বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

একই রাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষায় বৈষম্য

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৩৯ বার

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলোচনা উঠলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশ্ব র‍্যাংকিং, গবেষণা সংখ্যা, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিষয় সামনে আসে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়শই এসবের আড়ালে থেকে যায়। প্রশ্নটি হলো একই রাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশী সকল শিক্ষার্থী সমান মানের উচ্চশিক্ষা কী পাচ্ছেন? বাস্তবতা হলো, না। একই রাষ্ট্রে শিক্ষার্থীভেদে শিক্ষা-সুযোগ, অবকাঠামো, গবেষণা সুবিধা এবং দক্ষতা অর্জনের পরিবেশে স্পষ্ট বৈষম্য বিদ্যমান। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে। কারণ এটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি দেশের সবচেয়ে বড় উচ্চশিক্ষা প্ল্যাটফর্ম। প্রায় ৩৪ লক্ষ ২৫ হাজার শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশী প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনা করেন। অথচ সংখ্যায় বৃহৎ এই শিক্ষার্থী গোষ্ঠীই প্রায়শই নীতিগত অগ্রাধিকার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষায় বেশি উপেক্ষিত। সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অনুমোদিত বাজেট ৮০১ কোটি ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬১৭ কোটি টাকার বেশি নিজস্ব রাজস্ব আয় হিসেবে ধরা হয়েছে, যার প্রধান উৎস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রদানকৃত বিভিন্ন বাবদ ফি এবং একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অর্জিত আয়। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় শিক্ষার্থীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই অবদানের প্রতিফলন কি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানে প্রাসঙ্গিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে? বাস্তবতাসহ পরিসংখ্যান বলছে, ‘না’। বরং গত কয়েক বছরের তথ্য বলছে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বাজেট ঘোষণার পরও বাস্তবতা হলো, বাজেটের বড় অংশই আসছে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে। ফলে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেলেও তা শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বা বাস্তব সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয় না। একই রাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার এই বৈষম্য শুধু অর্থের নয়; এটি সুযোগ, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও বৈষম্য। এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অনেক কলেজে পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষক সংকট, আধুনিক গবেষণাগার নেই, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি নেই, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং নেই, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নেই। তাছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এখনও সীমিত। অসংখ্য শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করেন, কিন্তু গবেষণার প্রাথমিক অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে পারেন না। কোর্স শেষে ডিগ্রি হাতে পান, কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান না। অন্যদিকে দেশের অন্যান্য আবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক শিক্ষা, গবেষণা সহায়তা, আবাসিক হল, কেন্দ্রীয় আধুনিক লাইব্রেরি এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের নানা সুযোগ পান। এগুলো অবশ্যই তাঁদের প্রাপ্য। অপরদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য কি শুধুই একটি সনদ? উওর অবশ্যই ‘না’। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল সনদ প্রদান নয়; বরং জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণার সক্ষমতা ও কর্মজীবনের প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। সেই অধিকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও সমানভাবে প্রাপ্য। এ কথাও সত্য যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন নানামুখী সংস্কার কার্যক্রমে হাত দিয়েছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ২৮তম সিনেট অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৫০টিরও বেশি দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা, আন্তর্জাতিক মানের অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম, স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি ও আইসিটি বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণের আধুনিকীকরণ এবং কর্মমুখী শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। এসব উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন এগুলোর বাস্তবায়নকে ঘিরে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ২,২৫৭টি কলেজে কবে থেকে শুরু হবে এই পরিবর্তন? এর উত্তর নির্ভর করছে ঘোষিত উদ্যোগগুলোর কার্যকর ও সময়মতো বাস্তবায়নের ওপর। পরিকল্পনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলিতে পৌঁছাবে। উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন সিনেট কক্ষে নয়, বরং তা শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার এবং শিক্ষার্থীর বাস্তব অভিজ্ঞতায়। এখানেই দৃশ্যমান উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় বৈষম্য। এটি কেবল অর্থের বৈষম্য নয়, সুযোগেরও বৈষম্য। একই রাষ্ট্রে একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়জীবন যদি গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়, তবে শিক্ষার্থীসংখ্যার বিচারে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়খ্যাত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুধুমাত্র পরীক্ষা ও সনদ অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? এর কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। রাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় সকল শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই ন্যায্য নীতি। এই পার্থক্য ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান, আয় এবং সামাজিক অবস্থানকেও প্রতিফলিত করবে। উচ্চশিক্ষার বৈষম্য তখন জাতীয় উন্নয়নের বৈষম্যে রূপ নেবে, ক্রমশ তা নিচ্ছেও। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক, আধুনিক অবকাঠামো, গবেষণার সুযোগ, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ এবং কার্যকর ক্যারিয়ার সহায়তা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশেষ সুবিধা প্রত্যাশী নন; তারা কেবল চান সংবিধানের সমতার চেতনার আলোকে তাদের উচ্চশিক্ষার ন্যায্য সুযোগ। রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন উচ্চশিক্ষার মান ও সুযোগ সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান মর্যাদার হবে। নতুবা এর বিকৃত প্রতিফলন দেশের উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২২ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আজকালের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত।
প্রকাশিত: আজকালের খবর
Paper Cutting
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।