ইন্টারনেট আসক্তি ও তরুণ প্রজন্ম

ইন্টারনেট আসক্তি ও তরুণ প্রজন্ম
মিথিলা খাতুন
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় ইন্টারনেট আমাদের জীবনের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি ইন্টারনেটের অপব্যবহার নতুন এক সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করেছে, যা ইন্টারনেট আসক্তি ডিসঅর্ডার (Internet Addiction Disorder, IAD) নামে পরিচিত। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে এর প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তারা বাস্তব জীবনের কাজ ও সম্পর্ককে উপেক্ষা করে ভার্চুয়াল জগতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছে, যা তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইন্টারনেট আসক্তি এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন এবং এটি তার দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে। এটি সাধারণত কয়েকটি লক্ষণের মাধ্যমে চিহ্নিত করা যায়-ব্যবহারকারী ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, দিনে দিনে ব্যবহারের সময় বাড়তে থাকে। ইন্টারনেট ছাড়া অস্থিরতা, হতাশা ও বিরক্তি অনুভূত হয়। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারা এবং অতিরিক্ত চাপ অনুভাব করার ফলে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই আসক্তির প্রভাব এতটাই তীব্র হতে পারে যে, এটি ব্যক্তির ঘুমের ব্যাঘাত, একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসহীনতা, হতাশা ও শারীরিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট আসক্তির সবচেয়ে বড় শিকার তরুণরা। বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০-২০ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট আসক্তিতে ভুগছে, যার মধ্যে তরুণদের হার ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত। উদাহরণ হিসেবে চীনের কথা বলা যায়, চীনে ইন্টারনেট আসক্তির হার ১০ শতাংশ। ফলে দেশটি এরই মধ্যে এটিকে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ সমাজের ওপর গভীর ও বহুমুখী প্রভাব ফেলছে। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্ট।
অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে তরুণরা রাত জাগার অভ্যাস গড়ে তোলে, যা ঘুমের ব্যাঘাত, ক্লান্তি ও অনিদ্রার কারণ হয়। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয় এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে স্থূলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। মানসিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের পরিপূর্ণ জীবন দেখে তারা হীনমন্যতায় ভোগে, যা আত্মবিশ্বাস কমায়। মনোযোগ ও একাগ্রতা হ্রাস পাওয়ায় পড়াশোনা ও কাজের মান নষ্ট হয়। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে এবং তারা একাকিত্ব অনুভব করে। অনলাইন শপিং, গেমিং ও জুয়ায় আসক্তি আর্থিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। নৈতিক অবক্ষয় ঘটিয়ে কিছু তরুণ সাইবার অপরাধ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। অনলাইনে বুলিং ও নেতিবাচক কনটেন্ট তাদের মানসিক বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলে। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
এছাড়া গবেষণায় দেখা যায়, যেসব কিশোর ইন্টারনেট আসক্তিতে ভুগছে, তাদের মস্তিষ্কের এক্সিকিউটিভফাংশন নেটওয়ার্কের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। এই নেটওয়ার্ক মনোযোগ, পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকরা মনে করেন, এই পরিবর্তনগুলোর ফলে
কিশোরদের মানসিক বিকাশ ও সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া ২০১২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল ফোন আসক্তিতে আক্রান্ত ছাত্রদের মস্তিষ্কের গঠন মাদকাসক্তদের মস্তিষ্কের মতো পরিবর্তিত হয়। ২০১৬ সালে আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, গেমিং আসক্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে সেই একই নিউরোকেমিক্যাল প্রতিক্রিয়া ঘটে, যা মাদকাসক্তদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। ফলে স্পষ্ট, ইন্টারনেট আসক্তির শারীরবৃত্তীয় প্রভাবও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে চীন ইন্টারনেট আসক্তিকে ‘পাবলিক হেলথ ক্রাইসিস’ হিসেবে ঘোষণা করে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ইন্টারনেট ক্যাফে ও গেমিং সীমিত করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া শুটডাউন ল-এর মাধ্যমে ১৬ বছরের কম বয়সীদের রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত গেমিং নিষিদ্ধ করেছে এবং কাউন্সেলিং সেন্টার চালু করেছে। জাপান স্কুল ও কলেজে ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার শেখানো এবং গেমিং সময়সীমা নির্ধারণের ওপর জোর দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইন্টারনেট আসক্তিকে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সচেতনতা ও ডিজিটাল
ডিটক্সের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। যুক্তরাজ্য স্কুল-কলেজে সচেতনতা কর্মসূচি চালু করেছে এবং কাউন্সেলিং সুবিধা বাড়িয়েছে।
তরুণদের ইন্টারনেট আসক্তি থেকে রক্ষা করতে কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। প্রথমত, নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা, অর্থাৎ দৈনন্দিন কাজের সময়সূচিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ডিটক্স: নির্দিষ্ট সময়ে ইন্টারনেট থেকে বিরত থাকা, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেশ কার্যকর সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে। তৃতীয়ত, বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করা, যেমন বই পড়া, শারীরিক ব্যায়াম, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও প্রকৃতির
সঙ্গে সময় কাটানো।
চতুর্থত, পারেন্টাল কন্টোল সফটওয়্যারের ব্যবহারের মাধ্যমে সন্তানের ফোন অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। পঞ্চমত, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন জোরদার করা। অভিভাবকরা যদি সন্তানদের সঙ্গে বেশি সময় কাটান এবং তাদের বাস্তব জীবনের যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করেন, তবে তারা ভার্চুয়াল জগতে অতিরিক্ত আসক্ত হবে না। ষষ্ঠত, চিকিৎসা ও পরামর্শ গ্রহণ। ইন্টারনেট আসক্তি মারাত্মক আকার ধারণ করলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ইন্টারনেট আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ। তবে এটি যখন আসক্তির রূপ নেয়, তখন তা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। তরুণ সমাজকে এই আসক্তি থেকে রক্ষা করতে হলে পারিবারিক পর্যায় থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ক্ষেত্রসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সচেতনতা ও স্বনিয়ন্ত্রণই পারে ইন্টারনেট আসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা
করতে।
শিক্ষার্থী
সরকারি আজিজুল হক কলেজ
বগুড়া

