেয়। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানে স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট হয় এবং তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়তে থাকে। স্বজনপ্রীতির সবচেয়ে
ভয়াবহ দিক হলো এটি কর্মস্থলের সাধারণ কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেয়। একজন কর্মী যখন দেখেন, তার চেয়ে কম দক্ষ কেউ শুধুমাত্র আত্মীয়তার ভিত্তিতে পদোন্নতি পাচ্ছে, ভালো সুযোগ-সুবিধাপাচ্ছে। তখন তিনি তার কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ধীরে ধীরে কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা কমে আসে এবং অফিসের কর্মপরিবেশ বিষাক্ত হয়ে ওঠতে থাকে। কর্মীরাও কাজকে আর দায়িত্ব বা নৈতিক কর্তব্য হিসেবে দেখেন না বরং শুধুমাত্র বেতন পাওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতে থাকেন। অন্যদিকে, স্বজনপ্রীতির কারণে কর্মস্থলে অযোগ্য ব্যক্তিরা যখন উচ্চপদে বসেন তখন তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন। একজন দক্ষ ব্যক্তি যেখানে অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জ্ঞান দিয়ে সমস্যা সমাধান করতে পারেন। সেখানে স্বজনপোষিত নেতারা নিজেদের সীমিত জ্ঞান ও অদক্ষতার কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেন। এতে যেমন প্রতিষ্ঠান ক্ষতির সম্মুখীন হয় তেমনি দীর্ঘমেয়াদে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দেয়। শুধু তাই নয়, এই ধরনের অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে দুর্নীতির সুযোগ আরও বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে স্বজনপ্রীতির কারণে দেশের সঠিক
মূল্যায়ন না পেয়ে মেধাবীদের অনেকে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। উন্নত দেশে তাদের দক্ষতা ও মেধার সঠিক মূল্যায়ন হয় এবং তারা সেখানে সম্মানজনক কাজের সুযোগ পান। ফলে এভাবেই বাংলাদেশ ক্রমশ মেধাশূন্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই “Brain Drain” বা মেধাপাচার আমাদের দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ সংকেত বহন করে। কারণ দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দেশের উন্নয়নকে ব্যাহত করে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো স্বজনপ্রীতি শুধু চাকরির বাজারেই নয়, বরং সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও ধ্বংস করছে। যখন মানুষ দেখে যে যোগ্যতা নয় বরং সুপারিশ ও পরিচিতিই জীবনে সফলতার মূল চাবিকাঠি। তখন তারা ধীরে ধীরে সৎ ও পরিশ্রমী হওয়ার প্রবণতা হারিয়ে ফেলে। প্রতিযোগিতার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আগ্রহ হারায়, কর্মীরা দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ অনুভব করেন না। সর্বোপরি, এতে জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।
স্বজনপ্রীতি দূর করতে হলে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে কঠোর নিয়ম-কানুনও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করতে হবে। এই দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিরা যথাযথ মূল্যায়ন পান। কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার ভিত্তিতে পুরস্কার প্রদান করতে হবে যাতে কর্মীরা উৎসাহিত হন এবং নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আগ্রহী থাকেন। এছাড়া, কর্মীরা যেন নির্ভয়ে পক্ষপাতমূলক আচরণের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে পারেন তার জন্য একটি নিরাপদ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। স্বজনপ্রীতি বন্ধ করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, বরং সমাজের মানসিকতা পরিবর্তন করাটাও জরুরি। আমাদের সচেতন হতে হবে যে, আত্মীয়-পরিচিতদেরসুযোগ করে দেওয়ার প্রবণতা সামগ্রিকভাবে সমাজের জন্য ক্ষতিকর। আমরা যদি সত্যিই উন্নত, প্রতিযোগিতামূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই। তাহলে যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে চাকরি ও সুযোগ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, আমরা প্রতিভা ধ্বংসের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেব!
লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।
mithila6596@gmail.com

