মুজিব আমলের দুঃশাসন: ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে) হাত উঁচিয়ে বলিষ্ঠভাবে ”এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম” ঘোষণা দেয়া শেখ মুজিবুর রহমানকে হয়তো সবাই-ই চিনে। পুরো বাংলাদেশব্যাপী একটা সময় মুজিব বন্দনা চলেছে।বইয়ের পাতায় পাতায় শেখ মুজিবকে অনন্য এক মহানায়ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এই সুনাম আর বন্দনার আড়ালে মুজিব শাসন আমলের যেই কলঙ্কিত অধ্যায় চাপা পড়ে আছে, সে ইতিহাস হয়তো অনেকেরই অজানা। বিশেষত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার নিয়োগকৃত তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের লেখা ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বই পড়ে নতুন প্রজন্মের অনেকেই আজও বিভ্রান্ত। একটা সময় আমরাও ছিলাম এই চেপে রাখা ইতিহাসের চর্চার বাইরে।
তবে সত্যের অনন্য এক শক্তি হলো, তা দিনশেষে চাপা থাকে না। একটা সময় ঠিকই সত্য ইতিহাস উদঘাটিত হয়, ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করে, ঘুরে। যেখানে শেখ হাসিনা ও তার দোসররা ‘মুজিব’ চরিত্রকে পূজোর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে আজ পুরো বাংলাদেশে শেখ মুজিবের একটা মূর্তি বা ভাষ্কর্যও ঠিকভাবে অক্ষত নেই। মুজিবের ধানমন্ডিস্থ বাড়ি আজ ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু কেনো এই পরিণতি? সম্মানের উঁচু অবস্থান থেকে শেখ মুজিব কেনো ইতিহাসে চরমভাবে নিগৃহীত হলেন? একাত্তরের সেই সাহসী মুজিব কেনো নির্মম হত্যার শিকার হলেন? ঠিক কী কারণে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের গত ষোল বছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ পর্যন্ত ইতিহাসের চর্চা হলেও খুব সূক্ষ্মভাবে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫–এ মুজিবের শাসনামলকে সেভাবে জানতে দেওয়া হয় না? এখানেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য।
মুজিববাদীদের প্রতিষ্ঠিত করা মুজিব-ধর্মে মুজিব একাই সর্বেসর্বা, সেখানে মুজিব ব্যতীত আর কোনো আলাপ নেই। টাকায় মুজিবের ছবি, প্রতিষ্ঠানে মুজিবের ছবি, দেয়ালে-গ্রাফিতিতে মুজিবের বন্দনা, সাহিত্যে মুজিবের গুণকীর্তী, ওয়াজের ময়দান থেকে মসজিদেও মুজিবের গুণগান— কোনো ক্ষেত্রেই মুজিবের বন্দনা বাদ দেয়া হয় নি। ছোট্ট শিশুদেরকে মুজিবকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে। তাকে অতিরঞ্জিত করে আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’। কিন্তু তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) কর্তৃক কী কারণে শেখ মুজিবের ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি বাতিল করা হয়েছিল তাও কিন্তু একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর কিছুটা উদ্ধারের চেষ্টা করেছি অত্র লেখনীতে। নিরপেক্ষ মন-মগজ নিয়ে পড়লে আশা করি, যে কোনো মুজিববাদী চেতনায় বিশ্বাসী ব্যক্তিও মুজিব শাসনামলের দুরবস্থা নিয়ে সমালোচনা করতে বাধ্য হবেন, একটু হলেও আঁতকে উঠবেন।
শেখ মুজিব শাসন ক্ষমতায় আসেন ১৯৭২ সালে। ক্ষমতা গ্রহণের পর মুজিব চরিত্রের রূপ যেনো পাল্টাতে থাকে। যেই মুজিব একাত্তরে ছিলেন জনতার কণ্ঠের প্রতীক, সেই মুজিবেরই দূরত্ব বাড়তে থাকে সাধারণ জনগণের সাথে। দেশে বেড়ে যায় লুটতরাজ, চুরি, ডাকাতি। খাবারের তীব্র সংকট দেখা দেয়। রাষ্ট্রে অব্যাহতভাবে চুরি-ডাকাতি-খুন বাড়তে থাকা ও চরম অব্যবস্থাপনা মুজিব সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতারই জানান দেয়। এমনকি ১৯৭৪ সালে চরম দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে দেশ, যাতে প্রাণ হারান কয়েক লাখ সাধারণ নাগরিক। স্বাধীনতা লাভের মাত্র তিন বছর পর ১৯৭৪ সালের এই দুর্ভিক্ষ ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয়, যা মার্চ মাস থেকে শুরু করে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সে সময় অনাহারে প্রায় ২৭,০০০ থেকে ৪০,০০০ মানুষ মারা যান। বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, এই সংখ্যা আরও অনেক বেশিই হবে। বিভিন্ন বেসরকারি ও আন্তজার্তিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনাহার ও বিভিন্ন রোগে ভূগে কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারান।
‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’র নামে মুজিব তাদেরকে দিয়ে বিরোধীদলীয় অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা করেন।বিরোধী রাজনৈতিক মত দমন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অতিরিক্ত ক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ ছিল এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা এড়াতে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দিতে মুজিব সরকার বিশেষ অধ্যাদেশ বা আইন পাস করেছিল, যা জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে।১৯৭৪ সালের ১৭ই মার্চ ঐতিহাসিক রমনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ (জাসদ) সমর্থকদের অন্তত ৫০ জন নিহত হয়।
মুজিবের শাসনামলে ভিন্ন মতাবলম্বী দেশপ্রেমিক নেতা, মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীরা কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পায় নি। বরং রক্ষীবাহিনী কর্তৃক অনেক নিরপরাধ মুক্তিযোদ্ধাও খুনের শিকার হন। এমনকি সাধারণ জনগণের প্রতিবাদ ও মুখের ভাষা রুখতে মুজিব ১৯৭৫ এর ২৫শে জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করেন। এক ডিক্রি জারির মাধ্যমে বিলুপ্ত করা হয় সকল রাজনৈতিক দল। স্বাধীন বাংলাদেশে চালু হয় একদলীয় শাসনব্যবস্থা; যেটির নাম ছিল ‘বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামীলীগ’ বা বাকশাল। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা স্বাধীন মতপ্রকাশের ইতিহাসে এক ন্যক্কারজনক অধ্যায়। সংবাদমাধ্যমগুলো হারায় তাদের স্বাধীনতা। কেবল চারটি সংবাদ মাধ্যম ব্যতীত বাকি সকল পত্রিকা সরকারিভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো শাসকের আমলে এরূপ নজির সম্ভবত দ্বিতীয়টি আর নেই।
এখানেই শেষ নয়। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং বিরোধীদলীয় মত দমনে মুজিব অন্যায় ও অপশাসনের চূড়ান্ত পথ বেছে নেন। তার পুত্র কামালসহ নিকটজনদের স্বেচ্ছাচারিতা জনপরিসরে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হলেও মুজিব এর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেন নি; বরং বিভিন্ন পদে দলীয় লোক ও স্বজনদেরকে অধিষ্ঠিত করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক শাসনকে তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেন। যার ফলে একসময় জনগণের ব্যাপক ভালোবাসা ও সমর্থন পাওয়া এই নেতা ব্যাপকভাবে জনসমর্থন হারাতে থাকেন। তিনি পরিণত হন জনবিচ্ছিন্ন এক নেতায়। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা জনগণের ক্ষোভ তীব্র রোষে রূপ নিতে থাকে। শেখ মুজিবের অপশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন, প্রতিবাদ হলেও মুজিব তার ভ্রূক্ষেপ না করে দমননীতির পথ বেছে নেন।
জনশ্রুতি রয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব তার পরিবারসহ ধানমণ্ডির ৩২ নং বাড়িতে নির্মমভাবে নিহত হবার ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের মিষ্টির দোকানগুলো খালি হয়ে যায়। এখান থেকেই অনুমান করা যায়, মুজিব শাসনামলের প্রতি মানুষ ঠিক কতটা ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি মুজিব হত্যার দিনটিকে সে সময় কেউ কেউ ‘নাজাত দিবস’ বা ‘মুক্তি দিবস’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছিলেন। নিরপেক্ষ ইতিহাস এই নির্মম সত্যের সবচেয়ে বাস্তবিক সাক্ষী। মুজিবের দুঃশাসন, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি— এসবই তাকে জনবিচ্ছিন্ন নেতায় পরিণত করে।
১৯৭১ সালের রেসকোর্সের মুজিব ছিলেন সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার পাত্র। অথচ সময়ের পরিক্রমায়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপশাসনের দরুণ সেই মানুষটিই ইতিহাসে চরমভাবে লাঞ্চিত ও নিগৃহীত হয়েছেন। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ইতিহাস আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, সত্য একদিন প্রকাশিত হয়ই সত্যকে দমন করে চেপে রাখা যায় না; যেভাবে শত কোটি টাকা আর বছরের পর বছর চেষ্টা করেও চেপে রাখা যায় নি মুজিব আমলের দুঃশাসনের নির্মম ইতিহাস!
