বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ক্ষমতাসীনদের ছায়ায় সংবাদ মাধ্যম: রাষ্ট্রের জন্য হুমকি?

Author

মোঃ রুহুল আমিন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৪৬ বার

বাংলাদেশের সংবিধান মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাস্তবতায় আমরা ক্রমেই দেখছি সংবাদ মাধ্যম তার সাংবিধানিক ভূমিকা থেকে সরে এসে ক্ষমতাসীনদের প্রতি অতিরিক্তভাবে ঝুঁকে পড়ছে। এই প্রবণতা শুধু সাংবাদিকতার নৈতিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং দেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদ মাধ্যমকে বলায় হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সংবাদ মাধ্যমের কাজ হলো রাষ্ট্র কে প্রশ্ন করা। জাতির সামনে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অন্যায়, অনিয়ম এবং দূর্নীতির বিষয় গুলো উপস্থাপন করা। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদ মাধ্যম গুলো এর বিপরীত। তারা ক্ষমতাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে না দিয়ে তেলবাজি করতে পটু।
এক সময় বাংলাদেশে সংবাদ মাধ্যম ছিল শাসকদের জন্য এক ধরনের সতর্ক ঘণ্টা। দুর্নীতি, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতা সাহসের সঙ্গে তুলে ধরা হতো। কিন্তু বর্তমানে অনেক মূলধারার সংবাদ মাধ্যমে এসব বিষয় প্রায় অনুপস্থিত। বিরোধী দলের কর্মসূচি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কিংবা নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিয়মের খবর হয় সীমিতভাবে প্রকাশিত হয়, নয়তো পুরোপুরি উপেক্ষিত থাকে। অথচ সরকারপক্ষের বক্তব্য ও সাফল্যের প্রচার সংবাদ শিরোনাম জুড়ে থাকে। শেখ হাসিনাকে স্বৈরশাসক হিসাবে তৈরি করতে গুরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে এই গণমাধ্যম। অতিরিক্ত তোষামোদি করে অবৈধ সুবিধা লাভের উদ্দেশ্য কিছু সাংবাদিক প্রতিনিয়ত তার গুনগান গাইতো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর এক সাংবাদিক তাকে এ ধরনের সাংবাদিকদের থেকে দূরে থাকার পরমর্শ দিয়েছেন। এসব সাংবাদিকেরা ক্ষমতাধরদের তোষামোদি করে জনগণের কাছে থেকে দূরে রাখে।
বিগত সময়ে সংবাদ মাধ্যম ক্ষমতাধরদের দখলের ফলে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উপস্থাপনের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শেখ হাসিনার আমলে নির্বাচনকালীন সময়ে ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম বা ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও অনেক সংবাদ মাধ্যমে তা গুরুত্ব পায় না। এতে করে জনগণ প্রকৃত বাস্তবতা জানতে পারেনি এবং গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ দুর্বল হয়ে পড়ে। আমরা বিগত নির্বাচন গুলোতে দেখেছি সাংবাদিকেরা শেখ হাসিনার নির্বাচন কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তারা নির্বাচনের সময় কোন অনিয়ম দূর্নীতি খুঁজে পায় নাই। যদি হাসিনার পাতানো নির্বাচনের অনিয়ম গুলো বিষয়ে সব সংবাদ মাধ্যম গুলো তুলে ধরতো তাহলে জনগণ এবং বিদেশিদের কাছে নির্বাচন এর গ্রহণ যোগ্যতা হারাতো।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরেকটি বড় ক্ষতি হলো দুর্নীতির বিস্তার। স্বাধীন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অভাবে বড় বড় দুর্নীতির অভিযোগ চাপা পড়ে যায় বা আলোচনার বাইরে থাকে। ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলেও তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হয় না। ফলে দুর্নীতি শাস্তিহীনতার সংস্কৃতিতে রূপ নেয়, যা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বেশির ভাগ সংবাদ মাধ্যম গুলো দূর্নীতিবাজদের দখলে। সংবাদ মাধ্যমের চেয়ারম্যান অথবা নীতিনির্ধারণী ব্যাক্তিরা বিভিন্ন ক্ষমতাধর রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। তাদের কুকর্ম ঢাকতে তারা সংবাদমাধ্যমের মালিকানায় রয়েছে। সাংবাদিকরা চাইলেও তাদের বিরুদ্ধে দূর্নীতি কিছু বলতে বা লিখতে পারেন না। কারণ দূর্নীতিবাজরা ক্ষমতাধর তাদের বিরুদ্ধে কিছু লেখলে নিজেদের চাকরি নিয়ে টানাটানি উঠবে।
সাংবাদিকদের একটি পক্ষ তাদের নীতি নৈতিকতা থেকে অনেক দূরে। এর মূল কারণ কিছু নৈতিকতাবিহীন সাংবাদিক যাদের জন্য ভালো সাংবাদিকেরা সততার সাথে কাজ করতে পারেনা। অসাধু সাংবাদিকেরা তৈলমর্দন করে ক্ষমতাসীন দল থেকে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার চেষ্ঠা করে। এর ফলে তাদের নেগেটিভ সংবাদ গুলো সামনে আসে না শুধু পজিটিভ সংবাদ গুলো প্রচার করে।
সাংবাদিকদের নৈতিকতা থেকে দূরে যাওয়ার অন্যতম কারণ তাদের বেতন কাঠামো। আমাদের দেশের সাংবাদিকদের বেতন খুব কম। তারা যে বেতন পায় তা নিয়ে তাদের জীবন ধারণ এবং পরিবারের চাহিদা মেটানো দুঃসাধ্য। কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিক হিসাবে নিয়োগ পেতে অর্থ দিতে হয়। কিছুদিন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ক্যাম্পাস সাংবাদিককে নিয়োগ দিবে বিনিময়ে নিয়োগকারী কে টাকা দিতে হবে বলে একটি কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। নিয়োগকারী চাকরিতে প্রদানের টাকা কিভাবে তুলবে সেটিও বলে দেন। একজন সাংবাদিক যদি নিয়োগ পেতে টাকা দিতে হয় তাহলে সেই টাকা তুলতে অবশ্যই তাকে অবৈধ পথে উপার্জন করতে হতো।
সংবাদ মাধ্যমের এই পক্ষপাতিত্ব জনগণের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মানুষ যখন দেখে যে টেলিভিশন টকশো বা সংবাদ বুলেটিনে একই ধরনের বক্তব্য ঘুরে ফিরে আসছে, তখন তারা গণমাধ্যমকে আর বিশ্বাস করতে চায় না। ফলস্বরূপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের উপর নির্ভর করছে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবচেয়ে বড় মিডিয়া হিসেবে কাজ করছে। এর ভাল দিকের পাশাপাশি খারাপ দিকও আছে। খুব সহজে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও অপতথ্যের ওপর মানুষ বেশি নির্ভর করতে শুরু করে, যা সামাজিক বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—মত প্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন। বাংলাদেশে বহু সাংবাদিক ও লেখক আছেন, যারা সত্য লিখতে গিয়ে মামলার মুখোমুখি হয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন বা নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। বিগত সরকারের আমলে কিছু সংবাদ তাদের অনুকূলে না থাকায় মাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে অনেক সাংবাদিক আত্মনিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। যা বলা দরকার, তা না বলে চুপ থাকাই এখন নিরাপদ মনে করা হয়। কিন্তু এই নীরবতা রাষ্ট্রের জন্য শুভ নয়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে টেকসই উন্নয়নের জন্য ভুল ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সংবাদ মাধ্যম যদি কেবল ক্ষমতাসীনদের প্রশংসায় ব্যস্ত থাকে, তবে উন্নয়নের আড়ালে থাকা বৈষম্য, দুর্নীতি ও জনদুর্ভোগ অদৃশ্যই থেকে যাবে।
গনঅভ্যুত্থানের পরেও সংবাদমাধ্যম গুলো স্বাধীন হতে পারেনি। একদলের কাছে থেকে অন্য দলে হাত বদল হয়ে গেছে মাত্র। কিছু সংবাদ মাধ্যমের সংবাদে তা স্পষ্ট। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম যদি ক্ষমতাসীনদের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে না পারে, তবে গণতন্ত্র নামমাত্র একটি শব্দে পরিণত হবে। একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য স্বাধীন, সাহসী ও দায়িত্বশীল সংবাদ মাধ্যমের বিকল্প নেই। সংবাদ মাধ্যমকে মনে রাখতে হবে—তারা ক্ষমতার পাহারাদার নয়, বরং জনগণের বিবেক।
লেখক,
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া এবং সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে দ্বিমাসিক ডাকঘর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!