রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

পাবনার বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র: অবহেলায়-অযত্নে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৭ বার

পাবনার বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র: অবহেলায়-অযত্নে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যখন বিজ্ঞানচর্চা বিশ্বজুড়ে ক্রমশ নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, তখন পাবনার এক অখ্যাত গ্রাম্যপল্লী হিমাইতপুরে গড়ে উঠেছিল একটি বিজ্ঞানসাধনার কেন্দ্র- হিমাইতপুর সৎসঙ্গ বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। আনুমানিক ১৯২৪ সালের দিকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের তত্ত্বাবধানে সাধারণ গ্রামবাসীর সহযোগিতায় প্রায় তিন বিঘা জায়গার ওপর গড়ে ওঠে এই দ্বিতল কেন্দ্র। প্রত্যন্ত পল্লীতে এমন একটি বিজ্ঞানকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা সে সময় নিঃসন্দেহে ছিল বিলাসিতা। অথচ সময়ের কালপ্রবাহে সেই সাধের বিজ্ঞানসাধনা কেন্দ্রটিই আজ অবহেলা ও অযত্নে ক্ষয়ের পথে। দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার সময় শ্রীশ্রীঠাকুর প্রায়ই বিজ্ঞানের চর্চার কথা বলতেন। তিনি বলতেন অতীতের গৌরবে মোহাবিষ্ট হয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃতির নানা রহস্য অনুসন্ধান, নতুন সত্য আবিষ্কার এবং বিজ্ঞানের কার্যকারিতার মাধ্যমে জাতীয় সম্পদ ও সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি আশ্রমিক কর্মীদের বলতেন। এই বিজ্ঞানভাবনা থেকেই হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমে তৎকালীন হাজারো প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গ করে গড়ে ওঠে বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা । প্রত্যন্ত পল্লীতে বিজ্ঞানাগার স্থাপনের কথা শুনে অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। অর্থের সংকট ছিল তীব্র। সৎসঙ্গের কর্মীদেরই যখন দৈনন্দিন জীবনে নানা অভাবের মধ্য দিয়ে চলতে হতো, তখন একটি বিজ্ঞানাগার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হওয়াই তো স্বাভাবিক। কিন্তু শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে এটি ছিল গভীর আকাঙ্ক্ষার বিষয়। বন-জঙ্গল পরিষ্কার হলো, অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ চলল, আর ধীরে ধীরে বাস্তবভাবে রূপায়িত হলো বিশ্ব বিজ্ঞান কেন্দ্র। একসময় কেন্দ্রটি হয়ে ওঠে আশ্রমিক কর্মীদের বিজ্ঞান সাধনার জন্য বেশ সমৃদ্ধ একটি স্থাপনা। মাইক্রোস্কোপ, এক্স-রে যন্ত্র, মাইক্রোটোম, স্পেকট্রোস্কোপ, গ্যালভানোমিটারসহ বিভিন্ন মূল্যবান বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি শ্রীশ্রীঠাকুর সংগ্রহ করেছিলেন । পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, উদ্ভিদবিদ্যা, মনোবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণার আয়োজন ছিল। গবেষণার জন্য পৃথক কক্ষের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বই সংরক্ষণের জন্য গ্রন্থাগার স্থাপনের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। পুরুষ কর্মীদের পাশাপাশি অনেক নারী কর্মীও সেখানে কাজ করতেন। সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় বিজ্ঞানচর্চার এমন সীমিত পরিসরে আশ্রমিক মায়েদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর প্রাচীরবেষ্টিত বৃহৎ স্থাপনায় ছিল একাধিক কক্ষ ও প্রশস্ত বারান্দা। বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র কেবল একটি ভবন ছিল না; এটি ছিল শ্রীশ্রীঠাকুরের বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার বাস্তব প্রয়াস। শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছে এই কেন্দ্রের গুরুত্ব ছিল গভীর। তিনি বিশ্ববিজ্ঞানকে তাঁর “সর্বাপেক্ষা প্রাণপ্রিয় জিনিস” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। নির্জন পরিবেশে বিজ্ঞানের উচ্চচিন্তা ও পরীক্ষাকার্য নিয়ে থাকার আকাঙ্ক্ষার কথাও তিনি বলেছেন। তাঁর সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থাপনাটি তাই নিছক পুরোনো একটি ভবন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু দেশভাগ পরবর্তী জটিলতায় পরিস্থিতি বদলে যায়। শ্রীশ্রীঠাকুরের সাধনায় গড়ে ওঠা বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্রসহ আশ্রমের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও ধীরে ধীরে অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে থাকে। যে প্রাঙ্গণে একসময় গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ছিল, সেখানে নেমে আসে মর্মর নীরবতা। দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষয় হতে থাকে এইসকল গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা। ২০২১ সালেও বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্রের ভবন থেকে রড, দরজা-জানালা খুলে নেওয়ার অভিযোগ সংবাদে প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর সাম্প্রতিক সময়ে স্থাপনাটি নতুন সংকটের মুখে পড়ে। ২০২৬ সালে পাবনা মানসিক হাসপাতাল সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র ও মাতৃমন্দিরের ভবন নিলামে বিক্রি ও অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে এ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ভেঙে ফেলার আগে সেটি সংরক্ষণ, সংস্কার কিংবা অন্যভাবে ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ নতুন ভবন নির্মাণ করা যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস পুনর্নির্মাণ করা অসম্ভব। বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্রসহ হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমের ঐতিহাসিক সকল স্থাপনা সংরক্ষণ করা একান্ত জরুরি। প্রয়োজন স্থাপনাগুলোর যথাযথ ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত মূল্যায়ন, জরুরি সংস্কার, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা। একই সঙ্গে এসব স্থাপনাকে গবেষণা, বিজ্ঞান শিক্ষা, ঐতিহ্যচর্চা কিংবা জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে নতুনভাবে ব্যবহার করার কথাও ভাবা বর্তমান সময়ে প্রাসঙ্গিক। একসময় সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও একটি প্রত্যন্ত গ্রামে বিজ্ঞানচর্চার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল। আজ আমাদের সামর্থ্য অনেক বেশি। তাই প্রশ্নটা কেবল একটি পুরোনো ভবন রক্ষার নয়; প্রশ্ন হলো আমরা আমাদের ইতিহাস, জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য এবং পূর্বসূরিদের স্বপ্নের প্রতি কতটুকু দায়িত্বশীল? বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্রসহ হিমাইতপুরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো তাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার আগে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়াই হবে ইতিহাসের প্রতি আমাদের ন্যূনতম দায়।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ বুলেটিন পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।