শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সভ্য সমাজে নারীর নিরাপত্তা কেন অনিশ্চিত?

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ পাঠ: ২২ বার

https://epaper.alokitobangladesh.com/?date=2026-05-23&page=6&news=06_102সভ্য সমাজে নারীর নিরাপত্তা কেন অনিশ্চিত?

 

“নারী অর্ধেক আকাশ”—কথাটি আমরা গর্বের সঙ্গে বলি। সভ্যতা, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের বড় বড় গল্প-কাহিনীও শুনি প্রতিনিয়ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই তথাকথিত সভ্য সমাজেই একজন নারী এখনো ঘর থেকে বের হওয়ার আগে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কখনো কর্মস্থলে, কখনো রাস্তাঘাটে, আবার কখনো নিজের ঘরেও তাঁকে অনিরাপত্তার ভয় তাড়া করে ফেরে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও নারী হত্যার খবর আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা তো আছেনই, কোমলমতি শিশুরাও আজ এসব পাশবিকতার শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষরূপী কিছু হিংস্র পশু শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয় না; নির্যাতনের পর জীবনও কেড়ে নেয়। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার উৎকর্ষের এই সময়ে দাঁড়িয়ে এ বাস্তবতা আমাদের সভ্যতার দাবিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আচার্য্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছিলেন,

“ আমার মনে হয় তখন-ই সেই জাতির অবনতি আরম্ভ হয়, যখন লোকে স্ত্রীজাতিকে মাতৃজ্ঞানে বা যথাযোগ্য শ্রদ্ধা না করে ভোগসর্বস্ব হয়ে অনুসরণ করতে আরম্ভ করে তাদিগকে বিলাসের সামগ্রী বোধে। ”

এই কথার গভীরতা আজ যেন আরও নির্মমভাবে সত্য হয়ে উঠেছে। সমাজের একাংশে নারীর প্রতি সম্মানবোধ, সংযম ও সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গির অভাব প্রতিনিয়ত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক মূল্যবোধের সংকট এবং মানবিক শিক্ষার ঘাটতি আমাদের সমাজকে ক্রমাগত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নারীর প্রতি সহিংসতা নতুন কোনো সমস্যা নয়; তবে বর্তমান সময়ে এর ভয়াবহতা ও বিস্তার গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশু থেকে বৃদ্ধা—কেউই যেন নিরাপদ নন। কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কখনো গণপরিবহনে, কখনো আত্মীয়স্বজনের বাসায়ও ঘটছে এরূপ পাশবিক ঘটনা। সমাজের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অপরাধের নির্মমতা বাড়ছে, অথচ অনেক ক্ষেত্রেই মানবিক সংবেদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। এই সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার অভাব। আমরা প্রযুক্তিগত শিক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক সাফল্য ও পেশাগত দক্ষতার দিকে যতটা গুরুত্ব দিচ্ছি, মানবিক মূল্যবোধ গঠনে ততটা মনোযোগ দিচ্ছি না। পরিবার একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পরিবার থেকেই যদি সম্মানবোধ, সংযম, সহমর্মিতা ও চরিত্র গঠনের শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব সমাজেও পড়বে। আজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—শিক্ষিত হওয়া আর মানবিক মানুষ হওয়া এক বিষয় নয়। আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। বহু ঘটনায় দেখা যায়, মামলা হলেও বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হয় কিংবা অপরাধীরা নানা উপায়ে শাস্তি এড়িয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং অপরাধীরাও পুনরায় এমন অপরাধ করতে সাহস পায়। অবশ্যই ধর্ষণের শাস্তি কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার চিন্তাও করলে তার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। কিন্তু শুধু শাস্তি বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না; তার চেয়েও জরুরি হলো—ধর্ষণ যাতে সংঘটিতই না হয়, সেই পরিবেশ তৈরি করা। প্রতিরোধের শুরু হতে পারে পরিবার থেকেই। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই অন্যকে সম্মান করা, সংযত আচরণ করা, আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখা এবং মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমভিত্তিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। কারণ কেবল আইন দিয়ে সমাজের বিবেক তৈরি করা যায় না; তার জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধের বাস্তব চর্চা। সামাজিক লজ্জা ও ভয়ও অনেক নারীকে ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সহিংসতার শিকার হওয়ার পর অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই নানা প্রশ্ন, সন্দেহ ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক পরিবার সামাজিক অপমানের ভয়ে ঘটনাগুলো গোপন রাখার চেষ্টা করে। ফলে অপরাধীরা নিরাপদে থেকে যায়। একটি সুস্থ সমাজে ভুক্তভোগীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়; বরং তাঁর পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত আমাদের মানবিক দায়িত্ব। ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির সঠিক ও নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও এখন জরুরি। নারীর নিরাপত্তা কেবল নারীর সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের সমস্যা। কারণ একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে, তবে সেই সমাজ কখনো সত্যিকার অর্থে উন্নত বা সভ্য হতে পারে না। তার চেয়েও বড় বিষয়,

“ মেয়েরা-ই একদিন মা হয়ে, দেশ-দশ এবং একটি জাতির প্রসবিনী হন। সেই শক্তিরূপণী জাতের অবমাননা, তাদের দুঃখ দেওয়া—জাতির জন্য কলঙ্ক। ”

উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; বরং একজন নারী কতটা নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজ প্রয়োজন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষণিকের প্রতিবাদ নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা, কার্যকর উদ্যোগ এবং সামাজিক পরিবর্তন। পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়; এটি তাঁর মৌলিক অধিকার।

আচার্য্য শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের এই আহ্বান আজ বাংলার প্রতিটি নারীর তরে—

” ইতর নীতির প্রগতি-পথ, শম্ভুশূলে কর নিরোধ / মেয়ে আমার, সতি আমার খড়্গশূলে রোধ বিরোধ ”

সত্যিকার অর্থে সভ্য সমাজ গড়তে হলে নারীর প্রতি সহিংসতা নয়, দিতে হবে সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপদ পরিবেশ। কারণ নারী নিরাপদ হলেই সমাজ নিরাপদ হবে; আর সমাজ নিরাপদ হলেই নিজেদের সভ্য দাবি করাও সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হয়ে উঠবে।

 

 

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!