বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

গেম ঘর: ইউরোপ যাত্রার মরণফাঁদ

Author

মোঃ ইমন হোসেন , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৬১ বার

গেম ঘর: ইউরোপ যাত্রার মরণফাঁদ
মো. ইমন হোসেন

গেম ঘর— এই শব্দটি শুনলে একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনো আধুনিক গেমিং জোন বা বিনোদনকেন্দ্র; কিন্তু ভূমধ্যসাগরের তীরে লিবিয়ার মরুভূমিতে এই শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ আধুনিক দাসত্ব ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের আখ্যান। সাম্প্রতিক, অর্থাৎ গত ২৮/০৩/২০২৬ তারিখে যমুনা টেলিভিশনের খবরে এবং ২৮ মার্চ ২০২৬ তারিখের পৃথক সংবাদ অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে এবং গ্রিসে যাওয়ার পথে খাবার ও পানির তীব্র সংকটে সুনামগঞ্জের ৫ জন যুবক প্রাণ হারিয়েছেন।
এই ঘটনাগুলো কেবল লাশের সংখ্যা প্রকাশ করে না; বরং দালালের প্রলোভনে পড়ে উত্তাল সমুদ্র আর অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে শেষ হয়ে যাওয়া অসংখ্য স্বপ্নের করুণ পরিণতি তুলে ধরে। হাজারো মানুষ আজ নিখোঁজ—কারো লাশ ভাসছে নোনা জলে, কেউ পচছেন লিবিয়ার অন্ধকার আস্তানায়, আবার কেউ মরুভূমিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন। এঁরা সবাই স্বপ্নের ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় ঘরছাড়া মানুষ।
এবার বোঝার চেষ্টা করি, ‘গেম ঘর’ কী এবং এর কাজ কী। পাচারকারীদের ভাষায় ‘গেম ঘর’ হলো একটি ট্রানজিট পয়েন্ট। ঢাকা থেকে দুবাই, মিশর কিংবা তুর্কিয়ে হয়ে যখন একজন অভিবাসনপ্রত্যাশী লিবিয়ায় পৌঁছান, তখন তাকে একটি বদ্ধ ঘরে আটকে রাখা হয়। বিভিন্ন ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাদারীপুরের মিলনের মতো শত শত যুবককে অমানবিক পরিবেশে গাদাগাদি করে রাখা হয়। সেখানে নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নেই খাবারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ‘গেম ঘর’-এ যাওয়ার অর্থ হলো পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। পাচারকারীরা অভিবাসীদের মোবাইল ফোন ও পাসপোর্ট কেড়ে নেয়। এরপর শুরু হয় তথাকথিত ‘আসল গেম’। এখানে প্রতিটি যুবককে একটি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দালালেরা তাদের ভাষায় বলে ‘গেম দেওয়া’, যার অর্থ—মৃত্যুকে তুড়ি মেরে সাগরে নৌকা ভাসানো। কিন্তু এই নৌকায় ওঠার আগেই প্রতিটি প্রাণকে নিংড়ে নেওয়া হয়।
লিবিয়ার ‘গেম ঘর’ কিংবা ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ আজ আর কেবল অভিবাসনের পথ নয়; বরং একবিংশ শতাব্দীর নির্মম বধ্যভূমি। ২৮ মার্চ ২০২৬-এর মতো শোকাবহ ঘটনাগুলো আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—কেবল কঠোর আইন দিয়ে এই মৃত্যুযাত্রা থামানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা, বৈধ কর্মসংস্থানের সহজলভ্যতা এবং পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে আপসহীন বিচারব্যবস্থা
অনেক সময় এক দালাল অন্য দালাল বা মাফিয়াদের কাছে ভিকটিমদের বিক্রি করে দেয়, যাকে বলা হয় ‘চেকপোস্টে বেচে দেওয়া’। এমনকি ‘গেম ঘর’-এর অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। দালালেরা অভিবাসীদের হাত-পা বেঁধে ইলেকট্রিক শক দেয়, লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হাড় ভেঙে দেয় এবং সেই আর্তচিৎকার বাংলাদেশে থাকা তাদের পরিবারের সদস্যদের মোবাইলে শোনায়। মাদারীপুরের মিলনের পরিবার থেকে দফায় দফায় ৪২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। শরীয়তপুরের রাতুলকে গুলি করে মরুভূমিতে ফেলে রাখা হয়েছে। দালালেরা মানুষের কান্নাকে পুঁজি করে নির্মম বাণিজ্য চালাচ্ছে। ১০ লাখ থেকে শুরু করে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দেওয়ার পরও অনেকের কোনো খোঁজ মেলে না।
এবার এক দশকের পরিসংখ্যানের আলোকে ইউরোপ যাত্রার এই মরণফাঁদের চিত্র দেখা যাক। গত এক দশকে (২০১৫–২০২৫) ভূমধ্যসাগর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের যুবসমাজের এক বিশাল গণকবর। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) ও ফ্রন্টেক্সের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে এই মরণপথে পা বাড়িয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি যুবক। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই সময়ে অন্তত ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ বাংলাদেশি যুবক সমুদ্রের নোনা জলে প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছেন আরও প্রায় ৫,৫০০ থেকে ৬,০০০ জন, যাদের পরিবার আজও লিবিয়ার মরুভূমি বা ভূমধ্যসাগরের তীরে প্রিয়জনের লাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
পাচারের এই বিষবৃক্ষ সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত হয়েছে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালী জেলায়। মোট পাচার হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশই এই কয়েকটি জেলার বাসিন্দা এবং তাদের মধ্যে ৯২ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে সক্ষম ও তরুণ জনশক্তিকেই সুপরিকল্পিতভাবে এই মৃত্যুফাঁদে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আর্থিক ক্ষতির দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক দশকে একেকজন অভিবাসী গড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন, যা ২০২৪–২০২৬ সালে এসে মুক্তিপণসহ ২০–২৫ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচারকারী ও মাফিয়াদের পকেটে প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ চলে গেছে।
লিবিয়ায় পৌঁছানো বাংলাদেশিদের প্রায় ৬০ শতাংশই কোনো না কোনো পর্যায়ে বন্দি হয়েছেন এবং ৮০ শতাংশই ‘গেম ঘর’ বা মাফিয়াদের হাতে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অথচ বিচারহীনতার সংস্কৃতি এতটাই প্রকট যে, মানবপাচার দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে ৪ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন থাকলেও সাজার হার মাত্র ১.৫ থেকে ২ শতাংশ। এই দুর্বল আইনি ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই দালাল চক্র আজ আমাদের তরুণদের রক্ত নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ২০২৬ সালেও এই মৃত্যুযাত্রা থামেনি। চলতি বছরের শুরুতে প্রচণ্ড শীতে তিউনিসিয়ার উপকূলে অন্তত ১২ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। এমনকি এই মার্চ মাসেই (২০২৬) মাল্টা ও ইতালি সীমান্তে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ৫–৭ জন বাংলাদেশি যুবক ডিহাইড্রেশনে মারা গেছেন। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘ওশান ভাইকিং’ (Ocean Viking) যখন তাদের খুঁজে পায়, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। দালালেরা এখন লিবিয়ার পাশাপাশি তিউনিসিয়া রুট ব্যবহার করছে, যা আগের চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সর্বশেষ গত ২৮ মার্চ ২০২৬ তারিখেও এই মরণফাঁদের কবলে পড়েছেন ২৩ জন স্বপ্নবাজ প্রান্তিক যুবক।
প্রতিরোধে করণীয়: রাষ্ট্র ও সমাজের দায়বদ্ধতা
অবৈধ পথে এই ভয়াবহ পাচার ও ‘গেম ঘর’-এর মরণফাঁদ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
প্রথমত,
ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। বিশেষ করে শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও সিলেটের মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে উঠান বৈঠক, মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রচার চালাতে হবে। বাস্তবতা তুলে ধরে ‘গেম ঘর’-এর অমানবিক নির্যাতন এবং ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর বিভীষিকা সম্পর্কে যুবসমাজকে সচেতন করতে হবে। ইমাম ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে পাচারবিরোধী প্রচারণা জোরদার করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত,
বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার তথ্য সহজলভ্য করতে হবে। অনেক সময় সঠিক তথ্যের অভাবে মানুষ দালালের খপ্পরে পড়ে। ইতালি সরকারের ‘ফ্লুসি ডিক্রি’ (Flussi Decree) অনুযায়ী বৈধ ভিসা প্রক্রিয়া সম্পর্কে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে (DEMO) হেল্পডেস্ক চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC) থেকে ভাষা ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে সরকারি সংস্থা (BOESL)-এর মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত,
স্থানীয় দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্রামাঞ্চলে সক্রিয় ‘সাব-এজেন্ট’দের চিহ্নিত করে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবার যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়েও নজরদারি জরুরি।
চতুর্থত,
সীমান্ত ও অভিবাসন নজরদারি জোরদার করতে হবে। ভিজিট ভিসায় দুবাই বা মিশর হয়ে লিবিয়া যাওয়ার রুটগুলোতে ইমিগ্রেশন পুলিশের নজরদারি বাড়ানো এবং সন্দেহজনক যাত্রীদের কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন। পাশাপাশি লিবিয়া ও তুরস্ক সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রকে ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
সবশেষে, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক বা কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে যুবকদের দেশে থেকেই আয়মুখী কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো জরুরি।
লিবিয়ার ‘গেম ঘর’ কিংবা ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ আজ আর কেবল অভিবাসনের পথ নয়; বরং একবিংশ শতাব্দীর নির্মম বধ্যভূমি। ২৮ মার্চ ২০২৬-এর মতো শোকাবহ ঘটনাগুলো আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—কেবল কঠোর আইন দিয়ে এই মৃত্যুযাত্রা থামানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা, বৈধ কর্মসংস্থানের সহজলভ্যতা এবং পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে আপসহীন বিচারব্যবস্থা। ‘গেম ঘর’-এর এই মরণফাঁদ বন্ধ করতে হলে আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় যদি আমরা দালালদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে পারি এবং বৈধ পথের তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারি, তবেই এই মৃত্যুযাত্রা থামানো সম্ভব।

লেখক : তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল : mdemonhossain.lawyer@gmail.com

লেখক: সভাপতি, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে দ্য দৈনিক মূলধারা পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!