তরুণদের চোখে আজও জাগ্রত জুলাই
২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের সাথে গেঁথে আছে। জুলাই একটি মাস নয় বরং ঐক্য, পরিবর্তন ও নতুন বাংলাদেশের প্রতীক। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি আজও ম্লান হয়নি। চব্বিশের আঠারো জুলাইয়ে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা তুলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আজহারুল ইসলাম পিয়াস।
জুলাইয়ের স্মৃতিপটে চির অম্লান
দেশের সবচেয়ে বেশি ম্যাসাকার যেই স্থানগুলোতে হয়েছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য উত্তরা বিএনএস সেন্টারের। কত রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেছি। এক ভাইকে রিকশায় তুলে সেই ভাইয়ের রক্তের প্রতিশোধ নিতে আবারো সামনের সাড়িতে এসে দাঁড়িয়ে যায় কত তাজা প্রাণ। সকালের দিকে কেউ একজন বলল ভাই আপনার সাথে কেউ নাই কেন? সাথের সবাইকে ছেড়ে সামনের দিকে ছিলাম। যতটুকু মনে করতে পারছি প্রশ্নটা শহীদ শাকিল পারভেজ করেছিলেন। দুপুরের আগ দিয়ে হঠাৎ রাবার বুলেটের কয়েকটা রাবার বিদ্ধ হই, বেশি আঘাত হানে ডান চোখে। মেডিকেলের অভিজ্ঞতা অবর্ণনীয়। মূহুর্তে মূহুর্তে একটার পর একটা রিকশায় আসছে কত কত রক্তাক্ত ক্ষত বিক্ষত দেহ। উত্তরা আধুনিক হাসপাতালের কথা বলতেই হয়, যেটা বাংলাদেশ মেডিকেল নামেও পরিচিত। ফুল মেডিকেল টিম কাজ করেছেন, সব ধরনের চিকিৎসা সুবিধা দিয়েছেন; কোনো বিনিময় নেননি। আমার চোখের অপারেশন শেষে অল্প টাকা সাথে, ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম বিল কত টাকা? বললেনঃ বাবা আমরা নামতে পারি নাই। বিলের কথা বলে লজ্জা দিয়ো না। আমি গুলিবিদ্ধ হওয়ায় অনেকের মনে ভয় তৈরী হতে পারে কারণ রাবার বুলেটের বিষয়টি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে বর্ণনা হচ্ছিল। বাড়িতে কেউ একজন আম্মুকে ফোন দিয়ে জানিয়েছেন মিনহাজের মাথায় একপাশ দিয়ে গুলি ঢুকে আরেকপাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। অতঃপর সবাইকে স্বাভাবিক করলাম। একটা রিকশা নিলাম মেডিকেল থেকে আবার বিএনএস যাবো। পথিমধ্যে আখের রস বিক্রেতা রিকশা আটকে দাড়িয়ে বললেন আখের রস খেয়ে যেতে হবে। বিএনএসে এসে বসলাম। চেনা-অচেনা কত ভাই-বোন সমবেদনা জানাচ্ছেন ইয়ত্তা নেই। কেউবা জড়িয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিচ্ছেন, কেউবা পকেটে টাকা গুঁজে দিয়ে বলছেন ভাই মানসিক তৃপ্তি নেয়ার জন্য এটা দিয়েছি এটা রাখতে হবে। আন্দোলনের দিনগুলোতে যতটুকু মনে করতে পারছি কোনদিন খাবার সংকটে পরতে হয়নি। বিস্কুট, টিফিন বাটিতে করে ভাত-তরকারি, খিচুড়ি, স্যালাইন, টিয়ার গ্যাস থেকে বাচার জন্য আগুন, পেস্ট কোনকিছুর ঘাটতি ফেস হয়নি কোনদিন। খাবার, চিকিৎসা সেবা শুশ্রূষা কাজগুলোতে মা-বোনদেরকে বেশি ভূমিকা পালন করতে দেখেছি। সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে ফিরে শুনি মিল্লাত থেকে দাখিল শেষ করা শাকিল পারভেজ শাহাদাত বরন করেছেন। এটি ছিল জুলাইয়ের আঠারো তারিখের ঘটনা, যা স্মৃতির পাতায় চির অম্লান হয়ে থাকবে।
এম এম আল মিনহাজ
স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক, ডাকসু
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন তা’মীরুল মিল্লাত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (টাকসু)-এর ভিপি।
জুলাইয়ে রণাঙ্গনে অধিকার আদায়ের সম্মিলিত প্রয়াস
কোটা আন্দোলনে বেরোবি শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর আন্দোলনের গতিপথ নতুন দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে। ১৮ জুলাই ঘোষণা করা হয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। সেই কর্মসূচিতে অংশ নিতে এবং কোটা বৈষম্যের প্রতিবাদ জানাতে ১৮ তারিখ সকাল দশটায় উপস্থিত হই উত্তরা বিএনএস সেন্টারে। শুরুতে আমি, আমার বন্ধু বায়জিদ ও আরো কয়েকজন একসাথেই ছিলাম। আকস্মিকভাবে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল গ্যাস নিক্ষেপ শুরু করে; আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। শিক্ষার্থীরা সেখানে দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেদিন রণাঙ্গনে সম্মুখসারি থেকে আমি দেখেছি অসংখ্য শিক্ষার্থীর গুলি খাওয়ার দৃশ্য! একসাথেই আগাচ্ছি, চোখের সামনেই পাশের জন গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ছে। সেদিন দুপুরের পরের ঘটনা, কয়েকজন পুলিশ সদস্য হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের কিছু কথা বলার জন্য কাছে ডাকলে একজন শিক্ষার্থী এগিয়ে যায় তাদের ডাকে, পুলিশ গুলি ছুঁড়ে তার দিকে, ঘটনাস্থলেই সে শহীদ হয়। ঘন্টাখানেক পর আমরাও পুলিশের খুব কাছে চলে গিয়েছিলাম। তারা টিয়ারশেল গ্যাস নিক্ষেপ করে। বিস্ফোরণের আতংকে আমি সেটি হাতে নিয়ে পুলিশের দিকেই আবার নিক্ষেপ করি, আমার হাত পুড়ে যায়। অনেক খোজ করেও পানি মিলছিল না।তখন কেউ একজন ঠান্ডা পানি আমার হাতে ঢালায় একটু স্বস্তি পেয়েছিলাম। আর এই অবস্থাতেই আন্দোলনে ছিলাম বিকেল হওয়া পর্যন্ত; আহত হয়েছি আমি ও আমার অনেক সহপাঠী। সেদিন উত্তরার সাধারণ মানুষ নিজেদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে থেকেছেন। পানি, খাবার স্যালাইন, বার্গার, বিস্কুট আর কেক নিয়ে নিজেদের সাধ্যমতো এগিয়ে এসেছেন ও আমাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত এই প্রচেষ্টা ভুলে যাবার নয়। আঠারো জুলাই আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটি জীবন্ত ইতিহাস, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় একটি অধ্যায়!
আজহারুল ইসলাম পিয়াস
শিক্ষার্থী, আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
ঐতিহাসিক জুলাইয়ে অবিস্মরণীয় একটি দিন
আলিম পরীক্ষা দিয়ে সবে মাত্র রুমে এসে পরবর্তী পরীক্ষা স্থগিত দেখে অবাক হলাম। সন্ধ্যার পর তিতুমীর হলের ৫০০৯ নাম্বার রুমে শুয়েছিলাম। হঠাৎ কেউ একজন দেখালো, “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার রাজাকার” স্লোগানে উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পরদিন ১৮ই জুলাই সারাদেশে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। কিন্তু সকালে উঠেই চোখে পড়লো গেইটে ডজনখানেক পুলিশ মোতায়েন করা, যেন আন্দোলনে কেউ অংশগ্রহণ করতে না পারে। খুব সাবধানতার সাথে আমরা পকেট গেইট ধরে বেরিয়ে গেলাম উত্তরা বিএনএস সেন্টারের দিকে। পৌঁছে দেখি আমার অসংখ্য বন্ধুবান্ধবের রাজপথে স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। যেহেতু কোনো পূর্বনির্দেশনা ছিল না, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিলাম। আচমকা পুলিশ ফাঁকা বুলেট আর আর টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ শুরু করল। মুহূর্তেই উত্তরা বিএনএস রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। পুলিশ এবং ছাত্রজনতার ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া প্রায় তিনঘণ্টা চলতে থাকে। দুপুর বেলায় শরীরটা খুবই দুর্বল হয়ে পড়লো। তবুও সামগ্রিক অবস্থা দেখতে ফ্লাইওভারে উঠলাম। সেই দৃশ্য আমি কোনদিন ভুলতে পারব না; কী যে বিভৎস অবস্থা! চোখের সামনে অসংখ্য ছাত্র গুরুতর আহত হচ্ছিল। কারো চোখে, কারো পেটে কিংবা পায়ে গুলি লেগেছে। এভাবেই চললো বিকেল পর্যন্ত। অন্যদিকে ক্যাম্পাসে ফিরব ভেবে একটা রিকশায় করে টঙ্গী বাজার এসে দেখি ছাত্রলীগের সদস্যরা ঢালাওভাবে চড়াও হচ্ছে লাঠি-সোঁটা নিয়ে। শঙ্কা এবং ভীতির মধ্য দিয়েই ক্যাম্পাসে ফিরে দেখি ক্যাম্পাসে প্রশাসনের কড়া অবস্থান। শিক্ষার্থীদের রাতেই হল ছাড়তে বাধ্য করা হলো। আঠারো জুলাই ইতিহাসের এমন একটি দিন যা আমার জীবনের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
আশিক রাব্বানী
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
