দরকার ঔষধের জেনেরিক নামের ব্যাবহার

দরকার ঔষধের জেনেরিক নামের ব্যাবহার
রহিমা ডাক্তার থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পর সেদিন থেকেই ঔষধ গ্রহণ করা শুরু করেন কিন্তু তার পেটের বদহজম সমস্যা সমাধান হওয়ার বিপরীত ঘটনা ঘটে। দেখা যায় তার মাথা ঘোরানো,বমি ইত্যাদি সমস্যা। পরবর্তীতে আবারো ডক্টরের কাছে আসলে ঔষধ নিরীক্ষা করে জানা যায় ডক্টর লিখেছেন মটিফাস্ট ১০ মি.গ্রা. আর ফার্মেসী থেকে দিয়েছে মন্টিফাস্ট ১০ মি.গ্রা. ঔষধ। এখানে উল্লেখ করি যে মটিফাস্ট হলো ডমপেরিডন গ্রুপের ঔষধ যা বদহজম, গার্ড, ইসোফ্যাগাইটিসজনিত সমস্যায় ব্যাবহৃত আর মন্টিফাস্ট হলো মন্টিলুকাস্ট গ্রুপের ঔষধ যা মূলত এজমা,শ্বাসকষ্ট, এলার্জিক রিহনাইটিস সমস্যায় ব্যাবহৃত হয়। এখানে ফার্মেসীর স্টাফের ভুল বোঝার প্রধান কারণই হলো ঔষধের ব্রান্ড নামের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য। হয়তো তাড়হুড়ো কিংবা সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করার কারণে এবং সেই সাথে নামের মধ্যে মিল থাকায় এ ধরনের সমস্যার উদ্ভব।আর ঔষধের ভুল প্রয়োগের কারণে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঔষধের তিন ধরনের নাম প্রচলিত রয়েছে যথাক্রমে কেমিক্যাল নাম, জেনেরিক নাম ও ব্রান্ড নাম। কেমিক্যাল নাম হলো ঔষধের বৈজ্ঞানিক নাম যা ঔষধের আণবিক কাঠামো সম্পর্কিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে।অন্যদিকে জেনেরিক নাম হল প্রতিটি দেশের মধ্যে একটি সরকারিভাবে স্বীকৃত সংস্থা দ্বারা গৃহীত ঔষধের একটি অনন্য, অ-মালিকানাধীন নাম।জেনেরিক নামটি সাধারণত একটি অনন্য এপিআই (সক্রিয় ফার্মাসিউটিক্যাল উপাদান) সনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয।বেশিরভাগ দেশের ঔষধের জেনেরিক নাম একই হলেও কয়েকটি ঔষধের আলাদা আলাদা নাম রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, প্যারাসিটামল (ব্রিটিশ অনুমোদিত নাম (BAN) এবং অ্যাসিটামিনোফেন (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত নাম (USAN) কাউন্সিল অনুসারে)।আর ব্রান্ড নাম হলো একটি অনন্য, মালিকানাধীন নাম যা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি দ্বারা দেওয়া হয় এবং প্রতিটি দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত সংস্থা দ্বারা অনুমোদিত হয়। এই নামটি একটি বাজারে বাণিজ্য করার জন্য গ্রহণ করা হয়। যেমনঃ প্যারাসিটামল একটি জেনেরিক নাম যার অন্য নাম অ্যাসিটামিনোফেন,এর কেমিক্যাল নাম হলো এন-অ্যাসিটাইল-পি-অ্যামিনোফেনল এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি কতৃক গৃহীত নাম ফাস্ট (একমি) ,এইস (স্কয়ার),নাপা (বেক্সিমকো) ইত্যাদি।
যদি ব্রান্ড নামে ঔষধ লেখা হয় তাহলে সবার ঔষধ চিনতে সুবিধা হয় বটে, কিন্তু এর অসুবিধাও অনেক। প্রথমত, এতে রোগীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কোন গুরুত্ব থাকে না, ডাক্তার যা লিখবেন কেবলমাত্র ঐ ঔষধটিই খেতে হবে। যেহেতু একমাত্র চিকিৎসকরাই প্রেসক্রিপশন দিতে পারেন, সেহেতু ঔষধ কোম্পানি চিকিৎসকদেরই তাদের প্রাথমিক কাস্টমার হিসাবে মনে করে। তখন ডাক্তারের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের উপর কোন ঔষধ লিখবেন তা নির্ভর করে, এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে বিভিন্ন আয়োজন করে কোম্পানিগুলো। বাসার ফ্রিজ, টিভি, এসি থেকে শুরু করে বাথরুমের সাবান, শ্যাম্পু সব পণ্যই উপহার হিসাবে দিয়ে থাকে। অনেক সময় চিকিৎসককে কোম্পানির পক্ষ থেকে মাসিক এককালীন টাকা প্রদান করা হয়ে থাকে।বিনিময়ে চিকিৎসক মহোদয় সেই কোম্পানির একটি বা দুটি ঔষধ তার প্রদত্ত প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন।যদি ঐ ঔষধটি নিম্নমানের হয়ে থাকে তাহলে তো রোগ নিরাময় না হয়ে উল্টো পরিস্থিতি জটিল হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত, নামী ব্র্যান্ডের ঔষধের নকল হয় বেশি, ফলে রোগী বেশি পয়সা দিয়ে ভুয়া ঔষধ খাবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। অসাধু ব্যাবসায়ীরা তাদের নিজের লাভের কথা চিন্তা করে নকল ঔষধ উৎপাদনে নিম্নমানের ও ভেজাল উপাদান ব্যাবহার করবে। ফলাফল রোগীর অর্থ ও স্বাস্থ্য উভয়েরই ক্ষতি।
তৃতীয়ত, ওষুধ কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্র্যান্ড ভ্যাল্যু ও বিক্রি বাড়াতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ (নৈতিক ও অনৈতিক) করে, তার সিকিভাগও ঔষধের মান উন্নয়নে ব্যয় করে না।সাধারণত ঔষধ কোম্পানি তাদের একটি ঔষধের প্রকৃত দামের ১৫ শতাংশ অর্থ বিপণনে ব্যয় করে থাকে। শত শত ঔষধ কোম্পানির হাজার হাজার ঔষধের ব্র্যান্ড নাম চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য কত ধরনের উপহার প্রদান করতে হয়।এই খরচ যুক্ত হয়ে ঔষধের উচ্চ মূল্য নির্ধারিত হয় এবং পরবর্তীতে আমাদের সাধারণ রোগীদেরই চড়া দামে কিনতে হয় ঐ ঔষধ।
চতুর্থত, একটি রাষ্ট্রের চিকিৎসা ব্যয়ের একটি বড় অংশ যায় ঔষধখাতে, আমেরিকায় জেনেরিক নাম ব্যবহারে বার্ষিক সাশ্রয়ের পরিমাণ ১৫৮ বিলিয়ন ডলার বা তার কাছাকাছি, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাজেটের তিনগুণ!বিগত স্ম্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকত বাজেটের ৫ শতাংশ ও জিডিপির ১ শতাংশের কাছাকাছি।করোনার পরবর্তী সময়ে বাজেট বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে।
এই সকল সমস্যার প্রধান সমাধান হবে প্রেসক্রিপশনে ওষুধের জেনেরিক নাম (ঔষধের মূল উপাদানের নাম) ব্যবহার।অনৈতিক বিপণন প্রতিযোগিতা বন্ধ হলে ঔষধের দাম কমপক্ষে ১৫ শতাংশ কমবে বলে ধারনা করছেন বিশেষজ্ঞ্ররা।জেনেরিক নাম ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে একই ঔষধ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একই মান বজায় রেখে উৎপাদন করছে কি না, তা জানতে বায়োএকুইভ্যালেন্স (মূল ঔষধের উপাদানের পরিমাণের সাথে কোম্পানির তৈরি ঔষধের তুলনা) পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা, যত্রতত্র ঔষধের দোকান চালু নিয়ন্ত্রণ করা, ঠিক ঔষধ দেওয়া হচ্ছে কি না,তা বুঝতে দক্ষ ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ দেওয়া এবং সাধারণ জনগণকে যেখান-সেখান থেকে নিজেদের ইচ্ছেমতো ঔষধ কিনে খাওয়া থেকে বিরত করতে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।চিকিৎসকদের ঔষধের জেনেরিক নাম লিখতে বাধ্য করা গেলে ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওষুধ বিক্রির আগ্রাসি ব্যবস্থাও বন্ধ করা সম্ভব হবে।
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে জেনেরিক প্রেসক্রিপশন চালু আছে। কিন্তু এতেও সমস্যার উদ্ভব হয়। চিকিৎসকরা বিভ্রান্ত, এই নতুন প্রক্রিয়ায় ওষুধ লিখে কী হবে? জেনেরিক নাম এক হলে ঔষধের মান এক নাও হতে পারে।যদি এই নিয়মকে কার্যকর করতেই হয়, তাহলে প্রতিটি ঔষধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিকে তাঁদের তৈরি ওষুধের গুণমানও যাতে এক থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।ঔষধ উৎপাদন, বিক্রয়, বাজারজাতকরণ, সংগ্রহ, আমদানি, রপ্তানি, মান-নিয়ন্ত্রণ ও বিতরণের জন্য ওষুধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। খুবই আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঔষধ বিপণনের জন্য কোনো নিয়মনীতি সেখানে নেই।কাজেই অতিদ্রুত পরিপত্র জারি করে ওষুধের বিপণন নীতিমালা ঠিক করা জরুরি হয়ে পড়েছে।আর পর্যায়ক্রমে চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে ঔষধের জেনেরিক নাম লেখার আইন করা উচিত।
বাংলাদেশের মতো দেশের স্বাস্থ্যখাতে নানা নৈরাজ্য বিদ্যমান এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে স্বাস্থ্যখাতের মানোন্নয়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ খুবই কম।তাই স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ও বেসরকারি দুটো সেবা খাতকে সমন্বয় করে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে।সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে জেনেরিক ঔষধ ব্যাবহার বাধ্যতামূলক করা। সেখানে জেনেরিক নামে ওষুধ লেখার প্রসঙ্গে রোগী ও নীতি নির্ধারকদের সচেতন করার ক্ষেত্রে চিকিৎসক সম্প্রদায়সহ সচেতন সকল নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে হবে।
আল মাসুম হোসেন
শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
01936725911
masumalhasan210@gmail.com

