বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কোরবানির আনন্দ যেন বিষাদ না হয়

Author

শাহিদা জাহান ইরানী , ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

প্রকাশ: ৫ জুন ২০২৫ পাঠ: ৩৯ বার

ঈদুল আজহা মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসব শুধু কোরবানির মধ্য দিয়ে আত্মত্যাগের অনুশীলন নয়, বরং পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক বাস্তব পরীক্ষা। প্রতিবছর এ উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিপুলসংখ্যক পশু কোরবানি দেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবেই এর ফলে সৃষ্টি হয় বিপুল পরিমাণ জৈব বর্জ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি আমাদের নগরজীবনে নানা ভোগান্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিবারই দেখা যায়, কোরবানির পর রাস্তাঘাট, ড্রেন, খোলা জায়গা কিংবা আবাসিক এলাকার অলিগলি রক্ত ও বর্জ্যে সয়লাব হয়ে পড়ে। দুর্গন্ধে নিঃশ্বাস নেওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য সময়মতো অপসারণ না হওয়ায় তা থেকে ছড়ায় নানা রকম রোগজীবাণু। মশা, মাছি ও অন্যান্য পোকামাকড় বিস্তার ঘটায়, যার ফলে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু কিংবা চর্মরোগের মতো অসুখের আশঙ্কাও বাড়ে।
এমন চিত্র আমরা প্রায় প্রতিবছরই দেখি, অথচ বাস্তবতা হলো—এই সমস্যা রোধ করা কঠিন কিছু নয়। শুধু সামান্য পরিকল্পনা, সুষ্ঠু সমন্বয় এবং সর্বাগ্রে নাগরিক সচেতনতা থাকলেই এর থেকে উত্তরণ সম্ভব। কোরবানির বর্জ্যকে অনেকে উচ্ছিষ্ট কিংবা ফেলার বস্তু হিসেবে ভাবলেও বাস্তবে এর মধ্যে রয়েছে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরের সম্ভাবনা। নাড়িভুঁড়ি থেকে তৈরি হতে পারে মাছ ও পশুর খাদ্য, হাড় ব্যবহার হয় জৈব সার ও ওষুধ শিল্পে। এইসব উপকরণকে যদি সঠিকভাবে সংগ্রহ ও রূপান্তর করা যায়, তবে তা পরিবেশের ক্ষতির বদলে টেকসই অর্থনীতির অংশ হতে পারে।
গ্রামাঞ্চলে একাধিক পরিবার মিলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে গর্ত খুঁড়ে বর্জ্য পুঁতে রাখলে তা জৈব সারে পরিণত হয়, যা কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্যও উপযোগী। শহরে এমন ব্যবস্থা সীমিত হলেও যথাযথভাবে নির্ধারিত জায়গায় বর্জ্য ফেলে, মুখবন্ধ পাত্রে সংরক্ষণ করে এবং পানি জমে থাকার অবস্থা এড়িয়ে চললে পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
সরকার বা সিটি করপোরেশন একা এই দায়িত্ব পালন করতে পারবে না, যদি নাগরিকরাই সচেতন না হন। যারা ব্যক্তিগতভাবে কোরবানি দিচ্ছেন, তাঁদের প্রতি অনুরোধ—যেখানে-সেখানে বর্জ্য না ফেলে নির্ধারিত স্থান বা গর্তে ফেলুন, সিটি করপোরেশনের যানবাহন সহজে পৌঁছাতে পারে এমন জায়গায় কোরবানি দিন। বর্জ্য যদি ব্যাগ বা পাত্রে করে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে অপসারণকারী সংস্থার কাজও অনেক সহজ হয়।
এ ছাড়া ঈদের আগে থেকেই প্রশাসনের প্রস্তুতিরও ঘাটতি থাকা উচিত নয়। নির্ধারিত কোরবানির স্থান, ল্যান্ডফিল, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও যন্ত্রপাতির প্রস্তুতি রাখতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে চালাতে হবে প্রচার অভিযান—ইমামদের মাধ্যমে ঈদের খুতবায় বার্তা পৌঁছানো, স্থানীয় কাউন্সিলরদের তত্ত্বাবধানে লিফলেট বিতরণ কিংবা গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি হতে পারে কার্যকর উপায়।
‘পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ’—এই ধর্মীয় বোধকে শুধু বুলি হিসেবে না রেখে ঈদের আচরণে প্রতিফলন ঘটাতে পারলেই এই উৎসব হবে সত্যিকার অর্থে অর্থবহ। কোরবানির মাধ্যমে যেন শুধু পশু নয়, আমাদের দায়িত্ববোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সচেতনতার প্রতিও একটি ইতিবাচক বার্তা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে—এই প্রত্যাশা রইল।

লেখক: সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৫ জুন ২০২৫ তারিখে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!