বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

গুরুজনরা অবহেলায় হারায় কেন?

Author

মো হাবিবুল্লাহ বাহার , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৫ পাঠ: ১৩৪ বার

২১জুলাই ২০২৫ ইংরেজী মাইলস্টোনের সেই বিকেলটি আমরা কেউ ভুলতে পারব না। দেশের ইতিহাসে এক করুন ট্রাজেডি। শহরের প্রান্তে প্রশিক্ষণরত সামরিক বিমানের ভয়ংকর দুর্ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।চারদিকে ধোঁয়া,আতঙ্ক আর কান্নার শব্দ। মানুষের দৌড়ঝাঁপ, বিস্ফোরণ মৃত্যুর ভয়, আর অসংখ্য শিশুর চিৎকার। এর মধ্যেও ভেতরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গিয়েছিল–একজন সাধারণ শিক্ষিকার অদম্য সাহস। তিনার নাম মেহেরিন ম্যাম।
একজন শিক্ষক, একজন পরম মমতাময়ী অভিভাবক, যিনি সেই বিপদসংকুল মুহূর্তে নিজের জীবন বাজি রেখে দৌড়েছিলেন তাঁর শিক্ষার্থীদের দিকে। ভয়ংকর বিপদের মাঝেও তিনি একে একে শিক্ষার্থীদের বের করে আনছিলেন, ঠেলে দিচ্ছিলেন নিরাপদ স্থানে। তাঁর নিজ শরীরের প্রতি কোনো খেয়াল ছিল না। চারপাশে আগুন, ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপ, তবু তিনি একেকজন শিশুকে বাঁচাতে ব্যস্ত।
নিজের জীবন দিয়ে হলেও যতজনকে পারা যায় বাঁচানো,এমনটাই ছিলো তার ভাবনা।হয়তো শেষ মুহূর্তে তাঁর মনে ছিল—“আমার ছাত্রছাত্রীদের কিছু হলে আমি বাঁচব কিভাবে?”এই ছিল তাঁর ভালোবাসা, তাঁর কর্তব্যবোধ, তাঁর মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা। তিনি অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীকে তিনি বাঁচিয়েছেন—এমনটাই বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। প্রকৃতির চরম বাস্তবতায় ছাত্রদেরকে বাঁচানো সেই পরম মমতাময়ী মা তাদের ছেড়ে চলে যান। এমন করুন সময়ে জীবনের বিনিময়ে শিক্ষিকার এমন ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসনীয়। এমন সময় তার এমন ভূমিকার জন্য অবশ্যই রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি যথা সম্মান সবার প্রত্যাশা ছিল; কিন্তু মিলেনি।
এই দুর্ঘটনায় পাইলট তৌফিকুর ও প্রাণ হারিয়েছিলেন। রাষ্ট্র তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান দিল। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন, সামরিক বাহিনীর গার্ড অব অনার, দেশের বড় বড় আমলাদের শোকবার্তা—সবই ছিল। আমরাও সবাই সেই দৃশ্য দেখেছি, স্যালুট দিয়েছি, শ্রদ্ধা জানিয়েছি।
কিন্তু একই দুর্ঘটনায়, যিনি নিজের জীবন দিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে বাঁচালেন—মেহেরিন ম্যাম। তাঁর জন্য ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কোনো শোকবার্তা! ছিলোনা বিদায়ের শেষ সময়েও কোনো মন্ত্রী বা প্রশাসনিক কর্তার উপস্থিতি।না কোনো স্মরণসভা, না কোনো সম্মাননা। শুধু পরিবার, সহকর্মী আর ক’জন শিক্ষার্থী ও গ্রামের আত্মীয়-স্বজনদের কান্নার ভেতর দিয়েই শেষ হলো মেহেরিন ম্যামের বিদায়যাত্রা।
আমাদের রাষ্ট্রের অবকাঠামো ও দৃষ্টি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যেন রাষ্ট্রের চোখে পরিচয়ই হলো সবকিছু। পরিচয়ের কারণেই নিজের জীবনের বিনিময়ে এই ত্যাগের জন্য পেলেন না কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কিংবা সম্মান। অথচ তিনি তার এই চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষকতার মহান পেশাকে করেছেন সম্মানিত। আজকের শিশু আগামী দিনেরই ভবিষ্যৎ দেশের এই কর্ণধারগুলোকেও বাঁচিয়েছেন। তাহলে তিনি কেন রাষ্ট্রের চোখে একটু সম্মানিত হলেন না? শেষ সময়েও কেন শিকার হলেন বৈষম্যের?
কারণ মেহেরিন ম্যাম ছিলেন একজন ‘সাধারণ মানুষ’। তিনি ছিলেন না কোনো বাহিনীর সদস্য, না কোনো উচ্চপদস্থ আমলা। কেননা,আমাদের সমাজে যেন অঘোষিত এক নীতি চালু আছে যে, সাহসের মূল্যায়ন হয় পদবী দিয়ে। আপনি যদি ইউনিফর্ম পরেন, আপনার ত্যাগকে রাষ্ট্র মনে রাখবে,সম্মাননা দিবে,রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আপনাকে সমাহিত করবে। এদেশের ব্যবস্থা এমন যে, আপনি যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন, আপনার জন্য থাকবে বিশেষ ট্রিটমেন্ট। কিন্তু আপনি যদি হন একজন সাধারণ শিক্ষক-একজন সাধারণ নাগরিক— তবে আপনার বীরত্বকে রাষ্ট্র ‘অভ্যাসগত উদাসীনতা’র ভেতর হারিয়ে ফেলবে।
ইতিহাসের আয়নার দিকে থাকালেই আমাদের চোখে পড়ে এই বাস্তবতা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দিকে তাকান।আমাদের বীরশ্রেষ্ঠদের তালিকায় একজনও সিভিলিয়ান নেই। মনে হয়, যেন যুদ্ধটা কেবল সেনাদের ছিল। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে গেলে দেখা যায়–গ্রামের কৃষক, শহরের শ্রমিক, তরুণ ছাত্র, নাম না-জানা অসংখ্য মানুষ লুঙ্গি কাছা মেরে, হাতে দা-কুড়াল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে। তাদের ত্যাগেই এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। ইতিহাসে তাদের স্মরণ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি এতটাই নামমাত্র যে আজকের প্রজন্ম খুব কমই তাদের গল্প জানে। এই সাধারণদের নাম আজ ইতিহাসে লেখা নেই,তাদের প্রকৃত অবদান আজও আলোচনার আড়ালেই থেকে গেছে।
মেহেরিন ম্যামের ঘটনা সেই পুরনো ইতিহাসেরই এক তাজা প্রতিচ্ছবি।রাষ্ট্রের চোখে সাধারণ মানুষের বীরত্বের মূল্য আজও নামমাত্র। এত বড় একটি ট্র্যাজেডি, এত বড় একটি তার আত্মত্যাগ– তবু কোনো শোকবার্তা নেই। কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি নেই। কোনো ফুলের মালা নেই, নেই একটি সরল সরকারি বিবৃতি। যেন কিছুই ঘটেনি। অথচ তিনিই রাষ্ট্রের আগামী দিনের ফুলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন।
রাষ্ট্র যখন এমন নীরব থাকে, তখন কেবল একজন মেহেরিন ম্যাম নয়,পুরো সমাজের কাছে একটি ভুল বার্তা চলে যায়।
বার্তাটি হলো—“তোমরা যতই ত্যাগ করো, যদি তোমরা সাধারণ মানুষ হও, তোমাদের কেউ মনে রাখবে না। হারিয়ে যাবে রাষ্ট্রের অভ্যাসগত উদাসীনতা ও অবহেলার মাঝে।” আমরা প্রায়ই বলি—“শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।” কিন্তু বাস্তবে সেই মেরুদণ্ড ভেঙে গেলেও রাষ্ট্রের কোনো অনুভূতি জাগে না।একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই পড়ান না,তিনি মানুষ গড়েন। আর এই মেহেরিন ম্যাম তো সেই মানুষ গড়ার পাঠকে জীবনের শেষ মুহূর্তেও বাস্তবে দেখিয়ে গেছেন।
তিনি আমাদের শেখালেন—শিক্ষক মানেই কেবল ক্লাসরুম নয়, শিক্ষক মানেই আদর্শ, সাহস আর আত্মত্যাগ। যা ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. শামসুজ্জোহা স্যার আমাদের শিখিয়ে গিয়েছিলেন। তবু এমন একজন মহান শিক্ষিকার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ আয়োজন নেই- তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ রাষ্ট্রের কোন বিবৃতি নেই, কিছুই নেই এটাই আমাদের জন্য দুঃখজনক ও চরম বাস্তবতা।
এদেশের মাঝে আমরা সাধারণ মানুষ,ছাত্র–ছাত্রী আর শিক্ষকরা আসলে কী করি? আমরা ট্যাক্স দিই, শরীরের ঘাম ঝরাই, বিদেশে গিয়ে রেমিট্যান্স পাঠাই। যুদ্ধ আসলে আমরা রক্ত দিই, বিপদ আসলে প্রথম ছুটি গিয়ে সাহায্য করি। প্রয়োজনে জীবনও দিই। তবুও এ দেশে আমাদের প্রাপ্তির খাতা শূন্যই থেকে যায়। আজ যদি আমরা প্রশ্ন করি—“রাষ্ট্র কি সাধারণ মানুষের সাহসিকতার কোনো তালিকা রাখে?” উত্তর আসবে—না। যত বড় ত্যাগই হোক, রাষ্ট্রের চোখে আমরা কেবলই সাধারণ।
এগুলোভবিষ্যতের জন্যও একটি শঙ্কা।এই প্রবণতা যদি চলতেই থাকে, ভবিষ্যতের প্রজন্ম কী শিখবে?তারা হয়তো শিখবে—“আমি যদি সাধারণ মানুষ হই, তাহলে এ দেশে আমার ত্যাগের কোনো দাম নেই।” যা আমরা ২৪ শের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ও দেখেছি।
তবুও পাওয়া না পাওয়ার মাঝেও মেহেরিন ম্যামের গল্প আমাদের হতাশার ভেতর এক আলোর রেখা। রাষ্ট্র তাঁকে সম্মান না দিলেও মানুষের হৃদয় তাঁকে সম্মান দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের চোখে তিনি আজ এক অমর এক নায়িকা। সহকর্মীদের চোখে তিনি সাহসের প্রতীক। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর নাম—‘‘সত্যিই এই দেশ এমন শিক্ষিকা খুব কমই দেখেছে।” এই স্বীকৃতিই আসল স্বীকৃতি, যা কোনো পতাকা বা প্রটোকলের চেয়ে অনেক বড়।
তবু রাষ্ট্রের নীরবতাকে অস্বীকার করা যায় না।রাষ্ট্র যদি সত্যিই মানুষের সাহস আর আত্মত্যাগকে মূল্য দিত, তবে এই গল্প অন্যরকম হতো।
মেহেরিন ম্যামের কফিন দেখে আমরা লজ্জা পেয়েছি-আমরা এমন এক রাষ্ট্রে বাস করি, যেখানে সাহসের মাপকাঠি হলো পদবী, যেখানে ত্যাগের মূল্য নির্ধারণ হয় ইউনিফর্ম দিয়ে। এত বড় আত্মত্যাগের পরও যেখানে নেই কোনো শোকবার্তা, নেই কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তবু মেহেরিন ম্যাম আমাদের শেখালেন—রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না পেলেও, মানুষ নিজের কাজের মধ্যেই অমর হয়ে যায়। এরকম মানুষের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই পৃথিবী কেবল প্রটোকলের ওপর চলে না, ভালোবাসা আর সাহসের ওপরও চলে।
সর্বোপরি আমাদের দাবি থাকবে রাষ্ট্র যেন একদিন বুঝতে শেখে সাহসের কোনো পদবী নেই,ত্যাগের কোনো ইউনিফর্ম নেই। এই পরিবর্তনটাই আমরা বাংলাদেশে দেখতে চাই। মেহেরিন ম্যামের মতো মানুষদের জন্যই এই পৃথিবী আজও এত সুন্দর, এত মানবিক। উনি মানুষের মনে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

লেখক: প্রচার সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!