“হামের সংক্রমণ: মানবিক সংকটের সম্ভাবনা ও প্রতিকার’

মোঃ ইমন হোসেন , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রকাশ: ৪ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ২৯ বার

হামের সংক্রমণ: মানবিক সংকটের সম্ভাবনা এবং প্রতিরোধ
মোঃ ইমন হোসেন
বাংলাদেশ যখন সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বজুড়ে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত, ঠিক তখনই আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে এক পুরনো কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী শত্রু—হাম (Measles), যা এক নীরব ঘাতকের পুনরুত্থানের স্যাটায়ার। গত কয়েক দশকে টিকাদান কর্মসূচিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে আমরা যখন হাম নির্মূলের স্বপ্ন দেখছিলাম, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসের পরিসংখ্যান সেই স্বপ্নে এক বিশাল কুঠারাঘাত করেছে। দেশের ৫৬টি জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের প্রকোপ কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয় বরং এটি একটি ঘনীভূত মানবিক সংকটের পূর্বাভাস। যখন একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হাজার হাজার শিশুকে আক্রান্ত করে এবং মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তখন বুঝতে হবে আমাদের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা বলয়ে এক বিশাল ফাটল ধরেছে।
এবার পরিসংখ্যান দেখি, এই সংক্রমণ মানবিক সংকট তৈরী সম্ভাবনা যাচাই-বাছাই এর জন্য। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে সারা দেশে ৬৭৬ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। দৃশ্যত সংখ্যাটি ছোট মনে হলেও এর গভীরতা অনেক বেশি। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৯ জন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সংক্রমণের হার বেড়েছে প্রায় ৭৫ গুণ। ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি (৩৬%), যার পরেই রয়েছে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম। এই উল্লম্ফন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভাইরাসটি এখন কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দেশব্যাপী প্রাদুর্ভাব বা আউটব্রেক।
এবার আসি, কেন এই বিপর্যয়? যা হয়তো হতে পারে, এন্ডেমিক, যা সাধারণ পরিস্থিতিতে কখনোই বাংলাদেশ হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি। কারণ, হাম প্রতিরোধের প্রধান এবং একমাত্র অস্ত্র হলো টিকা (MR Vaccine)। একটি জনপদে হামের সংক্রমণ ঠেকাতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ থাকতে হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে টিকাদানের হার সবসময়ই প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে যেখানে ৯৮.৯% শিশু টিকা পেয়েছিল, ২০২৫ সালে সেই হার নাটকীয়ভাবে কমে ৫৬.২%-এ নেমে এসেছে।
এই ৪৪ শতাংশ শিশুর টিকার বাইরে থেকে যাওয়া একটি বিশাল ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি করেছে। কেন এই ধস? মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের দীর্ঘস্থায়ী কর্মবিরতি, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) তদারকিতে শিথিলতা—এই সব মিলিয়েই আজকের এই সংকট। যখন রাষ্ট্রের সুরক্ষা কবচ থেকে অর্ধেকের কাছাকাছি শিশু ছিটকে পড়ে, তখন সেখানে ভাইরাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।
কেন এটি মানবিক সংকট এবং এন্ডেমিকে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছেঃ-
প্রথমত, সংক্রামক বৈশিষ্ট্য:- হামকে অনেকেই সাধারণ জ্বর-সর্দি মনে করে ভুল করেন। কিন্তু এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। হাম থেকে নিউমোনিয়া, মস্তিস্কে প্রদাহ (Encephalitis), মারাত্মক ডায়রিয়া এবং চিরস্থায়ী অন্ধত্ব হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য এটি সরাসরি মৃত্যুর পরোয়ানা। ইতিমধ্যে প্রায় ১০০ জন শিশুর সন্দেহভাজন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিশাল মানবিক বিপর্যয়।
দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা: আমাদের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো বর্তমানে ধারণক্ষমতার বাইরে রোগী সামলাচ্ছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বেড সংকুলান হচ্ছে না। আইসিইউ বা উন্নত জীবনদায়ক সরঞ্জামের অভাব দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি শিশু যখন কেবল টিকার অভাবে অন্ধ হয়ে যায় বা মারা যায়, তখন সেটি একটি পরিবারের জন্য আজীবনের মানবিক ট্র্যাজেডি।
তৃতীয়ত, শিশুদের মৃত্যু: ইতিমধ্যে ৯৪টিরও বেশি সন্দেহভাজন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে (৩ এপ্রিল, ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী), যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভাইরাসটি বেশ শক্তিশালী রূপ নিয়েছে। এবার ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, যাদের এখনো নিয়মিত টিকার বয়স হয়নি
জনস্বাস্থ্যের ভাষায় কোনো রোগ যখন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে এবং নিয়মিত বিরতিতে মানুষকে আক্রান্ত করতে থাকে, তখন তাকে ‘এন্ডেমিক’ (Endemic) বলা হয়। বাংলাদেশ একসময় হামের জন্য এন্ডেমিক অঞ্চল ছিল, যা থেকে আমরা কঠোর পরিশ্রমে বেরিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের আবার সেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদি দ্রুত এই ৪৪ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা না যায়, তবে ভাইরাসটি আমাদের পরিবেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে। এর ফলে প্রতি বছর নির্দিষ্ট মৌসুমে হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হবে এবং দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর স্থায়ী বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এন্ডেমিক হওয়া মানে হলো আমাদের জনস্বাস্থ্য খাতের কয়েক দশকের অর্জন ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া।
প্রতিকার ও প্রতিরোধ: সংকট উত্তরণের পথঃ-
প্রথমত, গণ-টিকাদান (Mass Immunization): হাম প্রতিরোধের একমাত্র এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা। টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধের কোনো উদাহরণ আছে কিনা, তা দেখি; তাহলে এই সংকটাপন্ন অবস্থায়, আশার জায়গা তৈরী হবে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভুটান ও মালদ্বীপ ইতিমধ্যে হাম নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছে। তারা কীভাবে পারল? তাদের মূল শক্তি ছিল ‘জিরো টলারেন্স টু মিসড ডোজ’। অর্থাৎ একটি শিশুও যেন টিকার বাইরে না থাকে। অন্যদিকে, সাব-সাহারা আফ্রিকার দেশগুলোতে টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় সেখানে হাম এখন একটি স্থায়ী মানবিক সংকট। বাংলাদেশ আজ কোন পথে হাঁটবে? আমাদের সামনে দক্ষিণ এশিয়ার সফল মডেল যেমন আছে, তেমনি আফ্রিকার ব্যর্থতার উদাহরণও আছে। সিদ্ধান্ত আমাদের।
দ্বিতীয়ত, ভিটামিন-এ (Vitamin A) সাপ্লিমেন্টঃ- হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি কমাতে ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট একটি জীবন রক্ষাকারী উপাদান। হাম শরীরে এই ভিটামিন দ্রুত কমিয়ে দেয়, যা থেকে অন্ধত্ব বা নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি হয়। বৈশ্বিক প্রোটোকল অনুযায়ী, আক্রান্ত হওয়ার পর পরপর দুই দিন উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ালে শিশুর মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৫০% পর্যন্ত কমে যায়। তাই এই সংক্রমণ মোকাবিলায় পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ভিটামিন-এ প্রদান করা অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বা আইসোলেশনঃ- হাম কোভিডের চেয়েও দ্রুত সংক্রামক; আক্রান্তের হাঁচি-কাশি থেকে এই ভাইরাস বাতাসে অন্তত ২ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকে। ব্রাজিলের সফল অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত শিশুকে কমপক্ষে ৫ দিন কঠোর আইসোলেশনে রাখা জরুরি। তাই কোনো শিশুর শরীরে জ্বর বা লালচে দানা দেখা দিলে তাকে দ্রুত অন্য শিশুদের থেকে আলাদা করতে হবে এবং সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত স্কুলে পাঠানো বন্ধ রাখতে হবে।
চর্তুথত, রিং ভ্যাকসিনেশন (Ring Vaccination) কৌশলঃ- এটি একটি অত্যন্ত সফল আঞ্চলিক মডেল। যখন নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় (যেমন আপনার এলাকা) রোগী পাওয়া যায়, তখন সেই রোগীর চারপাশের একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের সব শিশুকে জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হয়। এতে ভাইরাসটি আর সামনে এগোতে পারে না।
পঞ্চমত, সচেতনতা ও পুষ্টি নিশ্চিত করা:- হামের জটিলতা এড়াতে নিয়মিত জ্বর ও র্যাশ মনিটরিং অত্যন্ত জরুরি; জ্বর ৩-৪ দিনের বেশি স্থায়ী হলে বা শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে ঘরোয়া চিকিৎসার অপেক্ষায় না থেকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। এছাড়া হামের কারণে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে, তাই এটি রোধে শিশুকে প্রচুর পানি, ডাবের পানি এবং (শিশুদের ক্ষেত্রে) বুকের দুধসহ পর্যাপ্ত তরল খাবার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মূলত সঠিক পুষ্টি ও সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শই বড় ধরনের বিপদ রুখতে পারে।
ষষ্ঠত, সামাজিক প্রতিরোধ (কমিউনিটি মোবিলাইজেশন):- হাম প্রতিরোধে সামাজিক প্রতিরোধ বা কমিউনিটি মোবিলাইজেশন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার মতো দেশে টিকার বিরুদ্ধে অপপ্রচার রুখতে ইমাম এবং স্থানীয় নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বড় ধরনের সাফল্য এনে দিয়েছে। আপনি যেহেতু সামাজিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের সাথে যুক্ত, তাই সাধারণ মানুষকে টিকার গুরুত্ব বোঝানো এবং বিশেষ করে ৫ এপ্রিলের ক্যাম্পেইন নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা এখন একটি বড় নাগরিক দায়িত্ব। আপনার অবস্থান থেকে সঠিক তথ্য প্রচার এবং ভ্রান্ত ধারণা দূর করা এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
হামের এই হঠাৎ পুনরুত্থান, আমাদের ব্যবস্থার এক চরম দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। ৫৬ জেলায় এর বিস্তার আমাদের সতর্ক করছে যে, সময় আর আমাদের হাতে নেই। যদি আমরা আজ সচেতন না হই, তবে আগামী কয়েক মাসে এই সংক্রমণ একটি জাতীয় মানবিক সংকটে রূপ নেবে যা নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। সরকারকে কেবল ঘোষণা দিলেই হবে না, মাঠ পর্যায়ে টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। আর আমাদের মতো সচেতন নাগরিকদের দায়িত্ব হলো প্রতিটি শিশুকে টিকাদান কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া। আমরা কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি ‘এন্ডেমিক’ রোগের অনিশ্চয়তায় রেখে দেব? নাকি সম্মিলিত শক্তিতে এই মানবিক সংকট রুখে দেব? আমাদের আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশের শিশুদের ভাগ্য।
মোঃ ইমন হোসেন
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ,
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: mdemonhossain.lawyer@ gmail.com
মোবাইল: ০১৭০৩৫২৫৬৭৬
লেখক: সভাপতি, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দ্য ঢাকা ডায়েরি পত্রিকায় প্রকাশিত।
