ঐতিহ্যের ধারক কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি
ঐতিহ্যের ধারক কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি
মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন
কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্র এনএস রোড। থানাপাড়া মোড় পেরিয়ে কিছুদূর গেলেই চোখে পড়ে সাদা রঙের এক ঐতিহ্যবাহী দোতলা ভবন। সামনে সারি সারি জোড়া গোলাকার স্তম্ভ, দোতলাজুড়ে টানা বারান্দা। ইট-সুরকি আর কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এ স্থাপনা দেখলেই বোঝা যায় এটি ব্রিটিশ আমলের নিদর্শন। এটি শুধু একটি ভবন নয়, এটি কুষ্টিয়ার গর্ব, ঐতিহ্য আর জ্ঞানচর্চার প্রাচীনতম কেন্দ্র কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি। ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ গ্রন্থাগার কুষ্টিয়া জেলার সবচেয়ে পুরোনো লাইব্রেরিগুলোর একটি। তৎকালীন কুষ্টিয়া ছিল নদিয়া জেলার একটি মহকুমা। শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে আগ্রহী কয়েকজন মানুষের স্বপ্ন থেকে যাত্রা শুরু করে এ লাইব্রেরি। তৎকালীন নদিয়া জেলার মহকুমা প্রশাসক কৃষ্ণদয়াল প্রামণিকের ঐকান্তিক উৎসাহ এবং কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট নাগরিকদের উদ্যোগে এর ভিত্তি স্থাপিত হয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলা রোডের পাশে ১০ কাঠা জমি দান করেন গৌরিশঙ্কর আগরওয়াল। আর এই নান্দনিক ভবনটি নির্মাণ করে দেন বাড়াদীর জমিদার হরিশচন্দ্র রায় চৌধুরী। উদ্দেশ্য ছিল একটি স্থায়ী পাঠাগার, যেখানে কুষ্টিয়ার মানুষ জ্ঞানের আলো পাবে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি হয়ে ওঠে জেলার বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, শিক্ষক ও ছাত্রদের মিলনস্থল। এখানে বসে সাহিত্য আড্ডা, বিতর্ক, পাঠচক্র চলত নিয়মিত। প্রখ্যাত গবেষক, লেখক ও শিক্ষাবিদ আবুল আহসান চৌধুরী একসময় এ গ্রন্থাগারের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মতো আরও অনেক গুণী মানুষের পদচারণায় মুখরিত ছিল লাইব্রেরির বারান্দা। কিন্তু ১১৫ বছরের এ পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। সময়ের নানা তবে সময়ের পরিবর্তনে পাঠকের সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। ডিজিটাল যুগে মোবাইল, ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার ভিড়ে বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম। ফলে এখন শুধু দোতলায় লাইব্রেরির কার্যক্রম চলছে, নিচতলা ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তবুও যারা নীরবতায় বইয়ের পাতা ওল্টাতে ভালোবাসে, গবেষণা করতে চায়, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়, তাদের কাছে কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি এখনো ভরসার জায়গা। কর্তৃপক্ষের আশা, ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা যোগ করে এবং নতুন বই সংগ্রহের মাধ্যমে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। নতুন প্রজন্ম বইয়ের কাছে ফিরে এলেই সার্থক হবে ১১৫ বছর আগে দেখা সেই স্বপ্ন। কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি শুধু একটি লাইব্রেরি নয়, এটি কুষ্টিয়ার সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার জীবন্ত স্মারক।
