সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা কি চলতেই থাকবে?

স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক অধিকার এবং সরকারি হাসপাতালগুলো সেই অধিকার পূরণের প্রধান স্থান। এখানে ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সব স্তরের নাগরিক ন্যূনতম ব্যয়ে মানসম্মত চিকিৎসার প্রত্যাশা নিয়ে আসে। কিন্তু হতাশাজনক হলো, বর্তমানে অব্যবস্থাপনার কালো ছায়ায় মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সরকারি হাসপাতাল থেকে। কারণ এখানে বহুমুখী সমস্যার বেড়াজালে অসুস্থ মানুষ আরও বেশি অসুস্থতায় ভোগে। যেমন : বেডের জন্য হাহাকার, রি-এজেন্টের (পরীক্ষার উপকরণ) অভাব, যথাসময়ে রিপোর্ট না পাওয়া, অপরিষ্কার শৌচাগার, দালালদের দৌরাত্ম্য, দিনের পর দিন নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সর্বোপরি একজন রোগীর প্রতি মানবিক আচরণের অভাব- এই চিত্রগুলো এখন প্রায় নিত্যদিনের। সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও সেই অর্থ সঠিকভাবে সেবার মান উন্নয়নে কাজে লাগছে না।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ দেশের সব সরকারি হাসপাতালে ক্লিনার-সুইপাররা কাজ না করে আড্ডায় সময় কাটাচ্ছেন। রোগী, নার্স ও ডাক্তারদের ব্যবহৃত বিছানাপত্র, অ্যাপ্রোনসহ কাপড়চোপড় নোংরা ও দূষিত পানিতে ধোয়া হচ্ছেরোগীর জন্য ট্রলি বা হুইলচেয়ার ব্যবহার করতেও দালালদের সাহায্য নিতে হয় এবং দিতে হয় বাড়তি টাকা। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সব ক্ষেত্রে একই দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল সাময়িক সমাধান নয় বরং প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ, যা সাধারণ মানুষের অধিকার এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারবে। প্রয়োজন হাসপাতালগুলোকে দালালমুক্ত, মধ্যস্বত্বভোগী কালচার বিলুপ্ত ও দুর্নীতিমুক্ত করা। বহিরাগত দালালদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে অভিযান কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং হাসপাতালের ভেতরের অসাধু কর্মীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই হতে হবে প্রধান অগ্রাধিকার। দালালচক্রের শিকড় উপড়ে ফেলতে রোগী ভর্তি, শয্যা বরাদ্দ, পরীক্ষার সিরিয়াল ও রিপোর্ট সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোকে শতভাগ ডিজিটাল অথবা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রগুলোতে মনিটরিং করা। পেশাগত জবাবদিহিতা, চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি, সরঞ্জাম ব্যবহারের স্বচ্ছতা, মানবিক আচরণ ও দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট বিভাজন নিশ্চিত করা উচিত এবং যেকোনো অবস্থাতেই প্রশিক্ষণবিহীন কর্মীদের দিয়ে চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারে সহায়তা নেওয়ার মতো প্রাণঘাতী অনিয়মগুলো রোধ করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি তার কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ চিকিৎসা উপকরণ ও ওষুধের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত এবং অনিয়ম রোধ করা যায়।

