বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্হা:ডিগ্রি অর্জনের প্রতিযোগিতা

Author

মো হাবিবুল্লাহ বাহার , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৫ পাঠ: ৫৬ বার

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা:ডিগ্রি অর্জনের প্রতিযোগিতা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান চিত্র যেন এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের প্রতিচ্ছবি। যেখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়ার কথা ছিল মানুষের মানসিক, নৈতিক ও দক্ষতাভিত্তিক বিকাশ, সেখানে বাস্তবে এটি পরিণত হয়েছে পরীক্ষার নম্বর আর সার্টিফিকেট সংগ্রহের যন্ত্রনাময় এক প্রতিযোগিতায়। অর্জনের চেয়ে বেশি স্পষ্ট চাপ, বিকাশের চেয়ে বেশি প্রকট বৈষম্য, আর স্বপ্নের চেয়ে গভীরতর হাহাকার।
আজকের শিক্ষার্থীর যাত্রা শুরু হয় প্রতিযোগিতার সিঁড়িতে পা রেখে, আর শেষ হয় ভেঙে পড়া স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপে। একটি খারাপ ফলাফল শুধু একজন শিক্ষার্থীর জীবনে নয়, বরং তার পরিবারের মানসিক শান্তি, তার আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে চুরমার করে দেয়। ব্যর্থতা এখানে শুধুই ব্যর্থতা নয়, যেন পুরো জীবনের ‘অসম্মান’ হয়ে দাঁড়ায়।
অথচ শিক্ষা হতে পারত আলোর পথ। কিন্তু বাস্তবতা হলো-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘসূত্রতা, সময়ক্ষেপণ, সেশনজট, আর কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগহীনতা এই পথকে করে তুলেছে আরও দুর্বিষহ। বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থী যখন মাস্টার্স শেষ করেন, তার বয়স অনেক সময় ২৫-২৬ এর ওপরে পৌঁছে যায়। অথচ ইউরোপের অনেক দেশে ২২-২৩ বছরেই শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।
তথ্য বলছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। আর তবুও উচ্চশিক্ষাই যেন একমাত্র উত্তরণের পথ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকসের (BBS) ২০২৩ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩.৭৭% উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছে, কিন্তু এর বড় অংশই কর্মহীন অবস্থায় রয়ে গেছে। অথচ ইউরোপে এই হার কম। তবে কর্মমুখী শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি জ্ঞান ও বিকল্প পেশাভিত্তিক শিক্ষার বিস্তারে তারা এগিয়ে।
আমাদের সমাজে ‘সবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়’ এই ধারণাটি এক ধরনের অলিখিত বাধ্যবাধকতায় রূপ নিয়েছে। বাস্তবে সবার একই ধরণের উচ্চশিক্ষা প্রয়োজন হয় না। বরং প্রয়োজন হয় ভিন্ন ভিন্ন আগ্রহ, দক্ষতা ও চাহিদার ভিত্তিতে বিকাশের সুযোগ।
এই অব্যবস্থার সবচেয়ে করুণ শিকার হচ্ছে আমাদের তরুণেরা। ২০২৪ সালে আঁচল ফাউন্ডেশন-এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বছরে ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা গেছে পরীক্ষার চাপ, ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থতা, মানসিক অস্থিরতা এবং পারিবারিক প্রত্যাশার ভারে। কুষ্টিয়ায় ‘রিউশা’, ময়মনসিংহে ‘ধ্রুবজিৎ’ এরা শুধু নাম নয়, এক একটা ব্যর্থ কাঠামো ও ভঙ্গুর শিক্ষাব্যাবস্হার বিরুদ্ধে নীরব চিৎকার।
এই আত্মহত্যাগুলো নিছক ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, বরং গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার চিহ্ন। যেখানে একজন শিক্ষার্থী ব্যর্থ হলে সমাজ তাকে আর মানুষ হিসেবে দেখে না। সেটি একটি বিপজ্জনক বার্তা বহন করে।
কিন্তু এই সকল সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কিংবা সমাধান কী? সমাধান একদিনে আসবেনা,কিন্তু আজ থেকেই শুরু করতে হবে। আমাদের দরকার এমন শিক্ষা, যা চাপমুক্ত, প্রাণবন্ত এবং ভবিষ্যত গঠনে সহায়ক।
প্রথমেই প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের থেকে ভয়, মানসিক চাপ দূর করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা, চাকরি পরীক্ষা ও বিভিন্ন প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষার ব্যর্থতা জীবনের শেষ নয়, বরং নতুন কিছু শেখার সুযোগ এই চিন্তা তৈরী করতে হবে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট দূর করে সবাই যেন সময়মতো পড়াশোনা শেষ করতে পারে এটা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে। শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, বাস্তব জীবনের কাজ শেখাতে হবে। প্রযুক্তি, কারিগরি, ও পেশাগত দক্ষতায় শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যেন মানসিক দিক থেকে সুস্থ থাকে এবং প্রয়োজন পড়লে সাহায্য পায়।
সবশেষে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে মানবিক ও সম্মানজনক। শিক্ষার্থী যেন নিজের মুল্য বোঝে, স্বপ্ন দেখে, এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য সাহস ও আত্মবিশ্বাস পায়।
আমরা হয়তো ইউরোপ কিংবা স্ক্যান্ডিবিয়ান দেশগুলোর মতো দেশ নই, কিন্তু আমরা যদি দেশ ও শিক্ষার্থী সমাজকে পরিপাটি,সৃজনশীল ও বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্হা উপহার দেই তাহলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের চেয়ে কম হবে না। যদি আমরা এই পরিবর্তনগুলো এনে বাস্তবে এপ্লাই করতে পারি, তাহলে ধ্রুবজিৎ, রিউশার মতো অন্য কেউ হারাবে না, বরং আমরা পাবো এক শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত প্রজন্ম। এই পরিবর্তন যদি আজই শুরু হয়, তবে ভবিষ্যতের প্রতিটি ধ্রুবজিত, প্রতিটি রিউশা বেঁচে থাকবে নিজস্ব স্বপ্ন আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে।

মো: হাবিবুল্লাহ বাহার, habibullahbahar964@gmail.com
শিক্ষার্থী- আরবী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক: প্রচার সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৫ আগস্ট ২০২৫ তারিখে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!