পোশাককর্মীদের মূল্যায়ন হোক

পোশাক কর্মীদের মূল্যায়ন হোক
(প্রকাশিত-১২ই মার্চ,বৃহস্পতিবার-আমার দেশ পত্রিকা ২০২৬) এবং (The Financial Express এ প্রকাশি,১৪ই মার্চ)
বিদেশের নামিদামি শপিংমলে কাঁচের শোকেসে সাজানো চকচকে পোশাকটির গায়ে যখন ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগটি জ্বলজ্বল করে, তখন তা আমাদের বুকে গর্বের এক ঢেউ তুলে যায়। কিন্তু সেই ঝলমলে আলোর ঠিক নিচেই যে ঘাম, বঞ্চনা আর না-বলা কান্নার গল্পগুলো সেলাই মেশিনের শব্দের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে, তার খবর আমরা কজন রাখি? দেশের অর্থনীতির চাকা যারা অবিরাম ঘুরিয়ে চলেছেন, সেই গার্মেন্টস কর্মীদের জীবন আজ যেন এক অন্তহীন শোষণের উপাখ্যান। তাদের হাড়ভাঙা খাটুনি আমাদের জিডিপির গ্রাফকে ঊর্ধ্বমুখী করলেও, তাদের নিজেদের ভাগ্যের চাকা থমকে আছে এক নিদারুণ অবমূল্যায়ন আর অমানবিকতার ঘেরাটোপে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস শিল্প। মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে এই খাত থেকে। কিন্তু এই আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনের কারিগরদের জীবনমান নিয়ে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে এক নিদারুণ বৈপরীত্য চোখে পড়ে। যে মানুষগুলো তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে, মেশিনের একটানা শব্দের মধ্যে নিজেদের যৌবন এবং স্বাস্থ্য বিসর্জন দিচ্ছেন, তাদের শ্রমের যথাযোগ্য মূল্যায়ন আজও একটি অধরা স্বপ্ন। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গ্রাফ যতটা ঊর্ধ্বমুখী, এই কারিগরদের জীবনমানের গ্রাফ ঠিক ততটাই নিম্নমুখী ও স্থবির।
এই অবমূল্যায়নের সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান রূপটি হলো তাদের পারিশ্রমিক। মাস শেষে একজন গার্মেন্টস কর্মীর হাতে যে মজুরি তুলে দেওয়া হয়, বর্তমানের লাগামহীন বাজারমূল্যের প্রেক্ষাপটে তা নিতান্তই অপ্রতুল। অর্থনীতিতে ‘লিভিং ওয়েজ’ বা সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মজুরি এবং শ্রমিকদের প্রাপ্ত ‘মিনিমাম ওয়েজ’ বা ন্যূনতম মজুরির মধ্যকার ফারাকটি এতটাই বিশাল যে, তাদের জীবন মূলত টিকে থাকার এক অন্তহীন সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হয়, তখন শ্রমিকদের আয় সেই অনুপাতে বাড়ে না। ফলে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনির পরও ভালো খাবার, বাসযোগ্য বাসস্থান কিংবা সন্তানের জন্য উন্নত শিক্ষার স্বপ্ন দেখা তাদের জন্য নিছক বিলাসিতায় পরিণত হয়।
তবে শ্রমিকদের যথাযোগ্য মূল্যায়ন না হওয়ার বিষয়টি কেবল আর্থিক মাপকাঠিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি মানসিক এবং সামাজিক অবমূল্যায়নেরও প্রতিচ্ছবি। একজন মেহনতি মানুষকে যখন কেবল উৎপাদনের একটি হাতিয়ার বা ‘সস্তা শ্রমের উৎস’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন তার মানবিক সত্তাটি হারিয়ে যায়। কর্মক্ষেত্রে উন্নত পরিবেশ, পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো মৌলিক অধিকারগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কাগজ-কলমের হিসেবের মধ্যেই বন্দি থাকে। পুষ্টিকর খাবারের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের কারণে এই শ্রমিকরা যাদের একটি বিশাল অংশ নারী–নানাবিধ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। অথচ, প্রতিদিনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বা ‘প্রোডাকশন টার্গেট’ পূরণের চাপে তাদের এই শারীরিক ও মানসিক অবসাদকে চরমভাবে উপেক্ষা করা হয়।
অবমূল্যায়নের এই ধারা কেবল আর্থিক বা স্বাস্থ্যগত বঞ্চনার মাঝেই থেমে থাকে না, বরং কারখানার ভেতরের দৈনন্দিন আচরণেও এর এক নগ্ন প্রকাশ ঘটে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নামে প্রতিনিয়ত সুপারভাইজার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারা শ্রমিকদের যে অমানবিক আচরণের শিকার হতে হয়, তা এক কথায় অগ্রহণযোগ্য। পান থেকে চুন খসলেই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, মানসিক নিপীড়ন, জোরপূর্বক অতিরিক্ত সময় কাজ করানো এবং ক্ষেত্রবিশেষে শারীরিক লাঞ্ছনার মতো ঘটনাও যেন এই শিল্পের এক অলিখিত ও অন্ধকার সংস্কৃতি। মেশিনের মতো তাদের কাছে কেবল অবিরাম কাজ আশা করা হয়; সামান্য ভুল বা অসুস্থতার কারণে একটু জিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টাকে দেখা হয় মস্ত বড় অপরাধ হিসেবে। একজন বয়স্ক বা সম্মানযোগ্য মানুষকে যখন প্রতিনিয়ত এমন ভীতিকর ও অপমানজনক পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তখন তা কেবল তাদের আত্মমর্যাদাকেই ধূলিসাৎ করে না, বরং তাদের ভেতরে এক ধরনের গভীর মানসিক ট্রমা ও হীনমন্যতার জন্ম দেয়।
এই কাঠামোগত বঞ্চনা ও নিপীড়নের পেছনে বৈশ্বিক এবং স্থানীয় উভয় পক্ষেরই দায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বা গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলো সবসময় সবচেয়ে কম মূল্যে পণ্য কিনে সর্বোচ্চ মুনাফা করতে চায়। এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে স্থানীয় কারখানা মালিকরা উৎপাদন খরচ কমানোর সহজ উপায় হিসেবে বেছে নেন শ্রমিকদের মজুরি আটকে রাখা বা কমিয়ে রাখাকে এবং অল্প সময়ে বেশি উৎপাদনের জন্য শ্রমিকদের ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগকে। ফলে ব্র্যান্ডগুলো বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করলেও, সাপ্লাই চেইনের একেবারে নিচে থাকা শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো জ্যামিতিক পরিবর্তন ঘটে না। তারা রয়ে যান সেই অন্ধকারেই, যেখানে অর্থনীতির কারিগর হয়েও তাদের নিজেদের পকেট থাকে শূন্য এবং আত্মসম্মান থাকে ভূলুণ্ঠিত।
পরিশেষে এই কথাটি অনস্বীকার্য যে, কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন কখনোই তার বৃহত্তর শ্রমজীবী শ্রেণিকে শোষণের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। গার্মেন্টস কর্মীদের পারিশ্রমিক, কর্মক্ষেত্রে তাদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ ও মূল্যায়নের এই সংকট কেবল নির্দিষ্ট একটি খাতের সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় ও মানবিক নৈতিকতার প্রশ্ন। তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা ছাড়া আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্পটি সবসময়ই অসম্পূর্ণ এবং শোষণের কালিমায় ঢাকা থেকে যাবে।
মো.হাবিবুল্লাহ বাহার,নির্বাহী সদস্য, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদ, রাকসু।

