বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

হারিয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার জোনাকি

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৪৬ বার

হারিয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার জোনাকি

একসময় বর্ষার সন্ধ্যা নামলেই বাংলাদেশের গ্রামের পথঘাট, বাঁশঝাড় কিংবা পুকুরপাড়ে দেখা মিলত ছোট ছোট আলোক বিন্দুর। অন্ধকারের বুক বিদীর্ণ করে জোনাকির সেই মিটমিটে আলো যেন প্রকৃতির মায়ের নিজস্ব প্রদীপ। শিশুরা জোনাকি ধরার চেষ্টা করত, কেউ হাতের মুঠোয় আলো বন্দি করার স্বপ্ন দেখত, আবার কেউ শুধু দূর থেকে তাকিয়ে থাকত। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে জোনাকির আলোয় যে নীরব সৌন্দর্য তৈরি হতো, তা ছিল আমাদের গ্রাম্য জীবনের এক পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন ক্রমশ স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শৈশবের সেই চিরচেনা সন্ধ্যার জোনাকি। জোনাকি আসলে কোনো সাধারণ পোকা নয়; এটি প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জোনাকির দেহে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আলো তৈরি হয়, যাকে বলা হয় বায়োলুমিনেসেন্স। অন্ধকার পরিবেশে এই আলো মূলত তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও প্রজননের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু জোনাকির বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন অন্ধকার, আর্দ্রতা, ঝোপঝাড়, ঘাস, পচা পাতা এবং তুলনামূলকভাবে দূষণমুক্ত পরিবেশ। মানুষের পরিবর্তিত জীবনযাপন ও দ্রুত নগরায়ণ জোনাকির বাসযোগ্য পরিবেশকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করছে। জোনাকি কমে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ আলোকদূষণ। আগে সন্ধ্যার পর গ্রাম ও শহরতলির অনেক জায়গাই অন্ধকার থাকত। এখন বাড়ি, দোকান, রাস্তা, বাগান ও বিভিন্ন স্থাপনায় সারারাত কৃত্রিম আলো জ্বলছে। অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো তাদের স্বাভাবিক আচরণ ও প্রজনন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। জোনাকির হারিয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ তাদের আবাসস্থল ধ্বংস করা। পুকুরপাড়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা, জলাভূমি ভরাট, ঘাসযুক্ত জমি নষ্ট করা, রাস্তা ও ভবন নির্মাণ এবং কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে জোনাকির প্রাকৃতিক পরিবেশ সংকুচিত হচ্ছে। যে জায়গাগুলো একসময় সন্ধ্যার পর জোনাকির নিরাপদ আশ্রয় ছিল, সেগুলোর অনেকগুলো এখন কংক্রিটের দেয়াল, সড়ক কিংবা ভবনে পরিণত হয়েছে। জোনাকির জীবনচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাটির কাছাকাছি পরিবেশে সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন প্রজাতির জোনাকির লার্ভা আর্দ্র মাটি, পচা পাতা কিংবা জলাভূমির আশপাশে বসবাস করে এবং ছোট ছোট প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। ফলে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকির জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ করলেই হবে না; তাদের পুরো জীবনচক্রের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তুতন্ত্রও রক্ষা করতে হবে। কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারও জোনাকির জন্য বড় হুমকি। কৃষিতে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ শুধু ক্ষতিকর পোকাকেই মারে না; অনেক উপকারী পতঙ্গও এতে বিনষ্ট হয়। জোনাকিসহ নানা ধরনের পতঙ্গ পরিবেশের খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের সংখ্যা কমে গেলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রজাতির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্বজুড়েই পতঙ্গের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্ন করছে। আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার) বিভিন্ন প্রজাতির জোনাকির সংরক্ষণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংরক্ষণ সংস্থার গবেষণায়ও আবাসস্থল ধ্বংস, আলোকদূষণ ও কীটনাশকের ব্যবহারকে জোনাকির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ সন্ধ্যার জোনাকি হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি কেবল নস্টালজিয়ার নিছক কোনো গল্প নয়; এটি বৃহত্তর পরিবেশগত পরিবর্তনেরও একটি সংকেত। আমাদের দেশে অবশ্য জোনাকির সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত স্থানীয় গবেষণা এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে ঠিক কত শতাংশ জোনাকি কমেছে এমন নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান বলা হয়তো কঠিন। এই পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের স্মৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দশক আগে একটি শিশু তার শৈশবে যে অভিজ্ঞতা গ্রামের উঠানে পেয়েছে, আজকের অনেক শিশু তা হয়তো কখনই পাবে না। তারা হয়তো জোনাকিকে বইয়ের ছবিতে দেখবে, ইন্টারনেটের কোনো এক কনটেন্টে হয়তো তাদের নিয়ে পড়বে। কিন্তু বর্ষার সন্ধ্যায় অন্ধকার মাঠে দাঁড়িয়ে শত শত ছোট আলোর ঝিলিক দেখার সুন্দর অভিজ্ঞতা তাদের হবে না। জোনাকি সংরক্ষণের জন্য বিশাল কোনো প্রকল্প সবসময় প্রয়োজন নেই। বরং স্থানীয় পর্যায়ে কিছু ছোট উদ্যোগ বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাড়ির আশপাশে অপ্রয়োজনীয় আলো কমানো, রাতভর অতিরিক্ত আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা, পুকুরপাড় ও ঝোপঝাড় সম্পূর্ণ পরিষ্কার না করা, জলাভূমি রক্ষা করা এবং অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার কমানো। শহরের পার্ক ও সবুজ এলাকায় এমন কিছু অঞ্চল রাখা যেতে পারে যেখানে রাতের কৃত্রিম আলো সীমিত থাকবে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্থানীয় পতঙ্গ ও জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, নিয়ে স্থানায় প প্রকৃতিবিষয়ক কর্মসূচি এবং নাগরিক বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এতে জোনাকি শুধু একটি সুন্দর পোকা হিসেবে নয়, একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্রের অংশ হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত হবে। আমরা প্রায়ই পরিবেশ রক্ষার কথা বলতে গিয়ে বড় প্রাণী, বন বা নদীর কথা বলি। কিন্তু প্রকৃতি শুধু বাঘ, হাতি, পাখি কিংবা বড় গাছ দিয়ে তৈরি নয়; ক্ষুদ্র একটি জোনাকিও সেই জটিল জীববৈচিত্র্যের কম অংশ নয়। একটি প্রজাতির সংখ্যা কমে যাওয়া কখনো কখনো পুরো পরিবেশের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। জোনাকির হারিয়ে যাওয়া- অন্ধকারের গল্প, ঝোপঝাড়ের গল্প, কমে যাওয়া জীববৈচিত্র্যের গল্প এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির দূরত্ব বাড়ার গল্প।

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ভোরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
প্রকাশিত: ভোরের কাগজ
Paper Cutting
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।