রাষ্ট্রপতি ইস্যু ও বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্ক

প্রেসিডেন্ট ইস্যু ও বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্ক
রাজনীতিতে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে এখানে কেউ কারও চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়, থাকে কেবল কৌশল আর প্রয়োজন। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক দাবার বোর্ডের দিকে তাকালে এই প্রবাদের সবচেয়ে নিখুঁত ও বাস্তব প্রয়োগটি চোখে পড়ে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর যখন দেশের নানা প্রান্ত থেকে এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বা ‘চুপ্পু’র পদত্যাগের জোর দাবি উঠেছে বিশেষ করে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক বিভ্রান্তিকর মন্তব্যের পর ঠিক তখনই সবচেয়ে বিস্ময়কর ভূমিকাটি পালন করছে বিএনপি। বিগত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হওয়া দলটিই এখন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা বলে রাষ্ট্রপতিকে স্বপদে বহাল রাখতে চাইছে। সাধারণ চোখে এটি সাংঘর্ষিক মনে হলেও, একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বিএনপি মূলত রাষ্ট্রপতিকে একটি মোক্ষম ‘কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এই সুদূরপ্রসারী ও অপ্রত্যাশিত ‘মাস্টারস্ট্রোক’-এর পেছনে লুকিয়ে আছে রাজনীতি, সংবিধান এবং ভবিষ্যতের ক্ষমতার এক গভীর সমীকরণ।
প্রথম সমীকরণটি আবর্তিত হচ্ছে এক চরম নৈতিক ও দাপ্তরিক পরাজয়কে কেন্দ্র করে। ‘শত্রুর অস্ত্র দিয়েই শত্রুকে ঘায়েল করার’ যে চিরায়ত কৌশল, বিএনপি এখন ঠিক সেটাই প্রয়োগ করছে মনে হচ্ছে। যিনি একসময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানেরর ঝড় তুলেছিলেন, যিনি শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেছিলেন, আজ সেই রাষ্ট্রপতির মুখ থেকেই বিগত ১৫ বছরের নানা অপকর্ম, গুম, খুন বা ‘ফ্যাসিবাদী’ আচরণের দায় প্রত্যক্ষভাবে স্বীকার করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এটি আওয়ামী লীগের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নৈতিক পরাজয়। কারণ, এসব অভিযোগ এখন আর কেবল বিরোধী দলের কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা স্লোগান নয়; রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ থেকে দেওয়া দাপ্তরিক স্বীকৃতি।
দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতের বিচারিক ও আন্তর্জাতিক ভিত্তির জন্য এই ‘চুপ্পু কার্ড’ বিএনপির জন্য এক অমূল্য সম্পদ। পুরো বিশ্ব জানে বর্তমান রাষ্ট্রপতি কার পছন্দের মানুষ ছিলেন। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে তিনি যখন কোনো অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের ফাইলে সই করছেন, কিংবা বিগত সরকারের কোনো সুবিধাভোগীর অপসারণের আইনি নথিতে অনুমোদন দিচ্ছেন তা ইতিহাসে চিরস্থায়ী প্রামাণ্য দলিল হয়ে যাচ্ছে। বিএনপি সম্ভবত এই বাস্তবতাকেই কাজে লাগাচ্ছে। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে আওয়ামী লীগ যেন কোনোভাবেই বলতে না পারে যে, এগুলো নিছক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। কারণ, খোদ আওয়ামী লীগের নিয়োগ দেওয়া রাষ্ট্রপ্রধানের হাত দিয়েই ফ্যাসিবাদবিরোধী সব আইনি ও দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। এর চেয়ে অকাট্য আইনি ভিত্তি আর কী হতে পারে!
তৃতীয় সমীকরণটি হলো সাংবিধানিক ফাঁদ এবং ‘ট্রিপল স্ট্যান্ডার্ড’ গেম। সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে যখন বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের মতো ঘটনা ঘটল, তখন বিএনপির শীর্ষ নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দেশে একটি ‘সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট’ তৈরি করবে। তাঁর এই ‘সংবিধান কিংবা গণতন্ত্র’ মন্তব্যের গভীরতা অনেক বিশাল। বিএনপি এখানে আবেগ নয়, নিখুঁত কৌশলকে কাজে লাগাচ্ছে। নিজেদের চরম শত্রুর নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপ্রধানকে দিয়েই হাসিনাকে রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিকভাবে কোণঠাসা করার এক দারুণ খেলা খেলছে তারা। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে যে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে, এবং বিএনপির কৌশলের প্রধান লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে। তাই বর্তমান কাঠামো ঠিক রেখেই তারা নিজেদের ফায়দা হাসিল করে নিচ্ছে।
সবকিছুর ঊর্ধ্বে বিএনপির সবচেয়ে বড় সমীকরণটি লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রপতির মেয়াদকাল ঘিরে এক সূক্ষ্ম রাজনৈতিক অঙ্কে। চুপ্পুকে সরাতে মরিয়া না হয়ে বরং তাকে টিকিয়ে রাখার পেছনে রয়েছে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার একটি সুদূরপ্রসারী হিসাব।বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হতে এখনও প্রায় দুই বছর বাকি। এখন যদি তাকে অভিশংসনের মাধ্যমে সরানো হয় এবং সরকার নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেয়, তবে তা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কিংবা নেই। এর চেয়েও বড় হিসাব হলো রাষ্ট্রপতি যদি তাঁর বর্তমান মেয়াদ পূর্ণ করেন এবং এই সরকার ২০২৮ সালে তাদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেয়, এরপর সরকারের মেয়াদ শেষে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে যে দলই পরবর্তী সরকার গঠন করুক না কেন, পরবর্তী দুই বছর নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগের ক্ষমতা কার্যত বর্তমান সরকার তথা বিএনপির হাতেই থাকবে।
সে অনুযায়ী বিএনপি তখন নিজেদের পছন্দের কাউকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে, যিনি পরবর্তী পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করবেন। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোনো কারণে সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্তত দুই-তিন বছর বিএনপির ঘনিষ্ঠ একজনই বহাল থাকবেন। ক্ষমতার ভারসাম্যে এটি একটি বড় ‘ট্রাম্পকার্ড’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিশেষত জুলাই সনদের আলোকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনার যে ধারণা সামনে এসেছে, তাতে রাষ্ট্রপতির পদ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে বিএনপি যদি সরকার গঠন করতে না-ও পারে, তবু তাদের মনোনীত রাষ্ট্রপতি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। এমনকি নির্বাচনের সময় সরকার পদত্যাগ করলে নির্বাচনকালীন রাষ্ট্রপতিও তাদেরই থাকবেন যা নির্বাচনে তাদের জন্য কৌশলগত সুবিধা ও স্বচ্ছতার একটি সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বিএনপি হয়তো এভাবেই সুকৌশলে আওয়ামীলীগের নিয়োগ দেয়া রাষ্ট্রপতি দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব আইনি ও দাপ্তরিক কাজ গুছিয়ে আনছে। এই কৌশলগত পথ ধরে এগিয়ে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তারা রাষ্ট্রপতির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাবে। যখন সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টির আর কোনো ঝুঁকি থাকবে না, তখন হয়তো তাঁকে অভিশংসনের (Impeachment) মতো কোনো পদক্ষেপের মুখেও পড়তে হতে পারে। যদি সত্যিই এমনটি ঘটে, তবে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে। আবেগ সরিয়ে রেখে নিখুঁত রাজনৈতিক দাবার চালে কীভাবে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনতে হয়, ‘চুপ্পু ইস্যু’তে বিএনপির বর্তমান অবস্থান তারই এক ধ্রুপদী উদাহরণ।
মো.হাবিবুল্লাহ বাহার,নির্বাহী সদস্য, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদ, রাকসু।

