আদিবাসী উপজাতি বির্তক

আদিবাসী উপজাতি বিতর্ক
মো. ইমন হোসেন
প্রতি বছর ৯ আগস্ট সারা বিশ্বে আদিবাসী দিবসটি পালিত হয়। আদিবাসীদের অধিকার, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সুরক্ষা প্রদানের স্বার্থে ১৯৯৪ সালে থেকে জাতিসংঘ দিবসটি পালন করে আসছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলা উচিত? নাকি তারা উপজাতি? এ প্রশ্ন বহুদিনের, অথচ জনমত আর সংবিধান এক্ষেত্রে কার্যত বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে।
আদিবাসী শব্দটি আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠান, আলোচনা ও টকশোসহ সবসময় ব্যবহার না করার অনুরোধ সরকারের। সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী-ই বর্তমানে দেশে আদিবাসীদের কোনো অস্তিত্ব নেই। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬ এর ২ ধারা মতে, জাতি হিসেবে বাঙালি ও নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি বলে বিবেচিত হবে। এছাড়া বাঙালি ছাড়া অন্যান্য যারা আছে তারা উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে পরিচিত হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩ (ক) রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। সংবিধানের কোথাও আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। এছাড়া ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তিতে (ক) সাধারণ অংশে ১নং উপধারায় বলা হয়েছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল বলা হবে।’ (খ) নং ধারার ১নং উপধারায় বলা হয়, ‘উপজাতি শব্দটি বলবৎ থাকিবে।’ সেখানে তো ‘আদিবাসী’ শব্দটি একবারও উল্লেখ করা হয়নি। তবু-ও বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বারবার ব্যবহার হয়ে থাকে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
পার্বত্য জেলাগুলো জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক বিদগ্ধজনের আক্ষেপ হলো, উপজাতি বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে, হেয় বোধ করে এবং ‘আদিবাসী’ বললে যদি খুশি হয় তাহলে তা বলতে দোষ কোথায়? ইতিহাসে যা-ই থাকুক, ৯৮ শতাংশ একক বাঙালি জনগোষ্ঠীর দেশে আমরা আমাদের দেশের অল্পসংখ্যক উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি এইটুকু উদারতা কি দেখাতে পারি না? কিন্তু যখনই ‘আদিবাসী’ শব্দটি সংবিধানে সংযোজিত হবে, ঠিক তখনই ২০০৭ সালের ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র’ মেনে নিতে হবে; যা হবে বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী। কারণ নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদগুলো লক্ষ্য করুন, ঘোষণাপত্রটি কী বলে:
অনুচ্ছেদ-৩: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখে।
অনুচ্ছেদ-৪: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার উপভোগের বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে তথা স্বশাসিত কার্যাবলির অর্থায়নের পন্থা ও উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে।
অনুচ্ছেদ-৫: আদিবাসী জনগণ যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুন্ন রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার লাভ করবে।
অনুচ্ছেদ-৬: আদিবাসী ব্যক্তির জাতীয়তা লাভের অধিকার রয়েছে।
অনুচ্ছেদ-১৯: রাষ্ট্র আদিবাসীদের প্রভাবিত করতে পারে এমন আইন প্রণয়ন কিংবা প্রশাসনিক সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আগে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি নেয়ার জন্য তাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আন্তরিক সদিচ্ছার সঙ্গে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।
উপরোক্ত অনুচ্ছেদ ৩ থেকে ৬ এবং অনুচ্ছেদ ১৯ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশের ভেতর কমপক্ষে ৪৫টি স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত অঞ্চল ও সরকার ব্যবস্থার সৃষ্টি হওয়ার প্রচণ্ড সম্ভাবনা তৈরি হবে। এসব অঞ্চলে সরকার পরিচালনায় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, জাতীয়তা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রণয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবে। এসব অঞ্চলের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকার ও কর্তৃত্ব ক্ষুন্ন হবে। প্রকাশ্যে বলা না হলেও এ আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বতন্ত্র জাতীয়তার মধ্যে লুকানো রয়েছে স্বাধীনতার বীজ। এই ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের ভূমির ওপর যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা আরও ভয়ানক।
অনুচ্ছেদ ১০, অনুচ্ছেদ ২৬(১) এবং ২৬(৩), অনুচ্ছেদ ২৭, অনুচ্ছেদ ২৮(১) এবং ২৮(২), অনুচ্ছেদ ৩০(১) এবং অনুচ্ছেদ ৩২(২)-এর উপর্যুক্ত অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নিজস্ব আইনে নিজস্ব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মুষ্টিমেয় চিহ্নিত উপজাতিরা দাবি করছে ঐতিহ্য ও প্রথাগত অধিকার বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব ভূমির মালিক তারা। একই অধিকার বলে সমতলের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকার সব ভূমির মালিকানা সেখানকার উপজাতীয়রা দাবি করবে। সেখানে যেসব ভূমি সরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকানায় (আদিবাসী নয়) রয়েছে; তা ফেরত দিতে হবে বা তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনকি উপজাতীয়রা রাজি না হলে সমতল থেকে সমপরিমাণ সমগুরুত্বের ভূমি ফেরত দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যেহেতু ওই গোষ্ঠী সব সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে, সে কারণে সেখান থেকে সব সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় যেসব বাঙালি বসতি স্থাপন করেছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ইউএনডিপিসহ কিছু বৈদেশিক সংস্থা ইতোমেধ্যে প্রকাশ্যে এ দাবি তুলেছে।
ঘোষণাপত্রের ৩৬ অনুচ্ছেদটি আরও ভয়ানক। অনুচ্ছেদ-৩৬: ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, বিশেষত্ব যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে তারা অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠী তথা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ যোগাযোগ, সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার ও উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।
ঘোষণাপত্রের এ নির্দেশ কোনো সরকারই মেনে নিতে পারবে না। কারণ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক কার্যক্রম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাছাড়া বাংলাদেশে পার্বত্যাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে; যা ক্রমেই সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে জাতীয় উন্নয়ন ব্যাহত করবে।
বাংলাদেশে বসবাসকারী সব উপজাতি জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভারত ও মিয়ানমার। সেখানে এখনও তাদের মূল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশে তাদের খণ্ডিত অংশ যদি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পায় তাহলে ভারতের সমগ্র সেভেন সিস্টার্স রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের বিপুল এলাকা আদিবাসী ল্যান্ড স্বীকৃতি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। একই সঙ্গে সীমান্তের উভয় পাড়ের অভিন্ন জনগোষ্ঠী যদি অভিন্ন রাজনৈতিক, সরকার কাঠামো কিংবা স্বাধীনতার দাবি তোলে তা আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ নেবে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উল্লিখিত অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে যা ৪২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান স্বাধীন করণে জাতিসংঘের ভূমিকা বিশ্বের দেশপ্রেমিক জনগণকে আতঙ্কিত করেছে। অধুনা পশ্চিম পাপুয়া নিউগিনিতেও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
কাজেই বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী স্বীকৃতি কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়! এর সঙ্গে জড়িত আছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, ইতিহাস ও মর্যাদার প্রশ্ন।
যা-ই হোক, আদিবাসী না স্বীকৃতি দিলে-ও, উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যেটাই বলা হোক না কেন, এসব গোষ্ঠীকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটি অধিকার সুনির্দিষ্টভাবেই দিচ্ছে। এরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা পান। এ সুবিধা তাদের উন্নতির পথে সহায়তা করছে। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। বরং শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তাদের জীবন আরও শান্তিপূর্ণ হবে।
মোঃ ইমন হোসেন, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ এবং সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

