শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সিড পলিটিক্স: আগামীর ভূরাজনীতির ট্রাম্প কার্ড।

Author

মোছাঃ মিথিলা খাতুন , সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া

প্রকাশ: ৩ জুন ২০২৬ পাঠ: ২০ বার

সিড পলিটিক্স: আগামীর ভূরাজনীতির ট্রাম্প কার্ড।

 

​ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হবে? যুদ্ধ কি শুধু পরমাণু অস্ত্র, ড্রোন আর মিসাইল দিয়েই হবে? আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন—না। ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর যুদ্ধটি হতে পারে আমাদের থালার ভাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। অর্থাৎ যে দেশের হাতে খাদ্যের এবং বীজের নিয়ন্ত্রণ থাকবে সেই দেশই শাসন করবে বিশ্বকে। আর এই অদৃশ্য যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কিছু জটিল নিয়মের আড়ালে, যার মধ্যে একটির নাম ট্রিপস (TRIPS) বা মেধাস্বত্ব চুক্তি।

 

​বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে যাচ্ছে। এটি যেমন আমাদের জন্য গর্বের, তেমনই এর সাথে আসছে কিছু বড় আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)-এর ট্রিপস চুক্তি অনুযায়ী, মেধাস্বত্ব বা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষার কড়া নিয়মগুলো আমাদের মেনে চলতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে একে শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ম মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের কৃষি ও বীজের সার্বভৌমত্ব হারানোর এক গভীর ষড়যন্ত্র।

 

​আমাদের কৃষির বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যাবে, ইতিমধ্যে  একটি নীরব পরিবর্তন কিংবা বলা ভালো আগ্রাসন ঘটে গেছে। একসময় বাংলাদেশে হাজার হাজার জাতের দেশি ধান এবং ঐতিহ্যবাহী সবজি ছিল। আজ বাজারে গেলে আমরা যেসব আকর্ষণীয় ও বড় সাইজের পুষ্টিগুণহীন বেগুন, টমেটো, শসা বা লাউ দেখি তার প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই আসছে হাইব্রিড বীজ থেকে । এমনকি পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্যের প্রধান উৎস যে ভুট্টা তার শতভাগই এখন হাইব্রিড। যদিও বেশি ফলন এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে আমাদের কৃষকরা বাধ্য হয়েই দেশি বীজ ছেড়ে বহুজাতিক কোম্পানির প্যাকেটের বীজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

 

​তবে সমস্যাটি কেবল একটি বাণিজ্যিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এর পেছনে রয়েছে বিশ্বজুড়ে চলমান সিড পলিটিক্স বা বীজের রাজনীতি । আজ পৃথিবীর বীজের বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে হাতেগোনা ৩-৪টি বহুজাতিক কোম্পানি।

 

এটি এমন এক চতুর সুপরিকল্পিত কর্পোরেট চক্র, যেখানে তারা শুধু বীজ বিক্রি করে না। এমনভাবে বীজের ডিএনএ পরিবর্তন করে, যা কেবল তাদেরই উৎপাদিত নির্দিষ্ট রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া বাঁচতে পারে না। ফলে কৃষক একবার এই চক্রে ঢুকলে প্রতি বছর বীজ এবং রাসায়নিক দুটির জন্যই ওই কোম্পানির ওপর আজীবন নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

 

​সিড পলিটিক্সের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বৈজ্ঞানিক অস্ত্র টার্মিনেটর প্রযুক্তি (Terminator Technology)। এই প্রযুক্তিতে ল্যাবে তৈরি বীজ থেকে ফসল হলেও, সেই ফসলের ভেতরের বীজটি প্রাকৃতিকভাবেই বন্ধ্যা বা মৃত হয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের মুখে এই প্রযুক্তি সরাসরি নিষিদ্ধ হলেও, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো হাইব্রিড বীজের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ঠিক এই কাজটিই করে চলেছে, যা প্রকৃতিগতভাবেই কৃষকের বীজ রাখার এবং বিনিময় করার হাজার বছরের চিরাচরিত অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।

 

​ভবিষ্যতে এই নির্ভরশীলতা কতটা সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে, তা আমাদের কল্পনাতীত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে চরম ঝুঁকিতে। আগামী দিনগুলোতে আমাদের এমন বীজের প্রয়োজন হবে যা তীব্র লবণাক্ততা বা খরা সহ্য করতে পারে। তখন এই সুপার-বীজ গুলোর প্যাটেন্ট বা স্বত্ব যদি শুধু পশ্চিমা কর্পোরেটদের হাতে থাকে, তবে তারা আমাদের জীবন-মরণ পরিস্থিতিকে পুঁজি করে যেকোনো কঠিন শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে।

 

কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে খাদ্য কোনো সাধারণ পণ্য থাকবে না, এটি হয়ে উঠবে একটি ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধাস্ত্র। কোনো দেশ যদি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় কোন শক্তির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে, তবে বীজ সরবরাহ বন্ধ বা ধীরগতির করে দিয়ে সেই দেশে কৃত্রিম খাদ্য সংকট তৈরি করা অসম্ভব কিছু নয়। আর এ কারণেই সিড পলিটিক্স আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি জীবন-মরণ প্রশ্ন হয়ে দ্বারাবে।

 

​ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, অতীতে ১৯৯৭ থেকে ২০০১ সালের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ঠিক এই ট্রিপস চুক্তির নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিল। এইডস মহামারীর সময় জীবনরক্ষাকারী ওষুধের প্যাটেন্ট ধরে রেখে পশ্চিমা কোম্পানিগুলো ওষুধের দাম আকাশচুম্বী করে দিয়েছিল, যার ফলে লাখ লাখ মানুষ ওষুধ না পেয়ে মারা যায়। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার যখন ভারতের মতো দেশ থেকে সস্তায় জেনেরিক ওষুধ আনতে চেয়েছিল, তখন ৩৯টি বহুজাতিক কোম্পানি মিলে দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছিল। ঠিক একইভাবে, ২০১৯ সালে ভারতে পেপসিকো কোম্পানি কয়েকজন সাধারণ আলু চাষীর বিরুদ্ধে কোটি টাকার প্যাটেন্ট ভঙ্গের মামলা করেছিল, যা সিড পলিটিক্সের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ!

 

​তবে এই সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। কর্পোরেটদের এই সিড পলিটিক্স রুখতে বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধও ইতিমধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। যেমন: পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিজ্ঞানী বন্দনা শিবা নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে কৃষকদের নিজস্ব বীজ ব্যাংক আন্দোলন ‘নবধান্য’ যা বহুজাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশি বীজকে টিকিয়ে রাখছে।

 

​বাংলাদেশকেও আজ সেই পথেই হাঁটতে হবে। বিদেশি শর্তের ব্ল্যাকমেইল থেকে বাঁচতে হলে আমাদের ‘বীজ সার্বভৌমত্ব’ অর্জন করতে হবে। আর এর জন্য প্রথমত, আমাদের সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন: ব্রি (BRRI) বা বারি (BARI)-কে আরও শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের বিজ্ঞানীরা যদি নিজেরাই দেশি জাতের ওপর কাজ করে জলবায়ু-সহিষ্ণু এবং উচ্চফলনশীল এমন বীজ আবিষ্কার করতে পারেন যা থেকে কৃষক নিজেই পরের বছর বীজ সংরক্ষণ করতে পারবে, তবে কর্পোরেটদের প্যাটেন্ট করা বীজের বাজার এমনিতেই ধ্বসে পড়বে।

 

​দ্বিতীয়ত, শুধু ল্যাবে নয়, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কমিউনিটি বীজ ব্যাংক গড়ে তুলতে হবে এবং হারিয়ে যাওয়া দেশি বীজগুলোর একটি সমৃদ্ধ জাতীয় জিন ব্যাংক অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে, যেন বীজের জন্য ভবিষ্যতে সরকারকে বা কৃষককে অন্যত্র গিয়ে জিম্মি হতে না হয়। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থায় ট্রিপস চুক্তির ভেতরের বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং এর মতো আইনি সুরক্ষাকবচগুলো ব্যবহারের পূর্ণ প্রস্তুতি আমাদের নীতিনির্ধারকদের রাখতে হবে।

​পোশাক শিল্প বা অন্য কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে দেশের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে তা হয়তো সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু যদি কৃষি ব্যবস্থা বা খাদ্য উৎপাদন এক মাসের জন্য ব্যাহত হয় তবে দেশে দুর্ভিক্ষ লেগে যেতে পারে।

 

তাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম মানলেও কোনো কর্পোরেটের স্বার্থের কাছে আমাদের কৃষকের হাতকে বন্দি হতে দেওয়া যাবে না। যদি আজ আমরা বীজের স্বাধীনতা রক্ষা করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই নীতিনির্ধারকদের এখনই এই সংবেদনশীল বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করা একান্ত জরুরি।

লেখক,

মোছাঃ মিথিলা খাতুন।

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।


 

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!