দেশে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা, আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?
আমাদের বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্প প্রবণ দেশ গুলোর অন্তর্ভূক্ত না হলেও সম্প্রতি সময়ের ভূমিকম্প যেন আমাদের মনে এক অজানা ভয় এবং আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। মূলত বাংলাদেশ বিশ্বের তীব্র ভূমিকম্প প্রবণ দেশ গুলোর অন্তর্ভূক্ত না হলেও এদেশে রয়েছে তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগ স্থল , রয়েছে বেশ কয়েকটি ফল্ট লাইন যা এদেশকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত করে। তাছাড়া বিভিন্ন নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠা এদেশের অধিকাংশ এলাকা নরম মাটি ও পল্লী দিয়ে নির্মিত হওয়ায় ভূমি ধসের সম্ভাবনাও এখানে প্রবল। কিন্তু অপ্রত্যাশিত বিষয় হচ্ছে যখনই এদেশে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা, আমাদের করণীয় ও প্রস্তুতির কথা উঠে তখনই আমাদের সামনে উঠে আসে রূঢ় বাস্তবতা।
দুঃখজনক হলেও একথা সত্য এদেশের অধিকাংশ ভিত্তি স্থাপনা ভূমিকম্প সহনশীল নয়। অতিদ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের প্রভাবে এদেশের অধিকাংশ ভবন কাঠামো দুর্বল। তাছাড়া শহর এলাকার ভবনগুলোর মাঝে নেই নিরাপদ দুরত্ব এবং পর্যাপ্ত যাতায়াতের সুব্যবস্থা। ফলে ভয়াবহ ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও রয়েছে ব্যাপক। বিশেষজ্ঞদের দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী এদেশ পাঁচ থেকে নয় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে শুধু মাত্র ঢাকাতেই নাকি ধসে যেতে পরতে পারে লক্ষাধিক ভবন। যা আমাদের মতো মধ্যম আয়ের দেশ কিংবা মানুষ কারো জন্যেই কল্যাণকর নয়।
সত্যিই যদি বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এরকম দুর্যোগের স্বীকার হয় তবে তা এদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হবে। এখানে সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গা হলো আমাদের শিল্প খাত নিয়ে । বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের GDP, GNP , প্রবৃদ্ধির অনেকটাই আসে এই শিল্প খাত থেকে। কিন্তু অপ্রত্যাশিত বিষয় এদেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানা তৈরি হয়েছে অপরিকল্পিত ভাবে। যার ফলে সত্যিই ভয়াবহ ভূমিকম্প হলে ভূমিকম্পের যে মারাত্মক প্রভাব শিল্পখাতে পড়বে তা এদেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে পঙ্গু করে দিতে পারে। তাছাড়া এই ভূমিকম্পের ফলে আকস্মিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরতে পারে এ বাঙলার জনপদের এক বিশাল অংশ। যে ক্ষতি হয়তো আমরা কোনোদিনই আর পূর্ণ করতে সক্ষম হবো না।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী বিগত কয়েক বছর ধরে ঘন ঘন ভূমিকম্প পূর্বাভাস দিয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ কোনো ভূমিকম্পের । বিশেষ করে কিছুদিন আগে ২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ সকালের ভূমিকম্প ছিল এদেশে এযাবৎ কালের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প। সংবাদ মাধ্যমের নিউজ অনুযায়ী ৫.৭ মাত্রার এই ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা দশ , আহতের সংখ্যা শতাধিক। এই পরিসংখ্যানই যেন আমাদের চোখের সামনে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এদেশের দূর্বল প্রকৌশল ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। অথচ বিশ্বে এমনো অনেক রাষ্ট্র রয়েছে যেগুলো তীব্র ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হলেও উন্নত প্রকৌশল ব্যবস্থা ও উন্নত দুর্যোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণে অক্ষত ভাবে দাড়িয়ে আছে বছরের পর বছর ধরে। বিশেষ করে চীন, জাপান, রাশিয়ার অবকাঠামো ব্যবস্থা তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় এবছরেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়েছে রাশিয়ার Kamchatka peninsula নামক একটি অঞ্চলে । উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৮.৮। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো এই ভূমিকম্পের ফলে নিহতের সংখ্যা ছিল শূন্য। আহতদের সংখ্যা ছিল গুটি কয়েক , যদিও তীব্র এই ভূমিকম্পে প্রায় ১৪০০ টির মত বাড়ি বিপর্যস্ত হয়েছিল ( উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী) কিন্তু এই সংখ্যা আসলেই ভূমিকম্পের মাত্রা তুলনায় খুবই সামান্য। এত কম ক্ষয়ক্ষতির পেছনের কারণ ছিল তাদের উন্নত প্রকৌশল ব্যবস্থা ও উন্নত দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা ।
কিন্তু হতাশার বিষয় আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের মাত্রা এর থেকে অনেক কম হলেও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল ব্যাপক, মৃত্যের সংখ্যা ছিল দশ , আহতের সংখ্যা ছিল শতাধিক। যা মূলত আমাদের অবকাঠামো ব্যবস্থা, দায়িত্বহীনতা , দূর্নীতি, অবহেলার এক বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলে। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ হয় যখন বসবাস অযোগ্য ভবনগুলোকে সংস্কারের নামে জোড়ায় তালি দিয়ে বসবাস যোগ্য বলে চালিয়ে যুগের পর যুগ ধরে জনগণের জীবনের সাথে ছলাকলা করা হয়।
আর এই পরিস্থিতিতে ভয়াবহ ভূমিকম্পের আসন্ন সংকেত এ যেন আমাদের দেশের জন্য বিপদের এক ঘন কালো ছায়া। একেতো এদেশের বেশির ভাগ ভবনের অবকাঠামো ব্যবস্থা দূর্বল তার উপরে শহর এলাকাগুলো তীব্র ঘনবসতি পূর্ণ। ফলে সত্যিই কোনো দূর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধার কার্য পরিচালনা করা খুবই দূরহ বিষয়। তাছাড়া এদেশের বেশির ভাগ শহরের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা খুবই ভয়াবহ। জ্বালানি গ্যাসের ক্ষেত্রে নিম্ন মানের পাইপের ব্যবহারের ফলে লিকেজ , অগ্নি দূর্ঘটনা শহর গুলোর নিত্য সমস্যা। তারের জঞ্জালে ভরা শহরের কোথাও একটু সমস্যা হলেই যেখানে মহাবিপদ ঘটে সেখানে ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা যে ব্যাপক হবে তা সুনিশ্চিত। তাছাড়া ভূমিকম্প হলে বিছিন্ন হয়ে যেতে পারে সড়ক ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও ।সবমিলিয়ে সত্যিই ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানলে এদেশ আসলে মৃত্যু পুরীতে পরিনত হবে।
বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট ও বার্মা বা মায়ানমার প্লেটের সংযোগ স্থল হওয়ার কারণে এবং এই এলাকার সাবডাকশন জোনে ৮০০-১০০০ বছরের সঞ্চিত শক্তি মুক্ত না হওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটতে পারে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় গত দুই শত বছরে এই এলাকা বহুবার ভূমিকম্পে কম্পিত হয়েছে। যার মধ্যে ১৮৯৭,১৯৫০ ,২০১৬ এবং বর্তমান সময়ের ২০২৫ সালের ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ না করলেই নয়।
এই পরিস্থিতিতে আমাদের প্রয়োজন সচেতনতা, দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং উন্নত উদ্ধার পরিচালনাকারী টিম। গত কয়েক যুগে যেই ভুল আমরা করে এসেছি সেই ভুলের মাশুল হয়তো আমরা এখন দিতে পারবো না কিন্তু চাইলেই হয়তো ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমাতে সক্ষম হবো। এজন্য সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগে অধিক পুরাতন ভবনগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোকে অতি দ্রুত বাসের অযোগ্য হিসেবে ঘোষনা করা জরুরি। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালগুলোর পুরাতন ভবনগুলো অতিদ্রুত অপ্রসারণ করে নতুন করে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইনগুলোকে যথাযথ ভাবে মেরামত করা প্রয়োজন। দরকার হলে নতুন করে গ্যাস লাইনের অবকাঠামো বিনির্মাণের প্রদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষ করে সরকারি উদ্যোগে Disaster Management Planning Team গঠন করে ভূমিকম্পের পরবর্তী সময়ে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো যেতে পারে। তাছাড়া বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্য উপাত্তের প্রতি দৃষ্টি রেখে এবং বর্তমান সময়ের ঘন ঘন ভূমিকম্পের বিষয়টি দৃষ্টিতে এনে সরকার ও নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এখন উচিত অতি দ্রুত উন্নত Search And Rescue Team গঠন।
ভয়াবহ ভূমিকম্পের এই স্নিগ্ধ ক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের সবাইকেই আসলে সচেতন হতে হবে। নিজ দায়িত্ববোধ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা, ভালোবাসা থেকে নিজ নিজ বাসা বাড়ির এবং ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। অপরিকল্পিত ভাবে বাসাবাড়ি নির্মাণ পরিহার করে যাতায়াত উপযোগী পর্যাপ্ত জায়গা রেখে, ভালো প্রকৌশলী দিয়ে নকশা তৈরি করে ভবন নির্মাণ করতে হবে। প্রকৃত পক্ষে সরকার ও ব্যক্তি মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ ও সচেতনতাই এদেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। সর্বোপরি সম্ভাবনা অসম্ভাবনার এই দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমাদের সকলের উচিত সাবধান ও সচেতন থাকা । ভূমিকম্প হলে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে ভূমিকম্পের প্রাথমিক প্রদক্ষেপ গুলো যথাযথ ভাবে মেনে চলা।
