বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

নগর কৃষি: ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার নতুন দিশা

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৪৪ বার


নগর কৃষি এবং খাদ্যনিরাপত্তা

ক্রমাগত বর্ধনশীল নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি- এই বিষয়গুলো আজ বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় খাদ্য উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল গ্রামাঞ্চল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে শহরই হয়ে উঠছে মানুষের প্রধান আবাসস্থল। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের তথ্যমতে, বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ বর্তমানে শহরে বাস করছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এই হার প্রায় ৬৮ শতাংশে পৌঁছবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে খাদ্যের সবচেয়ে বড় ভোক্তা হবে শহর। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য কোথা থেকে আসবে? এই সংকটের একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে নগর কৃষি। শহরের ভেতর বা আশপাশে ছাদ, বারান্দা, খালি জমি, বিদ্যালয়ের আঙিনা, অফিস, কমিউনিটি স্পেস কিংবা বড় কাঠামো ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা করা। একসময় এটি ছিল শখের বিষয়; আজ এটি খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই নগর উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক কৌশল। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) দীর্ঘদিন ধরে নগর ও শহরতলির কৃষিকে খাদ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ২০১৯ সালের কোভিড-১৯ মহামারির সময়কালীন এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। লকডাউন, পরিবহন সংকট এবং বাজারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বহু শহরে খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল। তখন অনেক পরিবার ছাদকৃষি, কিচেন গার্ডেন ও কমিউনিটি গার্ডেনের মাধ্যমে নিজেদের খাদ্যের একটি অংশ উৎপাদন করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল। বাংলাদেশের বাস্তবতায় নগর কৃষির গুরুত্ব আরও বেশি। দেশের মোট কৃষিজমি প্রতিবছর বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, শিল্পায়ন ও আবাসন প্রকল্পের কারণে কমছে। একই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনার মতো শহরে জনসংখ্যার চাপও বাড়ছে। প্রতিদিন এসব শহরে শত শত ট্রাক খাদ্যপণ্য দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবহন করতে হয়। এতে যেমন পরিবহন ব্যয় বাড়ে, তেমনি জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণও বৃদ্ধি পায়। অথচ শহরের অসংখ্য ছাদ, বারান্দা ও অব্যবহৃত স্থান পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে স্থানীয় পর্যায়েই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল, শাকসবজি উৎপাদন সম্ভব। নগর কৃষির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। বর্তমানে বাজারে বিক্রীত অনেক সবজি ও ফলে অতিরিক্ত কীটনাশক এবং রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। নিজের ছাদ বা বারান্দায় উৎপাদিত সবজিতে জৈব সার ও নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে পরিবার তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পায়।সিঙ্গাপুর সীমিত জমির মধ্যেও উচ্চপ্রযুক্তির উল্লম্ব কৃষির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শাকসবজি উৎপাদন করছে। নেদারল্যান্ডস আধুনিক গ্রিনহাউস প্রযুক্তির সাহায্যে অল্প জমিতে সর্বোচ্চ উৎপাদনের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। জাপানে কৃত্রিম আলো ব্যবহার করে ভবনের ভেতরে কৃষিকাজ পরিচালিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বহু শহরে কমিউনিটি গার্ডেন এখন সামাজিক সংযোগ, শিক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বাংলাদেশেও আশাব্যঞ্জক কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় ছাদকৃষি সম্প্রসারণে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফাও) সহযোগিতায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে ছাদকৃষির প্রদর্শনী প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যেখানে শত শত পরিবার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সফলভাবে ছাদে সবজি ও ফল উৎপাদন করেছে। বর্তমানে অনেক পরিবার টবে টমেটো, মরিচ, বেগুন, লাউ, করলা, লেবু, পেঁপে, ধনিয়া, পুদিনা ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ চাষ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ছাদকৃষির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও নগর কৃষির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য।এ পরিস্থিতিতে সরকার, সিটি করপোরেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নতুন ভবনের নকশায় ছাদকৃষির সুযোগ রাখা, কর প্রণোদনা দেওয়া, কমিউনিটি গার্ডেন প্রতিষ্ঠা, স্কুল-কলেজে নগর কৃষি শিক্ষা চালু করা এবং সহজ প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি শহর উপযোগী উচ্চফলনশীল ও স্বল্পস্থানে চাষযোগ্য জাত উদ্ভাবনে গবেষণার পরিধিও বাড়াতে হবে। ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু গ্রামীণ কৃষির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। খাদ্য উৎপাদনকে মানুষের বসবাসের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি ছাদ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি খালি জায়গা এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিক এই পরিবর্তনের অংশ হতে পারেন।

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২২ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।