রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সংখ্যার অর্থনীতি বনাম মানুষের অর্থনীতি

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ২৭ বার

সংখ্যার অর্থনীতি বনাম মানুষের অর্থনীতি

একটি দেশের অর্থনীতি কীরূপ অগ্রসরগামী এই প্রশ্নের উত্তর আমরা সাধারণত খুঁজি কিছু সংখ্যার মধ্যে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত, মাথাপিছু আয় কতটা বাড়ল, মূল্যস্ফীতি কত শতাংশ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কত, রপ্তানি আয় কত? এসব পরিসংখ্যান দিয়েই অর্থনীতির সাফল্য বা ব্যর্থতা পরিমাপ করা হয়। সংখ্যার হিসাব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বাজেট ও নীতিনির্ধারণে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের বিকল্প নেই। কিন্তু অর্থনীতির সব সাফল্য কি সংখ্যার মধ্যে ধরা পড়ে? মাথাপিছু আয় বাড়লেই কি মানুষের বাজারের ব্যাগ ভারী হয়? মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেই কি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবন স্বস্তির হয়ে ওঠে? অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি বোঝার জন্য তাই শুধু সংখ্যার অর্থনীতি নয়, মানুষের অর্থনীতির দিকেও তাকানো জরুরি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা এই প্রশ্নকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলার নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু একই সময়ের মূল্যস্ফীতির চিত্র সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৬ সালের মে মাসে জাতীয় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয় আয়ের পরিসংখ্যান ইতিবাচক হতে পারে, কিন্তু বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষকে সেই একই আয়ে আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। সংখ্যার অর্থনীতি ও মানুষের অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্যটি এখানেই স্পষ্ট । অনেক অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিতে হয়তো , জিডিপি বাড়ছে। কিন্তু একজন নিম্ন আয়ের শ্রমিকের কাছে অর্থনীতির অর্থ ভিন্ন। তার কাছে অর্থনীতি মানে- চাল, ডাল, তেল, সবজি ও ওষুধ কিনতে পারা। তার সন্তানের স্কুলের খরচ চালিয়ে যাওয়া। মাস শেষে বাড়িভাড়া দেওয়া। অসুস্থ হলে চিকিৎসা করানো। অর্থনীতির উন্নতি তার কাছে কোনো গ্রাফের ঊর্ধ্বমুখী রেখা নয়; বরং মাস শেষে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নও এই বাস্তবতার ইঙ্গিত করছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত বাংলাদেশ বিষয়ক অর্থনৈতিক হালনাগাদে সংস্থাটি বলেছে, দেশে প্রবৃদ্ধি মন্থর, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এর ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির কিছু সূচক স্থিতিশীল হওয়ার চেষ্টা করলেও মানুষের জীবনের বাস্তবতা সব সময় সেই সংখ্যার সঙ্গে মিলছে না। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ, যখন তার সুফল সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়। একটি দেশের জাতীয় আয় বাড়তে পারে, বড় শিল্প গড়ে উঠতে পারে, অবকাঠামো উন্নত হতে পারে; কিন্তু যদি কর্মসংস্থান না বাড়ে, সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় না বাড়ে এবং মৌলিক সেবার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে প্রবৃদ্ধির সুফল সীমিত মানুষের মধ্যেই আটকে থাকবে । বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ পভার্টি অ্যান্ড ইকুইটি অ্যাসেসমেন্ট ২০২৫ বলছে, ২০১৬ সালের পর দারিদ্র্য কমার গতি মন্থর হয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। একই প্রতিবেদনে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষকে এমন অবস্থায় থাকার কথা বলা হয়েছে, যারা অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো আকস্মিক ধাক্কায় আবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ একটি পরিবার আজ দরিদ্র নয় বলেই যে আগামীকাল আর্থিকভাবে নিরাপদ থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মানুষের অর্থনীতি বোঝার জন্য তাই শুধু জাতীয় গড়ের দিকে তাকালে চলবে না। গড় অনেক সময় বৈষম্যের বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে। মাথাপিছু আয় বাড়লেও প্রশ্ন হলো – কার আয় বাড়ছে? শহর ও গ্রামের মানুষের মধ্যে আয় ও সুযোগের পার্থক্য কতটা? উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কতজন মানসম্মত কাজ পাচ্ছেন? নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ছে নাকি কমছে? বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে শ্রমবাজারের চাপের কথাও উঠে এসেছে। বিশেষ করে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের। একই সঙ্গে তরুণদের একটি বড় অংশ কম বেতনের কাজে নিয়োজিত, যা দক্ষতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের সংখ্যা থাকলেই যথেষ্ট নয়; কাজটি কতটা স্থিতিশীল, কতটা সম্মানজনক এবং সেই আয়ে একজন মানুষ মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছেন কি না সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিবার তার আয়ের বড় অংশ চিকিৎসা বা শিক্ষার পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হলে তার প্রকৃত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কমে যায়। মাথাপিছু আয় বাড়ার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক পরিবার একইভাবে স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা বা নিরাপদ বাসস্থানের সুযোগ পাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন মানুষের সক্ষমতা বাড়ে, যখন একটি শিশু ভালো শিক্ষা পায়, একজন রোগী অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন না এবং একজন তরুণ দক্ষতা অর্জন করে নিজের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ খুঁজে পান। তাই অর্থনীতিকে শুধু উৎপাদনের হিসাব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। অর্থনীতির শেষ উদ্দেশ্য মানুষ। মানুষের জীবন সহজ না হলে, নিরাপত্তা না বাড়লে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কম না হলে কেবল বড় অর্থনৈতিক সংখ্যা দিয়ে উন্নয়নের পূর্ণ ছবি আঁকা যায় না। এর অর্থ এই নয় যে জিডিপি, মাথাপিছু আয় বা প্রবৃদ্ধির হার গুরুত্বহীন। বরং এগুলো প্রয়োজনীয় সূচক। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সূচককে লক্ষ্য এবং মানুষকে পরিসংখ্যানের একটি অংশ হিসেবে দেখা হয়। অর্থনীতির সংখ্যা আমাদের বলে দেয় দেশ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে; কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা বলে দেয় সেই অবস্থানের সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছেছে। নীতিনির্ধারণেও তাই পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি, ক্রয়ক্ষমতা, দারিদ্র্য ঝুঁকি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যয়ের মতো সূচককে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির বিষয় হিসেবে না দেখে মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে। কারণ বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বড় আঘাতটি পড়ে সেই মানুষের ওপর, যার আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়।
একইভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি শুধু বেকারত্বের হার কমানোর বিষয় নয়। প্রয়োজন উৎপাদনশীল ও ভালো বেতনের কাজ। তরুণদের দক্ষতা এবং শিল্পখাতের চাহিদার মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে হবে। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের বাধা দূর করতে হবে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে সুযোগের বৈষম্য কমাতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যদি কেবল কিছু অঞ্চল, খাত বা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে জাতীয় উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।বাংলাদেশ আজ এমন এক সময় পার করছে, যখন অর্থনৈতিক সূচকের পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি ভালো আছে কি না, তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু জিডিপির গ্রাফ নয়। একজন সাধারণ মানুষ কি আগের তুলনায় ভালোভাবে খেতে পারছেন? চিকিৎসা করাতে পারছেন? সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছেন? নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন? শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সাফল্য কোনো একটি শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার একটি দেশের উৎপাদনের গল্প বলতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবনের গল্প বলতে পারে না পুরোপুরি। সেই গল্প জানতে হলে পরিসংখ্যানের টেবিল থেকে বেরিয়ে মানুষের ঘরে যেতে হবে। সংখ্যার অর্থনীতি আমাদের উন্নয়নের হিসাব দেয়; মানুষের অর্থনীতি বলে দেয় সেই উন্নয়ন কার জীবনে পৌঁছাল।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।