“কিশোর গ্যাং ও সামাজিক অবক্ষয়”

কিশোর গ্যাং ও সামাজিক অবক্ষয়; দায় কার এবং করণীয় :- মোঃ ইমন হোসেন
আমাদের দেশে ২০১২ সাল থেকে কিশোর গ্যাং নামের একটি সন্ত্রাসী সংস্কৃতির অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হলেও ২০১৭ সালে উত্তরায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির হত্যার মাধ্যমে এদের কর্মকাণ্ড আলোচনায় আসে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এর ব্যাপকতা বুঝতে কিশোর গ্যাং লিখে, ইউটিউব বা গুগলে সার্চ দিলেই এর ভয়াবহতা বুঝতে পারার কথা! মোটা দাগে এর কারণগুলো যদি বলা হয়, তা হলে হবে সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মীয় মূল্যবোধের অবমাননা, দুর্বল কাঠামোর শিক্ষানীতি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্কোচন, অপরাধনির্ভর দেশি-বিদেশি সিনেমা, হিরোইজম এবং রাজনৈতিক নীতিহীনতাকেই এই কিশোর গ্যাং নামের সামাজিক দুর্যোগের কারণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
একজন শিশুর প্রথম পাঠশালা তার পরিবার। স্বামী-স্ত্রী নিত্য ঝগড়া-কলহ আর বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের ভরণপোষণের সঙ্গে পরিবারের কর্তা বা অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে সন্তান বেপরোয়া হয়ে বেপথে চলে যায়। সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের জায়গাটা দুর্বল হয়ে গেলে তা কিশোরদের খুব দ্রুত অপরাধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। মূলত পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই কিশোররা আজ বিপথগামী। শিশু-কিশোরদের পথভ্রষ্ট হওয়ার বড় একটি কারণ হলো ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়। এক সময় প্রতিটি এলাকায় মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিনদের একটি বিশেষ অবস্থান ছিল। তাদের ছোট-বড় সবাই মানত। শিশু-কিশোররা তাদের কথা অবশ্য পালনীয় মনে করত। তারাও এলাকার কিশোর-তরুণদের স্নেহ-আদর এবং শাসন করতেন। সমাজে সেই ধর্মীয় সংস্কৃতির অবনতি ঘটেছে।
কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির চর্চার পেছনে সবচেয়ে প্রভাবশালী যে কারণ সেটি হলোÑ রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি। রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতারা দেশ পরিচালনার নীতিনির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। যখন রাজনৈতিক নেতারা অপরাধপ্রবণ ও বিপথগামী হয়, তখনই কিশোর গ্যাং সৃষ্টি ও বৃদ্ধিসহ প্রতিপালন ও পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংশ্লিষ্ট হয়ে ওঠেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা উঠতি বয়সী ও বেপরোয়া এসব কিশোরকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়েদা নিয়ে থাকে। রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কাজেও তাদের ব্যবহার করা হয়।
প্রথমত, পরিবার থেকেই এর সচেতনতা শুরু এবং প্রতিরোধেও অগ্রগণ্য রাখা উচিত। যেহেতু এই কিশোর বয়সটি অনেক বেশি দুরন্ত এবং অজানাকে জানা ও ফ্যান্টাসিসহ হিরোইজমের ভিত্তিতে থাকে তখনই পারিবারিক কঠোর শাসন ও স্নেহ দিয়ে কিশোরদের যথাযথ তদারকি করতে হবে। তারা প্রযুক্তি ব্যবহার করে কী করছে, তারা কী শিখছে, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করছে এসব বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। শ্রেণিতে আলোচনা করতে পারেন কিশোর গ্যাংয়ের ক্ষতিকর প্রভাব ও সামাজিক অবক্ষয় সম্পর্কে এবং বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম শিশু-কিশোরদের মানসিক শক্তিশালী এবং নেতৃত্ব গুণাবলি সৃষ্টিতে সাহায্য করেও কিশোর গ্যাং কালচার প্রতিরোধ করা সম্ভব। অর্থাৎ খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া যারা ছিন্নমূল রয়েছে, সেই শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে যত্ন নিতে হবে। এর জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এবং এনজিও বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। শিশু আইনে গ্যাং-কালচারের বিধান ও এর শাস্তি যুক্ত করে আইন প্রয়োগ করতে হবে। এ ছাড়া ছিন্নমূল শিশু-কিশোর ও যারা গ্যাং কালচারের সঙ্গে জড়িত তাদের সরকার, এনজিও এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে খুঁজে বের করে আলাদা করতে হবে এবং তাদের যথাযথ তদারকির মধ্যে রাখতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্য একটি দায়িত্ব হতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর, তা হলো রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি প্রতিরোধ করা। তা হলে হয়তো এই সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

