বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

জ্বালানি সংকটের ভার কি বইবে শিক্ষার্থীরা?

Author

মোঃ রুহুল আমিন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ২৯ বার

যে কোনো জাতীয় সংকট দেখা দিলেই আমাদের নীতিনির্ধারণে একটি পরিচিত প্রবণতা চোখে পড়ে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কিংবা শিক্ষাকার্যক্রম সংকুচিত করা। প্রশ্ন জাগে, সংকটের অভিঘাত কি শুধুই শিক্ষাক্ষেত্রে এসে পড়বে? নাকি এটি আমাদের নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলন, যেখানে সহজতম সমাধান হিসেবে শিক্ষাকেই বারবার বলি দেওয়া হয়?

বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা মন্ত্রণালয় মহানগর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আংশিক অনলাইন ক্লাস চালুর পরিকল্পনা করছে। প্রস্তাবিত মডেল অনুযায়ী, সপ্তাহে ছয় দিনের মধ্যে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীরে ক্লাস নেওয়া হবে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ মনে হলেও বাস্তবতার নিরিখে এর কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন থেকে যায়।

আমরা করোনা মহামারির সময় সম্পূর্ণ অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। সেই অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না—শিক্ষণফলে ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের মনোযোগহীনতা এবং শিক্ষার মানের অবনতি ছিল সুস্পষ্ট। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায়ও দেখা গেছে, দীর্ঘদিন অনলাইন নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

বর্তমান প্রজন্ম ইতোমধ্যেই ডিজিটাল আসক্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। অনলাইন গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন বিনোদনমূলক প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত সময় ব্যয় তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতায় অনলাইন ক্লাসের প্রসার শিশু-কিশোরদের হাতে আরও বেশি সময়ের জন্য ডিজিটাল ডিভাইস তুলে দেবে, যা তাদের পড়াশোনার চেয়ে বিভ্রান্তির দিকেই বেশি টেনে নিতে পারে। অভিভাবকদের পক্ষে এই ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে, ডিজিটাল বৈষম্য আমাদের দেশের একটি বড় বাস্তবতা। সব শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের কাছে প্রয়োজনীয় ডিভাইস নেই, নেই স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উচ্চ ব্যয়ের ইন্টারনেট এবং দুর্বল নেটওয়ার্ক অবকাঠামো অনলাইন শিক্ষাকে একটি সীমিত সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলতে পারে। ফলে শিক্ষায় বৈষম্য আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

এছাড়া বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। লোডশেডিংয়ের কারণে নিরবিচ্ছিন্ন অনলাইন ক্লাস পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ক্লাস চলাকালীন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতা ব্যাহত করবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটিকে অকার্যকর করে তুলবে।

শুধু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাই নয়, দক্ষতার ঘাটতিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক এখনও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কার্যকরভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় অভ্যস্ত নন। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া অনলাইন শিক্ষাদান স্বাভাবিক শ্রেণিকক্ষের বিকল্প হতে পারে না।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন থেকেই যায়—সমাধান কি সত্যিই অনলাইন ক্লাস, নাকি এটি একটি সাময়িক ও অসম্পূর্ণ প্রতিকার? সংকট মোকাবিলার নামে যদি শিক্ষার মান এবং সমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সেই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

অতএব, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন হলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে শিফট ভিত্তিক ক্লাস, পাঠসূচির পুনর্বিন্যাস বা সীমিত পরিসরে অনলাইন সহায়তা চালু করা যেতে পারে। একইসঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট এবং নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা জরুরি।

সংকট সাময়িক, কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী। তাই সংকট ব্যবস্থাপনার সহজ সমাধান হিসেবে শিক্ষাকে বারবার পরীক্ষার মুখে ঠেলে না দিয়ে, বরং শিক্ষাব্যবস্থাকেই রক্ষার কৌশল খুঁজে বের করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।

লেখক,
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া এবং সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!