“১০-দফা বনাম ট্রাম্প: মধ্যপ্রাচ্যে কি যুদ্ধের অবসান নাকি ঝড়ের পূর্বাভাস”

১০-দফা বনাম ট্রাম্প: মধ্যপ্রাচ্যে কি যুদ্ধের অবসান নাকি ঝড়ের পূর্বাভাস
মোঃ ইমন হোসেন
গত কয়েক দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সবচাইতে নাটকীয় মোড় দেখা গেল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের একটি টুইট বার্তায়। বিশ্ব পারমাণবিক শক্তি প্রয়োগের সংকটাপন্ন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই এক অভাবনীয় ঘোষণা এল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতি কেবল তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাক-সিরিয়ার ‘’প্রতিরোধ ফ্রন্ট’’সহ পুরো অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য। আগামী ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদের রাজকীয় আতিথেয়তায় বসতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক বৈঠক। যেখানে একদিকে থাকছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, জেডি ভ্যান্স এবং স্টিফেন উইটকফ; অন্যদিকে থাকছেন মাসুদ পেজেশকিয়ান, মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এবং আব্বাস আরাঘচি। কিন্তু এই আলোচনার টেবিলে একটি বড় শূন্যস্থান রয়েছে, সেটি হলো ইসরায়েল। ইরান-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক এই দরকষাকষিতে ইসরায়েলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, ইসলামাবাদ কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সূর্যোদয় ঘটাতে পারবে, নাকি এটি বড় কোনো ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা মাত্র?
যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপট ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতা:- মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যখন খাদের কিনারায়, তখন পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়া একটি কৌশলগত মাস্টারস্ট্রোক। দীর্ঘকাল ধরে পাকিস্তান একদিকে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে ইরানের প্রতিবেশী। এই দ্বিমুখী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে শাহবাজ শরিফ যে আলোচনার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পাকিস্তানের গুরুত্বকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যুদ্ধবিরতিটি কেবল একটি সাময়িক বিরতি নয়, বরং এটি ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া ১০-দফা দাবির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আমেরিকার পক্ষ থেকে এই দাবিগুলোকে “Workable Basis” বা আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা একটি বিশাল চ্যুতি। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন ‘ডিল-মেকার’ যখন এই টেবিলে বসেন, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে কোনো গভীর অঙ্ক রয়েছে। ট্রাম্প চাইছেন দ্রুত ফলাফল, আর ইরান চাইছে দীর্ঘমেয়াদী সম্মান ও সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা।
ইরানের ১০-দফা: সার্বভৌমত্বের নতুন ইশতেহার:- ইরান যে ১০টি শর্ত দিয়েছে, তা কার্যত মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
১. আগ্রাসন না করার লিখিত গ্যারান্টি: ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক আগ্রাসন চালানো হবে না, এই মর্মে আমেরিকার পক্ষ থেকে একটি শক্তিশালী লিখিত নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
২. হরমুজ প্রণালীতে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব: বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর ইরানের পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকার করে নিতে হবে।
৩. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের স্বীকৃতি: ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি এবং নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
৪. সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি এবং স্থায়ীভাবে তুলে নিতে হবে।
৫. পূর্ববর্তী সব রেজোলিউশন বাতিল: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং আইএইএ (IAEA) বোর্ড অফ গভর্নরস কর্তৃক ইরানের বিরুদ্ধে অতীতে গৃহীত সব নেতিবাচক রেজোলিউশন ও প্রস্তাবনা বাতিল করতে হবে।
৬. যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ: বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা এবং প্রক্সি যুদ্ধের কারণে ইরানের যে বিপুল অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামো গত ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
৭. মার্কিন বাহিনী ও ঘাঁটি প্রত্যাহার: মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়া অঞ্চল থেকে সব মার্কিন যুদ্ধবাহিনী এবং সামরিক ঘাঁটি সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নিতে হবে।
৮. প্রতিরোধ ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ: লেবানন (হিজবুল্লাহ), ইয়েমেন (হুথি), ইরাক, সিরিয়া এবং ফিলিস্তিনসহ সব তথাকথিত ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’-এ ইসরায়েল ও আমেরিকার যাবতীয় সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে।
৯. আটকে থাকা সম্পদ মুক্তি: বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের সব রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থ অবিলম্বে বিনাশর্তে অবমুক্ত করতে হবে।
১০. আন্তর্জাতিক আইনে রূপান্তর: এই পুরো চুক্তিটিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক রেজোলিউশনে (Binding Resolution) রূপান্তর করতে হবে, যাতে এটি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা পায় এবং কোনো পক্ষ তা লঙ্ঘন করতে না পারে।
এর মধ্যে ১ থেকে ৫ নম্বর দফাগুলোতে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন না করার লিখিত গ্যারান্টি, হরমুজ প্রণালীতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের স্বীকৃতি এবং সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। এই দফাগুলো ইরানের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য অত্যাবশ্যক। তবে আসল বিপত্তি বেঁধেছে ৬ ও ৭ নম্বর দফা নিয়ে। ইরান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য পূর্ণ ক্ষতিপূরণ চাইছে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন ঘাঁটি ও সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে। আমেরিকার ইতিহাসে কোনো যুদ্ধে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নজির প্রায় নেই বললেই চলে। বিশেষ করে ৭ নম্বর দফা—অর্থাৎ মার্কিন ঘাঁটি প্রত্যাহার—পেন্টাগনের জন্য একটি অসম্ভব প্রস্তাব হতে পারে। কারণ, এই ঘাঁটিগুলোই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের মেরুদণ্ড। যদিও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২ নম্বর দফা অর্থাৎ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হাতে পেলে ইরান হয়তো ৬ নম্বর দফার ক্ষতিপূরণ নিয়ে কিছুটা ছাড় দিতে পারে।
ইসরায়েলি ফ্যাক্টর: শান্তিতে বড় বাধা:- এই আলোচনার সবচাইতে বড় ঝুঁকি হলো ইসরায়েল। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন যে, এই চুক্তি তাদের ওপর বাধ্যতামূলক নয়। বিশেষ করে লেবানন ফ্রন্টে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার যে হুঙ্কার ইসরায়েল দিচ্ছে, তা যেকোনো মুহূর্তে তাসের ঘরের মতো এই যুদ্ধবিরতিকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, “আমাদের আঙুল ট্রিগারের ওপর আছে।” যদি ইসরায়েল সামান্যতম আগ্রাসন দেখায়, তবে ইরান একে পূর্ণ চুক্তিভঙ্গ হিসেবে গণ্য করবে এবং সরাসরি ইসরায়েলে মিসাইল হামলাসহ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ, আমেরিকা যদি তার ঘনিষ্ঠতম মিত্র ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে ইসলামাবাদের বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই পণ্ড হয়ে যেতে পারে।
নেগোশিয়েশন স্টাইল: সময়ের সংঘাত:-
ইসলামাবাদের বৈঠকে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী নেগোশিয়েশন স্টাইল দেখা যাবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল অত্যন্ত অধৈর্য; তারা চায় মুহূর্তের মধ্যে শর্ত চাপিয়ে দিয়ে একটি বড় ‘হেডলাইন’ তৈরি করতে। ট্রাম্পের স্টাইল হলো ‘My way or the highway’। অন্যদিকে, ইরানি প্রতিনিধিরা অত্যন্ত ধীরস্থির এবং প্রতিটি শব্দ ও কমা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে অভ্যস্ত। তারা এক ইঞ্চি জমিও ছাড়তে নারাজ। দুই সপ্তাহের মধ্যে এই আলোচনাকে একটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশনে রূপান্তর করার যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অসম্ভব মনে হচ্ছে। যদি না আমেরিকা অভাবনীয় কোনো ছাড় দেয় কিংবা আলোচনার সময়সীমা বাড়ানো হয়।
সম্ভাব্য চারটি পরিণতি:-
ইসলামাবাদের এই বৈঠক শেষ পর্যন্ত চারটি পথে যেতে পারে:
প্রথমত, পূর্ণ সফলতা: যদি আমেরিকা ইরানের বেশিরভাগ দাবি মেনে নেয়, তবে এটি হবে ইরানের জন্য এক ঐতিহাসিক কূটনৈতিক বিজয়। এটি হবে আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতি থেকে সরে আসার এক চূড়ান্ত সংকেত।
দ্বিতীয়ত, আংশিক চুক্তি: হরমুজ নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো বিষয়গুলোতে সমঝোতা হতে পারে, কিন্তু মার্কিন ঘাঁটি প্রত্যাহার বা ক্ষতিপূরণের মতো বড় দাবিগুলো ঝুলে থাকবে। এতে আলোচনা দীর্ঘায়িত হবে।
তৃতীয়ত, ইসরায়েলি নাশকতায় পণ্ড: যদি ইসরায়েল লেবানন বা সিরিয়ায় হামলা অব্যাহত রাখে, তবে ইরান পাল্টা আঘাত করবে। এতে পুরো অঞ্চল আবার মহাযুদ্ধের মুখে পড়বে।
চর্তুথত, ব্যর্থতা: ট্রাম্প যদি ইরানের দাবিগুলোকে অবজ্ঞা করেন এবং কোনো ছাড় দিতে অস্বীকার করেন, তবে যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আবার কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যাবে।
ইসলামাবাদের এই বৈঠক কেবল একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের অস্তিত্বের লড়াই। শাহবাজ শরিফের এই উদ্যোগ যদি সফল হয়, তবে এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে। কিন্তু ইসরায়েলের অনিচ্ছা এবং আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী অবস্থানের কারণে এই যুদ্ধবিরতি এখন অত্যন্ত নড়বড়ে অবস্থায় আছে। ১০ এপ্রিলের শুক্রবার কেবল মধ্যপ্রাচ্যের নয়, পুরো বিশ্বের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। ইসলামাবাদের টেবিলে শান্তির পায়রা উড়বে, নাকি আবারও যুদ্ধের দামামা বাজবে, তার উত্তর সময়ের গর্ভে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এই আলোচনার ফলাফলই নির্ধারণ করবে আগামী দশকের বিশ্বরাজনীতি কোন দিকে মোড় নেবে।
মোঃ ইমন হোসেন,
শিক্ষানবিশ আইনজীবী, কলাম লেখক।
ইমেইল এড্রেস:- mdemonhossain.lawyer@gmail.com
ফোন নাম্বার:- ০১৭০৩৫২৫৬৭৬

