বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ডিপফেক: সত্য-মিথ্যার নতুন সংকট

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ৮ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৩৭ বার

https://epaper.banglabazarpatrika.net/uploads/epaper/2026-07/6a4c1d385c1c7.jpg

ডিপফেক: সত্য-মিথ্যার নতুন সংকট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দুর্বার অগ্রগতি মানবসভ্যতার জন্য যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে এক ধরনের নতুন ধরনের সংকটও। সেই সংকটের নাম ডিপফেক। এমন এক প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির মুখ, কণ্ঠ কিংবা অঙ্গভঙ্গি এত নিখুঁতভাবে নকল করা সম্ভব যে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল ও নকলের পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কয়েক বছর আগেও যা ছিল কল্পবিজ্ঞানের বিষয়, আজ তা বাস্তবতার অংশ। আর এই বাস্তবতা শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এটি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নৈতিক, সব ক্ষেত্রেই গভীর প্রভাব ফেলছে। ‘ডিপফেক’ শব্দটি জন্মলাভ করেছ ‘ডিপ লার্নিং’ এবং ‘ফেক’ শব্দের সমন্বয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির হবুহু ছবি, ভিডিও বা কণ্ঠ বিশ্লেষণ করে এমনভাবে নতুন কনটেন্ট তৈরি করা হয়, যা দেখতে ও শুনতে সম্পূর্ণ বাস্তব মনে হয়। ফলে কেউ এমন কথা বলছেন বা এমন কাজ করছেন বলে মনে হতে পারে, যা তিনি বাস্তবে কখনোই করেননি। ডিপফেক প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাণ, ভাষা কিংবা শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরিতে ডিপফেক প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন এই প্রযুক্তি প্রতারণা, বিভ্রান্তি কিংবা মানহানির হাতিয়ার হয়। বিশ্বজুড়ে ডিপফেকের অপব্যবহার ক্রমশ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। রাজনৈতিক নেতাদের ভুয়া বক্তব্য, নির্বাচনের আগে বিভ্রান্তিকর ভিডিও, জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নামে মিথ্যা প্রচারণা কিংবা আর্থিক প্রতারণার জন্য কন্ঠস্বর নকল করার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা পরিবারের সদস্য বা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কণ্ঠস্বর নকল করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি ভুয়া ভিডিও লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যার ক্ষতিকর প্রভাব পরে আর সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো নারীদের বিরুদ্ধে ডিপফেকের অপব্যবহার। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া অধিকাংশ ডিপফেক ভিডিওই অননুমোদিত ও আপত্তিকর, যেখানে নারীদের মুখ বসিয়ে ভুয়া ভিডিও তৈরি করা হয়। এর ফলে ব্যক্তিগত মর্যাদা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ভুক্তভোগী সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হন। প্রযুক্তিগত অপরাধের এই নতুন রূপ নারীর প্রতি ডিজিটাল সহিংসতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। দেশে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় ভুয়া ছবি, ভিডিও ও অডিও ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচন, সামাজিক উত্তেজনা কিংবা ধর্মীয় সংবেদনশীল ইস্যুতে ডিপফেক ব্যবহার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হলে তা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিক, কেউই এই ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ নন। ডিপফেকের সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হলো- এটি বিভ্রান্তি তৈরী করে। একসময় ছবি ছিল প্রমাণ, পরে ভিডিওকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এখন সেই বিশ্বাসও প্রশ্নের মুখে। মানুষ যখন কোনো ভিডিও দেখেও নিশ্চিত হতে পারে না সেটি বাস্তব নাকি কৃত্রিমভাবে তৈরি, তখন সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। অন্যদিকে প্রকৃত ঘটনার ভিডিওকেও অনেক সময় ‘ডিপফেক’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে অপরাধীরা দায় এড়ানোর নতুন পথ পেয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বও কম নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিপফেক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি আরও উন্নত করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক, কনটেন্টের উৎস যাচাই এবং দ্রুত ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণের উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এআই প্রযুক্তি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিরাপত্তা ও নৈতিকতার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও প্রয়োজন যুগোপযোগী আইন ও নীতিমালা। বিদ্যমান সাইবার আইনকে আরও কার্যকর করে ডিপফেক-ভিত্তিক প্রতারণা, মানহানি, পরিচয় চুরি ও ডিজিটাল সহিংসতার মত অপরাধের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা দ্রুত এসব অপরাধ শনাক্ত ও তদন্ত করতে পারে। শুধু আইন করলেই হবে না। সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ডিজিটাল সাক্ষরতা। মানুষকে জানতে হবে কীভাবে একটি ভিডিও বা অডিওর সত্যতা যাচাই করতে হয়, সন্দেহজনক তথ্য কীভাবে শনাক্ত করতে হয় এবং যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার করা কতটা ক্ষতিকর হতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ প্রযুক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ হলো সচেতন ব্যবহারকারী। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের আগে ভিডিও ও অডিওর উৎস যাচাই, ডিজিটাল ফরেনসিক টুল ব্যবহার এবং তথ্য-যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। গণমাধ্যম যদি দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতাকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে ডিপফেকের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে থামানো সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। বরং প্রয়োজন প্রযুক্তিকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা এবং অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ইতিহাস বলে, প্রতিটি নতুন প্রযুক্তিই সম্ভাবনা ও সংকট, দুটিই নিয়ে আসে। ডিপফেকও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই এই প্রযুক্তিকে ভয় নয়, বরং বুঝতে হবে। দায়িত্বশীল ব্যবহারের কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। ডিপফেকের যুগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রযুক্তিকে ঘিরে নয়, বরং সত্যকে ঘিরে। এমন এক সময়ে আমরা প্রবেশ করছি, যেখানে চোখে দেখা কিংবা কানে শোনা সবকিছুই সত্য নাও হতে পারে। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে সত্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নয়; আমার, আপনার, প্রত্যেকের।

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!