বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

তারুণ্যের ইশতেহার যেন উপেক্ষিত না হয়

Author

মো হাবিবুল্লাহ বাহার , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ৫২ বার

তারুণ্যের ইশতেহার যেন উপেক্ষিত না হয়: (প্রকাশিত -২০ফেব্রুয়ারী শুক্রবার ২০২৬ আমার দেশ)

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের রুদ্ধশ্বাস এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তারুণ্যের সম্মিলিত বিস্ফোরণ। যে ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিল ফ্যাসিবাদ, মত প্রকাশের ওপর শিকল আর মেধাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দলীয়করণের মহোৎসব। আজ থেকে দুই বছর আগেও যা ছিল অকল্পনীয়, সেই দুঃসহ ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর প্রায় আঠারোশো শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আজ বিএনপি সরকার গঠন করেছে। কিন্তু এই সরকারের মনে রাখা প্রয়োজন, এই ক্ষমতা কোনো গতানুগতিক নির্বাচনের ফল নয়; বরং এটি জুলাইয়ের সেই তরুণদের রক্তমাখা আত্মত্যাগের ফসল। তরুণ ও দেশের সর্বস্তরের নাগরিক যে আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশকে সামনে রেখে রাজপথে নেমে এসেছিলো এই সরকার কি পারবে তাদের সেই আকাঙ্ক্ষার মর্যাদা দিতে, নাকি পুরনো জীর্ণ সিস্টেমের গহ্বরে আবার সব হারিয়ে যাবে?
বিগত দীর্ঘ সময়ে এদেশের মানুষ দেখেছে কীভাবে মুক্তমত ও মুক্ত চিন্তাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মুক্ত পরিবেশের কথা যারা চিন্তা করেছে তাদের উপর চালানো হয়েছে অত্যাচারের স্টিমরোলাট। চাকরির বাজারে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয় বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তরুণরা ব্রেইনড্রেইন নিয়ে চিন্তিত ছিলো। আজ তরুণরা সমাজে চায় একটি ভয়হীন পরিবেশ, যেখানে নিজের মনের কথা বলতে গিয়ে কাউকে ডানে-বামে তাকাতে হবে না। নির্বিঘ্নে বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করতে পারবো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আমরা দেখেছি, ছাত্র-জনতার বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনার পর তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে, এমনকি ভুল স্বীকার করে ক্ষমাও চেয়েছে। সমালোচনার এই স্বাধীনতা ও সরকারের জবাবদিহিতাই ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই যে সংশয় উঁকি দিচ্ছে, তা আমাদের ভাবায় আমরা কি সেই ‘অস্পৃশ্য’ নেতৃত্বের সংস্কৃতিতে ফিরে যাচ্ছি? নির্বাচনের পর দলীয় নেতাকর্মীরা এখনই সোচ্চার হয়ে উঠছে যে, কারা বিএনপির বিরুদ্ধে লিখছে বা কারা নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করছে। এই অতি-উৎসাহী আচরণ কিন্তু অশনিসংকেত। মনে রাখতে হবে, সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতাই গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত। যদি রাজপথে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথা বলার সুযোগ সংকুচিত হয়, তবে এই বিপ্লবের অন্যতম ভিত্তি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধকর অবস্থায় পৌছাবে।
তরুণদের আরেকটি বড় দাবি হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি। আমরা দেখেছি ওসমান হাদি, তোফাজ্জল কিংবা সাম্যের মতো সম্ভাবনাময় প্রাণগুলো কীভাবে নৃশংসতার শিকার হয়েছে। ক্যাম্পাসগুলোতে লাশ পড়ে থাকতো। পুরনো সিস্টেমে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদত, কারণ অপরাধীরা ছিল ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায়। নতুন সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। দলীয় পরিচয়ে যে কোনো অপরাধ করে, হত্যা-জমি দখল বা চাঁদাবাজি করে পার পাওয়ার যে ট্র্যাডিশন এদেশে চালু হয়েছে, তা ভেঙে চুরমার করতে হবে। আদালত ও বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। যদি আজ হাদি হত্যার বিচার না হয়, যদি তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ডের আসামিরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তবে মেধাবী তরুণরা রাজনীতি বা সমাজ সংস্কারে আসার সাহস হারাবে এবং দেশে আবার বিচারহীনতার অন্ধকার নেমে আসবে। তাই এই বিচারগুলোর মধ্য দিয়ে নতুন সরকারকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে দিতে হবে।
তরুণরা আজ কেবল শাসক পরিবর্তন চায় না, তারা চায় রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার। তাইতো দীর্ঘ আলাপের পর সিদ্ধান্ত হয়েছিল হ্যাঁ/না গণভোটের। যেটার মূল কথা ছিলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ থেকে শুরু করে সংবিধানের গণতান্ত্রিক রূপান্তর। আকাঙ্ক্ষা ছিলো নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা করা ছিলো অন্যতম উদ্দেশ্য। কারণ, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা না থাকলে সেই দল রাষ্ট্র পরিচালনায় একনায়ক হয়ে ওঠে, যার তিক্ত অভিজ্ঞতা এদেশের মানুষের আছে। তাই নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করে পেশাদারিত্বের জায়গায় ফিরিয়ে আনা। নতুন সরকারের কাছে উন্নয়ন মানে যেন কেবল ইট-পাথরের স্থাপত্য না হয়, বরং তা যেন হয় প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদী দর্শন।
ইতিহাস আমাদের বারবার সতর্ক করেছে যে, গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকার গণঅভ্যুত্থানের মূল চাওয়া পাওয়া পূরণে ব্যার্থ হলে তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। অন্তরবর্তীকালীন সরকারের পর বর্তমান নির্বাচিত সরকার ও গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের উপর দাড়িয়ে আছে। ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর মিশরের হোসনি মোবারকের পতনের কথা আমরা জানি। তরুণদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত সেই বিপ্লবের পর ক্ষমতায় আসা সরকার যখন জনআকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে নিজেদের এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে চাইল এবং পুরনো প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখল, তখন মাত্র এক বছরের মাথায় আবার গণবিক্ষোভের মুখে তাদের পতন ঘটে। এই ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় জনগণ যখন একবার রক্ত দিয়ে রাজপথ চিনে ফেলে, তখন তাদের আর দমন-পীড়ন করে দাবিয়ে রাখা যায় না। চব্বিশের বিপ্লবোত্তর এই বাংলাদেশেও যদি নতুন সরকার পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্টদের মতো সমালোচনা সহ্য করতে না পারে বা বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দেয়, তবে মিশরের মতো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে সময় লাগবে না।
সবশেষে, আমরা চাই একটি সাম্যের বাংলাদেশ। যেখানে ভূমি দখল,হত্যা-হুমকি, চাঁদাবাজি কিংবা প্রশাসনের অপব্যবহার হবে এক অন্ধকার অতীত। চব্বিশের বিপ্লবীদের স্বপ্ন ছিল এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে পুলিশ বা প্রশাসন কোনো দলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে নয়, বরং জনগণের সেবায় এবং নৈতিকতার সাথে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবে। নতুন সরকারের ওপর তরুণদের যে পাহাড়সমান প্রত্যাশা, তার মূলে রয়েছে একটি ‘মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক জীবন’। কারণ, এই সাধারণ নাগরিকদের কাছেই ভোট প্রার্থনা করে আজ নতুন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা নিজ নিজ আসনে আসীন হয়েছেন। যাদের কারণে তারা এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছেন, সেই নাগরিকদেরও মর্যাদাপূর্ণ স্বাধীনতা ও নির্ভয়ে চলাফেরার সুযোগ করে দিতে হবে। এই সরকার যদি জনআকাঙ্ক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হয় এবং দলীয় কর্মীদের দমন-পীড়নের সুযোগ দেয়, তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে সময় লাগবে না। তারুণ্য আজ সতর্ক প্রহরীর মতো তাকিয়ে আছে; তারা আর কোনো ফ্যাসিবাদ চায় না, তারা চায় স্রেফ স্বাধীনতার স্বাদ আর ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা।

মো.হাবিবুল্লাহ বাহার, প্রচার সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।

লেখক: প্রচার সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!