শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক, ঝুঁকিতে মানবসভ্যতা

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ পাঠ: ২৫ বার

https://epaper.protidinersangbad.com/?date=2026-05-18&page=4&news=04_101

অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক, ঝুঁকিতে মানবসভ্যতা

একসময় সামান্য নিউমোনিয়া, কাটা ঘায়ের সংক্রমণ কিংবা সাধারণ সর্দি-জ্বরও মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াত। চিকিৎসাবিজ্ঞান তখনো অ্যান্টিবায়োটিকের জাদুকরী শক্তি আবিষ্কার করেনি। ১৯২৮ সালে পেনিসিলিন আবিষ্কারের মাধ্যমে মানবসভ্যতা যেন মৃত্যুর বিরুদ্ধে এক নতুন অস্ত্রের সন্ধান পায়। এই যুগআবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানকে আরো সহজতর করেছে। এরপর আবিষ্কৃত অ্যান্টিবায়োটিক কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থাকে করেছে আরও কার্যকর। কিন্তু আজ সেই আশীর্বাদ-ই মানুষের অসচেতনতা ও অপব্যবহারের কারণে ভয়ংকর হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। বর্তমানে সামান্য সর্দি-কাশি, গলাব্যথা কিংবা ভাইরাসজনিত জ্বরেও অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করছেন। কেউ আবার দুই-তিন দিন ওষুধ খেয়ে সামান্য সুস্থ বোধ করলেই কোর্স অসম্পূর্ণ রেখে দেন। ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া সহজে ওষুধ পাওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল স্বাস্থ্যপরামর্শ এবং “শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক দ্রুত সুস্থ করে” —এইসব ভুল ধারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলাফল হিসেবে জন্ম নিচ্ছে প্রতিরোধী জীবাণু বা “সুপারবাগ”, যাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত ওষুধ আর কার্যকর হচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)-কে বর্তমান শতাব্দীর অন্যতম বড় বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু সরাসরি ব্যাকটেরিয়াল AMR-এর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। সংস্থাটি আরও সতর্ক করেছে, অ্যান্টিবায়োটিকের এরূপ অপব্যবহার চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এ সংকটের ভয়াবহ ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি মানুষ প্রতিরোধী জীবাণুর সংক্রমণে মারা যেতে পারে। অর্থাৎ ক্যান্সারের চেয়েও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। এটি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; বৈশ্বিক অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। বিখ্যাত মেডিকেল জার্নাল The Lancet-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক হারিয়ে গেলে পৃথিবী আবার এমন এক যুগে ফিরে যেতে পারে, যখন সামান্য অস্ত্রোপচার বা সাধারণ সংক্রমণও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াত। গবেষণাটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। দেশে এখনো অধিকাংশ ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক কেনা যায়। গ্রামাঞ্চলে কোয়াক (হাতুড়ে ডাক্তার) চিকিৎসা এবং শহরাঞ্চলে ফার্মেসিনির্ভর চিকিৎসা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। Institute of Epidemiology, Disease Control and Research-এর National AMR Surveillance Report অনুযায়ী, দেশে বহুল ব্যবহৃত অনেক প্রথম সারির অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। কিছু জীবাণুর ক্ষেত্রে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হার ৭৯ শতাংশ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। অন্যদিকে icddr,b পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিপুল পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক যথাযথ চিকিৎসা পরামর্শ ছাড়াই ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের AWaRe Project-এর তথ্যমতে, অপ্রয়োজনীয় ও অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারই প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতালের আইসিইউগুলোতেও এখন এমন সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে যেখানে শেষ ধাপের শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকও কাজ করছে না। চিকিৎসকদের মতে, কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক হারিয়ে গেলে ভবিষ্যতে ক্যান্সার চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, সিজারিয়ান অপারেশন কিংবা নবজাতকের চিকিৎসাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপই কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভরশীল। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে অ্যান্টিবায়োটিককে এখন অনেকেই সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধের মতো ব্যবহার করেন। অথচ একটি ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে পুরো সমাজের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। আজ যে জীবাণু একটি ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হচ্ছে, কাল সেটি আরও ভয়ংকর রূপ নিয়ে হাজারো মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এই সংকট মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ বন্ধ করতে হবে। নির্ধারিত কোর্স সম্পূর্ণ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কমাতে হবে। সর্বোপরি, জনসচেতনতা বৃদ্ধিই হতে পারে এই নীরব বিপদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। অ্যান্টিবায়োটিক মানবসভ্যতার এক অমূল্য সম্পদ। এর কার্যকারিতা হারিয়ে গেলে পৃথিবী আবার সেই অন্ধকার যুগে ফিরে যেতে পারে, যখন সামান্য সংক্রমণও ছিল মৃত্যুর কারণ। তাই অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করা আজ শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি ভবিষ্যৎ মানবসভ্যতাকে রক্ষার লড়াই।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!