“বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দৈন্যদশা ও উত্তরণ”

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দৈন্যদশা এবং উত্তরণ
মোঃ ইমন হোসেন
একটি জাতির নৈতিক উচ্চতা মাপা যায় তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হয় তা দিয়ে, আর তার বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা মাপা যায় শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার মানদণ্ড দিয়ে। দুর্ভাগ্যবশত, ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের আত্মোপলব্ধি বলছে, আমরা উভয় পরীক্ষাতেই পিছিয়ে পড়ছি। যখন একটি জাতির সৃজনশীল সত্তা কেবল বাণিজ্যিক জৌলুস আর সস্তা জনপ্রিয়তার আড়ালে হারিয়ে যেতে থাকে, তখন সেই জাতির আত্মিক মৃত্যু ঘটে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের সংকট এবং অমর একুশে বইমেলার নিস্প্রাণ রূপ কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং আমাদের সমষ্টিগত রুচি ও মননের এক রূঢ় বাস্তবতা। এই বদ্ধ দশা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা নয়, বরং একটি সুসংহত সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতা।
বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান সংকট:
সোনালী অতীত পেছনে ফেলে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প আজ এক অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত। মৌলিক গল্পের অভাব, ভিনদেশি সিনেমার সস্তা অনুকরণ এবং কারিগরি মানের নিম্নগামিতা দর্শকদের হলবিমুখ করে তুলছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মান্ধাতা আমলের প্রেক্ষাগৃহের বিলুপ্তি এবং পেশাদারিত্বের চরম ঘাটতি। একটি শক্তিশালী শিল্প হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে এখন কেবল অনুদান নয় বরং আধুনিক সিনেমা হল নির্মাণ, সেন্সরশিপের সংস্কার এবং মেধাবী নির্মাতাদের বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন; অন্যথায় এই শিল্পটি কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
দ্বিতীয়ত, অমর একুশে বইমেলা ২০২৬: নিস্প্রাণ কার্নিভালের ব্যবচ্ছেদঃ-
এবারেরর অমর একুশে বইমেলা যেন আমাদের সমষ্টিগত রুচি ও মননের এক রূঢ় দর্পণ। মাত্র ১৮ দিনের সংকুচিত সময়সীমা, পবিত্র রমজানের সংযম আর রাজনৈতিক অস্থিরতার ত্র্যহস্পর্শে ২০২৬-এর মেলা প্রকাশনা শিল্পের ইতিহাসে এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকবে। এটি কেবল একটি বর্ষপঞ্জির আয়োজন ছিল না, ছিল আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক হাহাকারের এক নগ্ন দলিল। শুষ্ক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে হৃদকম্পন বেড়ে যায়। ২০২৫ সালে যেখানে ৪০ কোটি টাকার বইয়ের বিনিময়ে জ্ঞানের লেনদেন হয়েছিল, ২০২৬-এ তা ধসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৭ কোটিতে। নতুন বই প্রকাশের সংখ্যাও ৩২৯৯ থেকে সংকুচিত হয়ে নেমে এসেছে ২০০৭-এ। এই সংখ্যাগুলো কেবল কাগজের হিসাব নয় বরং একটি সৃজনশীল জাতির সৃজনী-শক্তির পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার ইঙ্গিত। তবে, মেলা প্রাঙ্গণে জনস্রোতের কোনো কমতি ছিল না, কিন্তু সেই জনারণ্যে ‘পাঠক’ ছিল নিখোঁজ। স্টলগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইন ছিল, তবে তা বই কেনার জন্য নয়, বরং লেখকের সঙ্গে একটি কাঙ্ক্ষিত ‘ডিজিটাল ফ্রেম’ বা সেলফিতে বন্দি হওয়ার জন্য। বইয়ের ভাঁজে থাকা চিন্তার অতল গভীরে অবগাহন করার চেয়ে এখনকার প্রজন্মের কাছে লেখকের সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হওয়াটাই অধিকতর ‘মূল্যবান’ হয়ে উঠেছে। আর যখন মেলা প্রাঙ্গণে নতুন বইয়ের সোঁদা গন্ধকে ছাপিয়ে পার্শ্ববর্তী ক্যাফেটেরিয়ার মুখরোচক ঘ্রাণ জনতাকে বেশি প্রলুব্ধ করে, তখন বুঝতে হবে এই জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক হজমশক্তিতে এক মারাত্মক ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। আমরা জ্ঞানতৃষ্ণা ভুলে গিয়ে কেবল উদরপূর্তি আর দৃশ্যমান জৌলুসের মোহে মত্ত হয়েছি। ২০২৬-এর এই পাঠকশূন্যতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, আমরা হয়তো একটি ‘উৎসবপ্রিয়’ জাতিতে রূপান্তরিত হতে পেরেছি, কিন্তু ‘জ্ঞানতপস্বী’ হওয়ার পথ থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি।
“নিজস্ব সংস্কৃতি ও সফট পাওয়ার পলিটিক্স”
আমরা দক্ষিণ কোরিয়ার ‘প্যারাসাইট’ বা ‘স্কুইড গেম’-এর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হই, কিন্তু ভুলে যাই যে তারা ২০০০ সাল থেকে সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয় জিডিপির অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। আমাদের এখানে শিক্ষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। সংস্কৃতি এখানে কেবল ‘অনুষ্ঠান’ নির্ভর, ‘আন্দোলন’ নির্ভর নয়। ২০২৬-এর এই সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের কমপক্ষে ১০ বছরের একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রয়োজন, যেখানে টেকনিক্যাল অবকাঠামো থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ডিস্ট্রিবিউশন পর্যন্ত সব যুক্ত থাকবে।
ফ্রান্স একটি বিশেষ আইন করে রেখেছে যাকে বলা হয় “L’exception culturelle”। এর অর্থ হলো, সংস্কৃতি কেবল একটি পণ্য নয়, এটি জাতির আত্মা। তাই ফ্রান্সে সিনেমা বা বইয়ের ওপর মুক্তবাজার অর্থনীতি কাজ করে না; সরকার সরাসরি এখানে হস্তক্ষেপ করে। প্রতিটি সিনেমার টিকিটের একটি অংশ কেটে রাখা হয় নতুন সিনেমা বানানোর ফান্ড হিসেবে। ফলে, হলিউডের বিশাল আগ্রাসন সত্ত্বেও ফ্রান্সে এখনো তাদের নিজস্ব সিনেমা ও সাহিত্যের বাজার অটুট। তাদের প্রতিটি স্কুলে ছোটবেলা থেকেই শিল্প সমালোচনা শেখানো হয়, যার ফলে সেখানে পাঠক বা দর্শকের রুচি তৈরি হয় শৈশবেই।
তুরস্ক গত ১৫ বছরে তাদের টেলিভিশন ড্রামা বা ‘ডিজি’র মাধ্যমে বিশ্বকে জয় করেছে। তারা প্রমাণ করেছে যে শুধু হলিউড বা বলিউড নয়, নিজস্ব ঐতিহ্য দিয়েও বাজার দখল সম্ভব। নির্মাতাদের জন্য বিশাল ভর্তুকি এবং কর ছাড় দেয়। বর্তমানে তুরস্ক বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম টেলিভিশন সিরিজ রপ্তানিকারক দেশ (যুক্তরাষ্ট্রের পরেই)। ১৫০টিরও বেশি দেশে প্রদর্শিত হয়, যা তুরস্কের পর্যটন শিল্পকে এক লাফে ৩০-৪০% বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের দেশের নাটক বা ওটিটি কন্টেন্ট নিয়ে এমন কোনো জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা এখনো কল্পনার বাইরে।
আমাদের কি সেই সক্ষমতা নেই? স্পর্ধার সঙ্গেই বলছি, অবশ্যই আছে। বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণায় লুকিয়ে আছে বিশ্বজয়ী সব আখ্যান। আমাদের অবিনাশী মুক্তিযুদ্ধ, পলি-বিধৌত নদীমাতৃক জীবনধারা, এই জনপদের প্রাকৃত মানুষের অবাধ্য লড়াই আর তপ্ত রক্তে কেনা বর্ণমালা—এসবই তো বিশ্বজনীন সিনেমার একেকটি ধ্রুপদী ‘কাঁচামাল’। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, শ্রেষ্ঠ সব উপাদান আর মশলা হাতের কাছে থাকলেই তা সুস্বাদু ব্যঞ্জনে রূপ নেয় না; তার জন্য প্রয়োজন একটি আধুনিক ‘রন্ধনশালা’, প্রাজ্ঞ ‘রন্ধনশিল্পী’ এবং শৈল্পিক ‘সরঞ্জাম’।
আমাদের গল্পের খনি আছে, কিন্তু সেই গল্পকে সেলুলয়েডে বন্দি করার মতো সুসংহত ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোলজি’ নেই। এই শূন্যতা ঘুচিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের চারটি চারটি স্তম্ভের সমন্বয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তৈরি করবে রুচিবোধ ও মেধা, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জোগাবে শৈল্পিক পৃষ্ঠপোষকতা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একে দেখবে বৈশ্বিক রপ্তানি পণ্য হিসেবে এবং পর্যটন মন্ত্রণালয় একে ব্যবহার করবে দেশের ব্র্যান্ডিংয়ে। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র হতে পারতো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ‘সফ্ট-পাওয়ার’। ২০২৬-এর এই সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের কমপক্ষে ১০ বছরের একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রয়োজন, যেখানে টেকনিক্যাল অবকাঠামো থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ডিস্ট্রিবিউশন পর্যন্ত সব যুক্ত থাকবে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, সেই দূরদর্শী নীতিনির্ধারণী সংলাপটি আর অনুষ্ঠিত হয় না। আমরা দীর্ঘমেয়াদী উত্তরণের ‘ভিশন’ বিসর্জন দিয়ে কেবল আগামী উৎসবের সস্তা চমক আর ‘ভাইরাল’ হওয়ার সাময়িক উন্মাদনায় মেতে থাকি। আমাদেরও বোঝা দরকার যে সংস্কৃতি কোনো সস্তা পণ্য নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের ‘কালচারাল এক্সেপশন’; যার সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে সরাসরি বিনিয়োগ করতে হয়।”
এখন করণীয় কী? নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রস্তাব:
প্রথমত: এই দুই শিল্পখাতকে কেবল মৌসুমি উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করা অপরিহার্য। প্রতিটি জেলা পর্যায়ে বছরব্যাপী বই পড়ার সংস্কৃতি, জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনা এবং লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, আধুনিক সিনেপ্লেক্স স্থাপনের মাধ্যমে দেশীয় ও বৈশ্বিক ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের নিয়মিত প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে একটি রুচিশীল ও প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণ এখন সময়ের দাবি
দ্বিতীয়ত: এগুলোকে জাতীয় শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। কর সুবিধা, ঋণ সুবিধা ও রপ্তানি সহায়তাসহ বিভিন্ন সুবিধা গার্মেন্টস শিল্পের মতো সিনেমা ও প্রকাশনা শিল্পের জন্যও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত:- আগামী ৫ বছরের রোডম্যাপ: প্রথম ১-৩ বছর: জাতীয় চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা নীতি প্রণয়ন এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ফিল্ম ইনস্টিটিউট স্থাপন (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে)। পরবর্তী ২-৫ বছর: ৫টি আন্তর্জাতিক মানের ভিএফএক্স ও পোস্ট-প্রোডাকশন স্টুডিও স্থাপন এবং বছরে ন্যূনতম ৪টি বাংলাদেশি সিনেমা আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। পরবর্তী ৩-৫ বছর: বাংলা বই, সিনেমা, কালচারাল কনটেন্ট ইত্যাদি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য অনুবাদ সহায়তা ও কপিরাইট এক্সচেঞ্জ কার্যক্রম পুরোদমে চালু করা।
পরিশেষে এসে এটা বলতে দ্বিধা হওয়া উচিত নয় যে, সিনেমা যেমন একদিকে একটা আর্ট, একটা শিল্প, বিপ্লবের মুখপাত্র এবং সাহিত্যের মতো সামাজিক দর্পণ; তেমনি অন্যদিকে সিনেমা শুধু সিনেমা না, এটা মানুষের চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম এবং পলিটিক্স ও ডিপ্লোমেসির অন্যতম সেরা একটি হাতিয়ার।

